পঁচিশ বছর বয়সে প্রথম কবিতার বই ‘ফার্স্টবর্ন’। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ (প্রথম সন্তান) সাড়া ফেলে দিয়েছিল সাহিত্যের জগতে।
নোবেল বিজেতা আমেরিকান কবি লুইস গ্লুক
শংকর ব্রহ্ম
১৯৪৩ সালের ২২ এপ্রিল নিউইয়র্কে লুইস গ্লুকের জন্ম। তবে তিনি বেড়ে উঠেছেন লং আইল্যান্ডে। বাবা ড্যানিয়েল গ্লুক আর মা বিয়েট্রেস গ্লুকের দুই মেয়ের মধ্যে তিনি বড়। শৈশবে অ্যানারেক্সিয়া নার্ভালসা রোগে ভুগেছিলেন অনেক দিন। এ জন্য বছর সাতেক থেরাপি নিতে হয়েছে তাঁকে।
তিনি ১৯৬১ সালে জর্জ ডব্লিউ হাই স্কুল, হিউলেট, নিউ ইয়র্ক থেকে গ্রাজুয়েশন করেন। পরবর্তীতে তিনি সারাহ লরেন্সে কলেজ ও কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। গর্ডার্ড কলেজে কিছুদিন কবিতা বিষয়ে শিক্ষকতা করার পর, বর্তমানে তিনি ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।
মাত্র আঠেরো বছর বয়সে তাঁর কবিতা লেখায় হাতে খড়ি। পঁচিশ বছর বয়সে প্রথম কবিতার বই ‘ফার্স্টবর্ন’। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ (প্রথম সন্তান) সাড়া ফেলে দিয়েছিল সাহিত্যের জগতে। তারপর আস্তে আস্তে বেড়েছে পরিধি। মেলভিন কানে, পুলিৎজার পুরস্কার জুটেছে আগেই। তাঁর মুকুটে জুড়ল নোবেলের পালক ২০২০ সালে। যে কবিতা তাঁকে ফিরিয়ে এনেছিল মৃত্যুর থেকে, সেই কবিতায় এবার তাঁকে পাইয়ে দিল শ্রেষ্ঠত্বের সম্মান।
এই কবি তাঁর কবিতার সাবলীল আর ব্যতিক্রমী ভাষাশৈলী দিয়ে নিজেকে এমনভাবে প্রকাশ করেন, যা একাধারে হয়ে ওঠে স্থানিক ও বৈশ্বিক।
১৭৮৬ সালে একটি স্বাধীন সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দ্য সুইডিশ একাডেমির সৃষ্টি হয়েছিল। এই একাডেমি ১৯০১ সাল থেকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দিয়ে আসছে। এ পর্যন্ত ১১২ বার এ পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। বিজয়ী হয়েছেন ১১৬ জন কবি ও সাহিত্যিক।
লুইস গ্লাক তাঁর ‘ওয়াইল্ড আইরিস’ কবিতা-গ্রন্থের জন্য ১৯৯৩ সালে পুলিৎজার প্রাইজ পান। তিনি পুলিৎজার প্রাইজ’র পাশাপাশি ন্যাশনাল বুক ক্রিটিকস সার্কেল অ্যাওয়ার্ড, দ্য একাডেমি অব অ্যামেরিকান পোয়েট’স প্রাইজসহ বেশ কিছু পুরস্কারে ভূষিত হন। অবশেষ ২০২০ সালে সাহিত্য নোবেল পুরস্কার পান তিনি। নোবেল-কমিটি তাদের বক্তব্যে বলেন, ‘”Her unmistakable poetic voice that with austere beauty makes individual existence universal”।
( " তাঁর অদম্য কাব্যিক কণ্ঠস্বর যে কঠোর সৌন্দর্যের সাথে ব্যক্তি অস্তিত্বকে সর্বজনীন করে তোলে”।)
লুইস গ্লাকের কবিতা মূলত আত্মজৈবনিক। ব্যক্তিগত হতাশা, আশা-আকাঙ্ক্ষা, সাফল্য-ব্যর্থতা, নিঃসঙ্গতা ধ্রুপদী মিথের সাথে মাখামাখি হয়ে ধরা দিয়েছে তাঁর কবিতায়। লুইস গ্লুকের কবিতার বইয়ের সংখ্যা মোট এগারটি। তন্মধ্যে ’দ্য সেভেন এইজ’ , ’ভিটা নোভা’ ও ‘এভেরনো’ উল্লেখযোগ্য। কবিতার পাশাপাশি ‘প্রুফস এন্ড থিওরিস’, ‘এসেস অন পোয়েট্রি’ তাঁর বহুল আলোচিত গদ্যসংগ্রহ।
মৃত্যু, পরা-জগত, নীরবতা, নৈঃশব্দ্য, নির্জনতা ও অন্য পৃথিবী যার কবিতায় ভর করে তিনি হলেন লুইস গ্লুক। লুইস গ্লুকের কাব্যভাষা নির্মাণ খুব সহজ-সরস ও প্রাঞ্জল কিন্তু তার কবিতার এ সরলরেখা একই বিন্দু থেকে উৎসারিত হলেও দুটো জগতকে একত্র করেছে। ফলতঃ মৃত্যু, নৈঃশব্দ, নির্জনতায়ও তার কবিতার চরিত্রের দ্বৈততা বা দ্বৈত সত্তা লক্ষ্য করা যায়।
লুইস গ্লুক এমন এক নির্জনতার কবি, যিনি লোকান্তরিত হয়েও এ পৃথিবীর মানুষের সাথে কথা বলেন- মৃত্যু,দূর্যোগ,দুঃখ-বিলাপ, আর্তি-বেদনা, হাহাকার যেমন তাঁর কন্ঠ থেকে ঝরে পড়ে এ পৃথিবীর মানুষের কাছে তেমনি আবার কখনো এ চরিত্রটি তার সঙ্গীকে খুঁজে নেন অনায়াসে কখনও বন্ধুবেশে,কখনও পাখি বা প্রেমিক হয়ে বা ঝর্ণা হয়ে বয়ে যায় স্বর্গ থেকে মর্ত্যে। সুতরাং,তার কবিতায় দুঃখ, বিলাপ, নিঃসঙ্গতা যতই থাকুক, সবশেষে তিনি নিঃসঙ্গ নন। নির্জনতা বা দুঃখবাদীদের সাথে এই স্বাতন্ত্রতার দিকটি অনন্য হয়ে ধরা দিয়েছে তাঁর কবিতায়।
লুইস গ্লুক তাঁর রচনায় যন্ত্রণা, আকাঙ্ক্ষা আর প্রকৃতি নিয়ে লিখেছেন। বিশেষ করে বিষণ্নতা আর একাকিত্ব নিয়ে প্রচুর কবিতা লিখেছেন তিনি। নাইন-ইলেভেনের মর্মান্তিক ঘটনা গ্লুককে খুবই প্রভাবিত করেছিল। এই মর্মান্তিক ঘটনা তাঁকে জীবন গুটিয়ে ফেলার পরিবর্তে জীবনকে উদযাপন করতেই বেশি উৎসাহী করেছে। তাঁর রচনা ও ভাবনায় অনেক সময় পৌরাণিক ঘটনা আর ইতিহাসের ছোঁয়া পাওয়া যায়।
আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন পোয়েট লরিয়েট, Faithful and Virtuous Night কবিতার জন্য ন্যাশনাল বুক এ্যাওয়ার্ড বিজয়ী এবং তাঁর সাম্প্রতিক কল্পবিজ্ঞান, কবিতা: ১৯৬২-২০২১২ সহ এক ডজনেরও বেশি কাব্য গ্রন্থের লেখক। পুলিৎজার পুরষ্কার বিজয়ী রবার্ট হেস তাকে “সাম্প্রতিক লেখার সবচেয়ে শুদ্ধ ও সর্বাধিক দক্ষ গীতি কবি” বলে অভিহিত করেছেন। গ্লুক কুড়ি বছর ধরে উইলিয়ামস কলেজে অধ্যাপনা করেছেন এবং বর্তমানে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের রোজনক্র্যাঞ্জ আবাসিক লেখক। তিনি আমেরিকান আর্টস অ্যান্ড লেটার্স একাডেমির সদস্য এবং ১৯৯৯ সালে আমেরিকান কবিদের একাডেমির চ্যান্সেলর নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁর অসংখ্য কবিতার বইয়ের মধ্যে রয়েছে অ্যা ভিলেজ লাইফ (২০০৯), দ্য সেভেন এজ (২০০১) এবং দ্য ওয়াইল্ড আইরিস (১৯৯২), যার জন্য তিনি পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছিলেন।
লুইস গ্লুকের প্রাপ্তির ঝুলিতে আছে ন্যাশনাল হিউম্যানিটিজ মেডেল, পুলিৎজার পুরস্কার, ন্যাশনাল বুক পুরস্কার। ২০০৩-০৪ সালে লুইস গ্লুক ছিলেন আমেরিকার রাষ্ট্রীয় কবি।
নোবেল কমিটির সংবাদমাধ্যম প্রতিনিধির সাক্ষাৎকারে লুইস গ্লুককে জিজ্ঞেস করা হয়, নোবেল বিজয়ী হয়ে তার কী অনুভূতি।
কবির উত্তর—
“একটি বাড়ি কিনতে চাইছিলাম বেশ কিছুদিন… এবার কিনতে পারব…”
এরকমি প্রাত্যহিক চিন্তা, অবস্থান এবং প্রসঙ্গ লুইস গ্লুকের লেখা ও মননকে আকার দেয়।
বাড়ি কিনতে পারাটা একজন কবির চিন্তাভাবনার বিষয় হতে পারে, সেটা ভাবতে গেলেই ধাক্কা লাগে। কবি তো তিনি যাকে প্লেটো বলেছেন সমাজবহির্ভূত। সমাজে থাকলে তিনি ক্ষতিই করেন, কারণ কবির যা চিন্তাশক্তি তা সমাজের প্রাত্যহিক কাজেকর্মে লাগে না। অথবা কবি হবেন এমন, যিনি ভবিষ্যতদ্রষ্টা— কবি আবার বাড়ি কেনাকাটি করার কথা ভাববেন কেন?
“I’m concerned with the preservation of daily life”— একই সাক্ষাৎকারে উনি বলেছেন। লুইস গ্লুককে নোবেল স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্যে আমাদের প্রাত্যহিক বৈষয়িক আশা-আকাঙ্ক্ষার স্বীকৃতি পাওয়া যায়। তাই সেই পুরস্কার বাবদ পাওয়া টাকা দিয়ে বাড়ি কিনতে চাওয়াটা আমাদেরই স্বপ্ন পূরণ যেন।
রোজকার নিউজপেপার পড়ার মতোই সহজ, ম্যাটার অফ ফ্যাক্ট, অথচ প্রব্লেম্যাটিক ওঁর কবিতা লেখার আঙ্গিক -
We were leaving to deliver
Christmas presents when the tire blew
Last year. Above the dead valves pines pared
Down by a storm stood, limbs bared . . .
I want you.
(আমরা বিতরণ করতে যাচ্ছি
যখন ক্রিসমাস উপহার
গত বছর. মৃত পাইন কান্ড দিয়ে ঘেরা
ঝড়ের নিচে দাড়িয়ে, হাত-পা খালি। . .
আমি তোমাকে চাই।)
Don’t listen to me; my heart’s been broken.
প্রথম দিকের কাব্যিক জীবন থেকে এই লাইনগুলো উঠে আসে ওঁর লেখা ‘Early December in Croton-on Huson’ (1968) কবিতায়। ক্রিসমাসের উপহার, টায়ার পাঙ্কচার, ঝড়ে ধসে যাওয়া পাইন গাছ অনায়াসে মিশে গেল poetic voice-এর সঙ্গে— I want you— ভালবাসার উদ্বেগ যেন বাকি জিনিসগুলোর মতোই বাস্তব এবং সর্বস্ব।
অথবা দেখা যাক “The Untrustworthy Speaker” (1990) থেকে এই পঙক্তিগুলো:
I don’t see anything objectively.
I know myself; I’ve learned to hear like a psychiatrist.
When I speak passionately,
that’s when I’m least to be trusted.
( আমার কথা শুনো না; আমার হৃদয় ভেঙে গেছে।
আমি বস্তুনিষ্ঠভাবে কিছু দেখি না।
আমি নিজেকে জানি; আমি মনোরোগী বিশেষজ্ঞের মতো শুনতে শিখেছি।
আমি যখন আবেগের সাথে কথা বলি,
তখনই আমি অন্তত বিশ্বাস করি।
সত্যটা কীভাবে কার উদ্দেশ্যে বোঝা দায়।)
পাশ্চাত্যের অস্তিত্ববাদী চিন্তায় পদার্থ আগে, মর্ম তার পরে। Existence আর essence, matter আর form নিয়ে চিরাচরিত কাব্যিক দ্বন্দ্ব ওঁর লেখার হৃদযন্ত্রের মতো। মনের বেগ আর ভাষার বেগ একসঙ্গেই যেন ওঠাপড়া।
কবি নিজেই নিজের কাব্যিক কণ্ঠ ও ভাষার নির্ভরযোগ্যতাকে প্রশ্ন করছেন। কারণ? সেই প্রাত্যহিক ব্যথা-বেদনা, ভালবাসার ছন্দপতন, পার্থিব জীবনের বৈষম্য। ভাষা এখানে এতটাই আড়ম্বরহীন, অ-কাব্যিক, যেন নিশানা মেপে তীরন্দাজের তীর। গ্লুকের লেখার বিশেষত্ব বোধহয় এখানেই— ডাক্তার প্রয়োজন বুঝে যেমন প্রেসক্রিপশন লেখেন, গ্লুক তেমন অপ্রয়োজনীয় কোনও শব্দ অপচয় করেন না।
ওঁর বহুচর্চিত কবিতা Averno (2006) থেকে কিছু লাইন দেখি:
You die when your spirit dies.
Otherwise, you live.
You may not do a good job of it, but you go on—
Something you have no choice about.
( আপনার আত্মা মারা গেলে আপনি মারা যান।
নইলে আপনি বেঁচে থাকেন।
আপনি এটির একটি ভাল কাজ নাও করতে পারেন, তবে আপনি চালিয়ে যান-
এমন কিছু যা সম্পর্কে আপনার কোন বিকল্প নেই।)
ভাষার politics এবং তার aesthetics মিলে মিশে একাকার— কবি যেমন বলছেন সত্যি তেমনি, অথবা নাও হতে পারে— স্রষ্টা এবং পাঠকের “choice” নেই— কবিতা, ভাষা, জীবন— নিজের মতোই বয়ে চলে— আমাদের এজেন্সি আদৌ আছে কি? Averno কবিতা সঙ্কলনে গ্রিক মাইথলজি-র পেরসেফনের ক্যারেক্টারটিকে device হিসেবে কাজে লাগিয়েছেন— কিন্তু বক্তব্য সেই দৈনন্দিন জীবনাবস্থান, মা ও মেয়ের টানাপড়েন, বয়ঃসন্ধির উদ্বেগ।
পুরাণকথা ও মাইথলজি আধুনিক মানুষের অ-নায়কোচিত গাথা হয়ে রয়ে যায়।
আত্মজৈবনিক অনেক কিছুই ছায়ার মতো ঘনিয়ে আসে ওঁর লেখায়। কৈশোরে ওঁর আনরেক্সিয়া নারভাস রোগ হয়েছিল। বহুদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন। নিজের এই রোগ নিয়ে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে, গ্লুক লিখেছেন রোগের কারণ তাঁর স্বাধীন সত্তার খোঁজ এবং মায়ের বিরুদ্ধাচারণ। আরেক জায়গায় লিখেছেন, যে বড় দিদির আকস্মিক মৃত্যু তাকে অসম্ভব ধাক্কা দেয়। স্কুলে থাকতেই ওঁর psychoanalytic treatment শুরু হয়।
একাকিত্ব, দুঃখ, সম্পর্কের ওঠাপড়া, রোজনামচা অকথিত উদ্বেগ— আতঙ্ক (trauma) হয়ে ভাষায় ও কবিতায় রূপ নেয়।
This is the barrenness
of harvest or pestilence.
And the wife leaning out the window
with her hand extended, as in payment,
and the seeds
distinct, gold, calling
Come here
Come here, little one
And the soul creeps out of the tree.
( এই বন্ধ্যাত্ব
ফসল বা মড়ক।
আর স্ত্রী জানালার বাইরে হেলান দিয়ে
তার হাত প্রসারিত করে, অর্থপ্রদানের মতো,
এবং বীজ
স্বতন্ত্র, স্বর্ণময়, আহ্বান
এখানে আসুন
এখানে এসো, ছোট একটি
এবং আত্মা গাছ থেকে বেরিয়ে আসে।)
‘All Hallows’ (1968) কবিতা থেকে নেওয়া এই পঙক্তিগুলি বারে বারে মনে করিয়ে দেয় রোজকার মানসিক barenness, pestilence— অনুর্বর দশা। গাছে ঝুলে থাকা প্রেতাত্মার মতো, কবির আত্মাও পালিয়ে যেতে চায়।
মানসিক এবং শারীরিক অসুস্থতার কারণে কলেজের পোশাকি ডিগ্রি নেওয়া হয়নি ওঁর—
…my emotional condition, my extreme rigidity of behavior and frantic dependence on ritual made other forms of education impossible.
( আমার মানসিক অবস্থা, আমার আচরণের চরম অনমনীয়তা এবং আচার-অনুষ্ঠানের উপর উন্মত্ত নির্ভরতা অন্যান্য ধরণের শিক্ষাকে অসম্ভব করে তুলেছে।)
কবিতা ভাবা এবং কবিতা লেখাই হয়ে উঠল লুইস গ্লাকের পঠন-পাঠন। বিচ্ছেদ, মৃত্যু, জরা একদিকে আঁচড় কেটেছে তাঁর মননে, অন্যদিকে জীবনশক্তি, আশা, পুনর্জন্ম ভাষা পেয়েছে তাঁর চেতনায়। নিজের নানান সঙ্কলনে উনি কখনও বা গ্রীক দেবদেবী, আবার কখনও বাগানের ফুল হয়ে কথা বলেছেন (The Wild Iris, 1992)।
‘Archaic Fragment’ (2006) কবিতায় লিখেছেন:
I was trying to love matter.
I taped a sign over the mirror:
You cannot hate matter and love form.
It was a beautiful day, though cold.
This was, for me, an extravagantly emotional gesture.
( আমি ব্যাপারটা ভালবাসার চেষ্টা করছিলাম।
আমি আয়নার উপর একটি চিহ্ন এঁকেছি:
আপনি ব্যাপারটা এবং প্রেমের আকারকে ঘৃণা করতে পারেন না.
ঠান্ডা হলেও এটি একটি সুন্দর দিন ছিল।
এটা ছিল, আমার জন্য, একটি অসাধারণ আবেগপূর্ণ অঙ্গভঙ্গী।)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর চেকোস্লোভাকিয়ায় কবিরা নানান ছদ্মবেশি কায়দায় কবিতা লিখতেন স্তালিনীয় আইডিওলজি থেকে তাঁদের সৃষ্টিকে আগলে রাখতে। ‘Poetry of the Everyday’ এরমই এক ছদ্ধবেশী পন্থা। প্রাত্যহিক ভাষা ও বৈষয়িক বস্তুর মধ্যে লুকিয়ে থাকত ক্ষমতা, শাসন, স্বাধীনতা, আত্মচেতনা, রাজনীতি নিয়ে প্রশ্ন। সেগুলোর বাইরের রূপ হত পাহাড়, নদী, লেক, শিশু, বৃদ্ধ-ভেতরে থাকত কবিতার সামাজিক ভূমিকা ও কর্তব্য নিয়ে টানাপোড়েন। গ্লুকের লেখা একইভাবে অহরহ বস্তুসর্বস্ব জীবনকে দত্তক নেয় কবিতার matter এবং form-এর জন্য।
লুইস গ্লাকের লেখাকে কোনও শ্রেণীবদ্ধ বিভাগ বা লেবেল দিয়ে মাপা যাবে না। নানান দৃষ্টিকোণ ও পন্থা দিয়ে ওঁর লেখার প্রতি অগ্রসর করা যায়। উনবিংশ শতকে ওঁর ইহুদি পূর্বপুরুষরা রাশিয়া এবং হাঙ্গারি থেকে মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্রে চলে আসেন। নিউ ইয়র্ক শহরে ব্যবসা শুরু করেন। এমন বহিরাগত অবস্থান থেকে লুইস গ্লুক জীবনকে চিনতে শিখেছেন। ওঁর লেখনী-জীবনের সমান্তরাল চলেছে বিশ্বায়নের জীবনী। যার মূল কর্তা হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। রোজনামচা জীবনে বিশ্বায়নের তালে তালে, মানুষের ভাবাবেগের যুদ্ধে লুইস গ্লুক-ই কর্তা।
You know, he said, our work is difficult: we confront
much sorrow and disappointment.
He gazed at me with increasing frankness.
I was like you once, he added, in love with turbulence.
( আপনি জানেন, তিনি বলেছেন, আমাদের কাজ কঠিন: আমরা মুখোমুখি হয়েছি
অনেক দুঃখ এবং হতাশার।
তিনি আমার দিকে ক্রমবর্ধমান খোলামেলা দৃষ্টিতে তাকালেন।
আমি একবার তোমার মত ছিলাম, তিনি যোগ করেছেন, অশান্তির প্রেমে।)
-'অ্যাবোরিজিনাল ল্যান্ডস্কেপ' (2013)
–‘Aboriginal Landscape’(2013)
‘প্রেসিডেন্টস ডে’
লুইস গ্লুক-এর কবিতা ও কাব্যব্যক্তিত্বের স্বরূপ আলোচনা করতে গিয়ে, বিপাশা বিনতে হক বলেছেন, (20 OCT , 2020).
এসব ভাবতে গিয়ে মনে হলো বাঙালি কাব্যরসিকের কাছে শব্দের এই মেপে মেপে ব্যবহার কিছুটা অস্বস্তিকর ঠেকতে পারে। তার লেখনীর তুলনাটা চলে আসে বেকেটের ‘ওয়েটিং ফর গোডোট’-এর সাথে; যেখানে অপ্রতুল শব্দের কারণে চরিত্রের মুখে কথা ফোটে না, জন্ম হচ্ছে আয়রনির, স্যাটায়ারের। বিপরীতে বলা যায় বাঙালি পাঠক হিসেবে আমরা জীবনানন্দ দাস পড়ছি, রবীন্দ্র-নজরুল পড়ছি, যাদের কবিতা সবসময়ে ছাপিয়ে যায়, রূপকের ও ইমেজারির এক্সসেসে আমরা এত অভ্যস্ত যে গ্লুকের কবিতার চাঁচাছোলা, সরাসরি ভাবটা আমাদের কাছে বেশ সাদামাটা, আসবাববিহীন খালি ঘরের মতো মনে হতে পারে। এখানে বাংলার প্রথমদিকের আধুনিক সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কথা অবধারিতভাবে চলে আসে, বিশেষ করে তার লেখার এই চাঁচাছোলা স্টাইল। শক্তি চট্টপাধ্যায় বলেছেন, তার, মানে সুধীনের কাজ ছিল ভাস্করের কাজ, লিখতে বসে যেন তিনি ছেনী বাটালি নিয়ে বসতেন। কম কথায় কাজ সারতেন বাঁধুনি শক্ত করে। শক্তি আরো যোগ করেছেন সুধীনের ‘কবিত্ব ছিল কিন্তু excess ছিল না। সংযমের মধ্যে রাখতে পারতেন।’ উত্তরাধুনিক কবি গ্লুকের কাব্যশৈলীতে আবেগের এই শমিত প্রকাশ চোখে না পড়ে যায় না।
" ২০২০-এ সাহিত্যে নোবেলবিজয়ী মার্কিন কবি লুইস গ্লুকের (১৯৪৩- ) কবিতা তর্জমা করতে গিয়ে আমার যে অনুভূতি হলো তা আলোচনা করছি। আমি গ্লুকের লেখার ধাঁচ, ভাষার ব্যবহার ও সর্বোপরি তার কাব্যদর্শন বিষয়ে আলোকপাত করব। গ্লুকের লেখনী ছুঁয়ে আলোচ্য বিষয়গুলোই তুলনা করবো বাংলা কবিতার দুই দিকপাল সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ও জীবনানন্দ দাশের সঙ্গে। প্রায় স্বগোতোক্তিচ্ছলে বলে যাওয়া গ্লুকের কবিতায় আমরা যাপিত জীবনের গ্লানি ও ক্লেদ, আর এ থেকে উত্তরায়ণের ইঙ্গিত খোঁজার চেষ্টা করবো।
তর্জমাকালে প্রথম যে বিষয়টি লক্ষ্য করি তা এই, কবিতায় তিনি মিতভাষী; কোথাও কোনো বাড়াবাড়ি নেই, আর বিশেষণ ব্যবহার করার ব্যাপারে তাঁর বিশেষ অনীহা। যেমন ‘নিশীথ পরিযাণ’ কবিতায় তিনি বলছেন ‘রেড বেরিস/ লাল জাম’ তর্জমার সময় আমি ভাবছিলাম লাল জামের সাথে ‘টকটকে’ জুড়ে দিল বেশ দেখাতো। এবং এজাতীয় সোজাসাপ্টা কথা তার প্রায় প্রতিটি কবিতাতে রয়েছে। তিনি রূপকগুলোকে এমনভাবে এনেছেন যেন এরা সরাসরি কবিতায় অংশগ্রহণ করছে। শুধু বিশেষণ কেন, শব্দ খরচ করার ক্ষেত্রে তাকে আমার ভীষণ সংযমী মনে হয়েছে। এই যেমন ‘খেয়াল’ কবিতার তৃতীয় স্তবকে “তারপর ওরা সন্তাপগৃহে ফিরে যায়” এই ‘ওরা’ টা কারা? ‘নিশীথ পরিযাণ’ কবিতার দ্বিতীয় স্তবকে “আমরা নির্ভর করি এসবে/এরা মিলিয়ে যায়” আমরা কিসে নির্ভর করি আর কেনইবা এদের মিলিয়ে যেতে হয়? মাঝে মাঝে আমার মনে হয়েছে প্রনাউন রেফারেন্সে আমি খেই হারিয়ে ফেলছি। লিখতে বসে প্রগলভতা না আনা, অলংকারকে ‘না’ বলা কঠিন, আর এই না ভাবটা তিনি তার লেখনীতে শক্ত করে ধরে রেখেছে। একদম ‘চাপা হাসি মাপা কান্না’ জাতীয় অমিত সংযমে তার কবিতা এগিয়ে চলতে দেখেছি।
গ্লুকের কবিতার দ্বিতীয় বিষয়টি হলো শব্দ বাছাই করা। তিনি জটিল-কুটিল শব্দ লেখায় তেমনভাবে আনেননি, যেটা তার মিতভাষিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত হতে পারে। এই বিষয়টি কিন্তু প্রথমে আলোচনা করা বিষয়ের পরিপূরক। বোধ হয় লিখতে বসে এই ছিমছাম, সোজা ভাব ধরে লিখে যাওয়া বাংলা কবিতার জগতে খানিকটা বিরল ঘটনা। গ্লুকের কবিতায় মিনিমালিস্ট আন্ডারটোনে বলা একধরণের চাপা উত্তেজনা থেকে যায়, যে কোনা ব্যাপারে প্রতিহত হবার স্বভাব এমন বলা যায়। এ বিষয়ে বলবো, মানুষের ব্যক্তিত্বের মতো লেখার স্টাইলটাও খুব ব্যক্তিগত একটা প্রকাশ মাধ্যম; এত বছরের সাহিত্যের ক্যারিয়ারে তিনি সেটা হোমোজেনিয়াসলি সেটা ধরে রেখেছেন।
তৃতীয়ত, তার কবিতায় বিশেষ লক্ষ্যনীয় যে, তিনি, খানিকটা জীবনানন্দ দাশের মতোই, মৃত্যুকে গ্রহণ করেছেন জটিলতাপূর্ণভাবে। হয়তো জীবনানন্দের মতো সেটা এত মারাত্মক রকমের জটিল না, কিন্তু বেশ খানিকটা। জীবনানন্দের মতোই গ্লুকের অধিকাংশ কবিতা জীবনের অর্থে গুরুগম্ভীর প্রকষ্ঠে আবদ্ধ। জীবন-মৃত্যু তাঁদের কাছে বিশৃঙ্খল কিংবা অমীমাংসিত এক ধাঁধা। মৃত্যু যে শূন্যতার সম্ভাবনা নিয়ে আসে, সেই প্রকাশটা গ্লুকের লেখার পরিমিতিবোধের কারণে আরও ফাঁকা, আরও নিঃসঙ্গ। বিপরীতে বলা যায় জীবনানন্দের কাছে মৃত্য আত্মঘাতিক, সহিংস এবং জমজমাট আয়োজনে ঠাঁসা।
জীবন-মৃত্যুর ধারণার সাথে এ পর্যায়ে আমরা জুড়ে দিতে পারি গ্লুকের সময়ের ধারণা, যেখানে তিনি অনেকটা জীবনানন্দের মতো। দুজনের কবিতায় বর্তমান-অতীত-ভবিষৎ সময়ের প্রতিনিধিত্ব করে না; সময় তার স্বাতন্ত্রহীন রূপ নিয়ে তার বিচিত্রতায় আবর্তন ঘটিয়ে চলে মাত্র।
নোবেল পাবার পর এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান যে দশ বছর বয়স থেকেই তিনি নাকি মৃত্যু নিয়ে লিখছেন! পাঠক হিসেবে ধারণা করি, এত অল্প বয়স থেকে যিনি মৃত্যু ভাবনায় কাতর, তার লেখায় মৃত্যু বর্ণ অথবা বর্ণহীন, গন্ধ অথবা গন্ধহীন ভাবে মিশে না থেকে যায় না।
পঞ্চমত, এ বিষয়টা খুব স্পষ্ট তার কবিতায় যে আধুনিক ও উত্তরাধুনিক কবিদের মতো গ্লুকও মানুষের মনের ছায়াময় দিকগুলো তুলে ধরেন। শব্দ আর বাক্যের অন্তরালে তিনি হৃদয়ের স্পর্শকাতরতা, একাকীত্ব, পারিবারিক বন্ধন, বিবাহবিচ্ছেদ, মৃত্যু, কাম, ক্রোধ, বেদনা, হতাশা– এসবের অভ্যন্তরীন কথোপকথন মেলে ধরেন। আমরা জানতে পারি রোজানা ওয়ারেনের ভাষ্যে (যিনি একজন বিশিষ্ট মার্কিন কবি) যে, লুইসের প্রাথমিক পর্যায়ের কাব্যে স্থান পেয়েছে ব্যর্থ প্রেম, অপূর্ণ ভালোবাসা, ভেঙে যাওয়া পরিবার, শোক, সন্তাপ, বিরহ, ইত্যাদি। আর শেষের দিকে এসে তিনি খুঁজে পেয়েছেন আত্মিক একাকীত্ব। এই একাকীত্বের সঙ্গে মিশেল দিয়েছেন চিরায়ত মিথ ও উত্তরাধুনিক বিচ্ছিন্নতা।
পরিশেষে, সেই চিরায়ত মিথ ও পৌরাণিক কেচ্ছা প্রচ্ছন্নভাবে ফিরে আসে তার লেখায়; সেটা শুধু ফিরেই আসে না, তারা পাকাপোক্তভাবে জায়গা করে নেয়। আর এসব বিষয়ের মিথস্ক্রিয়া ঘটেছে ‘আভের্নো’য় যেটা তিনি গ্রীক মিথ চরিত্র দেবী পারসেফনের ভাবনাকে ধারণ করে লিখেছেন। আমি ‘ভক্তি পুরাণ’ কবিতাটি ‘আভের্নো’ থেকে নিয়েছি। সেই একই সাক্ষাৎকারে তিনি বলছেন, শৈশবে পড়া পুরাণ বারে বারে তার কবিতার রসদ জুগিয়েছে ও পুষ্ট করেছে।
যেতে থাকল পেরিয়ে, আলো ছড়াতে ছড়াতে।
আলোচনার রাশ টানছি গ্লুক প্রসঙ্গে একথা বলে যে তার কবিতা নির্মেদ, নির্বহুল ও খানিকটা নৈর্ব্যক্তিক। এখানে কিন্তু না বললেই না যে গ্লুক এই উত্তরাধুনিক সময়কালে ইংরেজি কবিতায় ‘মিতভাষ’ ধরে রেখে, তথা যথেষ্ট বেসিক ফর্মে রেখে, প্রায় স্বগতোক্তির ছলে শ্লোকের আকারে তিনি কবিতা বলে যান। এই স্বগতোক্তির বিষয়টি চোখ এড়িয়ে যায়নি ‘নিউইয়র্ক টাইমস’ এর সাহিত্য সমালোচক উইলিয়াম লগানেরও। আমি গ্লুকের কাব্যাদর্শে দেখতে পাই প্রতীকী কবিদের স্বল্পভাষ, ব্যঞ্জনাধর্মী সংহতি, ইন্দ্রিয়ঘনত্ব, নৈর্ব্যক্তিকতা, এবং সর্বোপরি জীবনজারিত অভিজ্ঞতা।
কবি লুইস গ্লুক, আপনাকে অভিনন্দন।
লুইস গ্লুক - এর কবিতা (অনুবাদ - বিপাশা বিনতে হক)
খেয়াল
একটা কথা বলি: প্রতিদিন
মানুষ মারা যাচ্ছে। আর সেটা সবে শুরু।
প্রতিদিন, সন্তাপগৃহে, নতুন বিধবার জন্ম হচ্ছে,
নতুন অনাথের সাথে। ওরা হাত ভাঁজ করে বসে থাকে,
নতুন জীবনটাকে বুঝে নেবার চেষ্টা করে।
তারপর ওরা গোরস্তানে যায়, সেখানে অনেকের
ওটা প্রথমবারের মতো যাওয়া। ওরা কাঁদতে ভয় পায়,
কখনো বা না কাঁদতে। কেউ একজন ঝুঁকে পড়ে
ওদের বলে দেয় এরপর কি কর্তব্য। হতে পারে সেট একটা সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেয়া, ক্ষেত্র বিশেষে খোলা কবরে একমুঠো মাটি ছুঁড়ে দেয়া।
তারপর ওরা সন্তাপগৃহে ফিরে যায়।
হঠাৎ করে দর্শনার্থীতে ফুলে ফেঁপে ওঠে ঘর।
বিধবা ভদ্রমহিলা সোফায় আসন গ্রহণ করেন; একদম রাজকীয় কায়দায়,
আর দর্শনার্থীরা সারিবদ্ধভাবে তার দিকে এগোতে থাকে,
কেউ তার হাত স্পর্শ করে, কেউ তাকে আলিঙ্গন করে,
সকলের জন্য তার কিছু না কিছু বলার থাকে;
তিনি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন, তাকে দেখতে আসার জন্য শুকরিয়া আদায় করেন।
মনে মনে তিনি চান সবাই চলে যাক।
তিনি ফিরে যেতে চান কবরস্থানে;
ফিরে যেতে চান হাসপাতালে, যে ঘরে তার সেবা শুশ্রুষা হতো, সে ঘরে।
তিনি ভালোই জানেন, এসব সম্ভব না। কিন্তু এটাই যে তার একমাত্র আশা,
আশা এই যে আবার যদি পুরোনো সময়ে ফিরে যাওয়া যায়। খুব বেশি পিছনে না,
বিবাহ পর্যন্ত দূরে না, প্রথম চুম্বনের মতো দূরেও না।
ভক্তি পুরাণ (A Myth of Devotion)
হেডিস্ যখন ঠিক করলেন যে তিনি এই মেয়েটির প্রেমে মজেছেন
সবই একরকম রইলো, হুবহু রইলো এর তৃণভূমি,
তিনি তার জন্য একটি বৈকল্পিক পৃথিবী রচনা করলেন,
সবই এক রইলো, সূর্যালোক সহ, ভাবা কঠিন যে একজন তরুণী
তাতে শুধু একটি বিছানা সংযোগ করে দিলেন।
কড়া সূর্যালোক থেকে সহসা ঘুটঘুটে অন্ধকার সহ্য করে নেবে।
ক্রমশ তিনি ভাবলেন যে রাতের সূচনা করবেন,
তাতে অন্ধকারটা উড়ে বেড়ানো পত্রপল্লবের ছায়ার মতো করে দেখাবে শুরুতে।
তারপর আসবে চাঁদ, তারা। তারপর চাঁদহীন, তারাহীন আকাশ।
পার্সিফোন এসবে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হোক।
শেষে তিনি ভাবলেন, এই পরিস্থিতিগুলো সে স্বাভাবিক বলে মেনে নেবে।
একটি বিকল্প পৃথিবী
শুধু ব্যতিক্রম এই যে এখানে প্রেম রয়েছে।
সকলে কি প্রেম কামনা করে না?
বহু বছর তিনি প্রতীক্ষা করলেন,
দুনিয়া সৃষ্টি করা, তার তৃণদলে পার্সেফোনকে নজরে রাখা।
পার্সেফোন গন্ধ শোঁকে, চেখে দেখে স্বাদ।
তোমার যে কোনো এক ধরণের ক্ষুধা থাকা মানেই
সব ধরণের ক্ষুধা থাকা, তিনি মনে করলেন।
প্রতি রাতে সবাই কি চায় না প্রিয় শরীর, কম্পাস, ধ্রুবতারা,
শান্ত নিঃস্বাশ, বলে দেয় আমি বেঁচে আছি,
তার মানে এখনো তুমি বেঁচে আছো,
তুমি আমাকে শুনতে পাচ্ছ, তুমি আমার সাথে আছো।
আর যখন একজন পাশ ফিরে শোয়, অন্যজনও পাশ ফিরে শোয়–
অন্ধকারের দেবতা এসবই ভাবছিলেন,
পার্সেফোনের জন্য সৃজন করা দুনিয়ার দিকে তাকিয়ে।
এ কথা একবারও তার মনে আসেনি যে
এর মানে এখানে আর কোনো ঘ্রাণ রইলো না,
এখানে আর খানাপিনার তো প্রশ্নই ওঠে না।
অপরাধবোধ? আতঙ্ক? ভালোবাসার ভয়?
তিনি এসব কল্পনাও করতে পারেন না,
কোনো প্রেমিকই এগুলো ভাবে না।
তিনি স্বপ্নে বিভোর থাকেন, ভাবতে বসেন এই দুনিয়াকে কি নামে ডাকবেন।
প্রথমে ভাবেন: নতুন নরক। তারপর: উদ্যান।
পরিশেষে এর নাম রাখেন পার্সেফোনের মেয়েবেলা।
নরম আলো জেগে ওঠে শয্যার পেছনে, ঘাসের সমান করে ছাটা মাথায়।
তিনি তাকে বাহুতে জড়িয়ে নেন।
তিনি বলতে চান আমি তোমাকে ভালোবাসি,
তোমার ক্ষতি করার সাধ্য কারও নেই।
তারপর তিনি ভাবেন
এটি একটি ডাহা মিথ্যে কথা, তাই তিনি বলে ওঠেন
তুমি এখন মৃত, কেউ তোমাকে কষ্ট দেবে না আর
তার কাছে বিষয়টা আরও নতুন, সম্ভাবনাময় ঠেকলো,
আরও সত্য দেখালো।
নিশীথ পরিযান
এখনই সেই মুহূর্ত যখন তুমি আবারও দেখতে পাও
পাহাড়ের ছাইয়ে জন্মানো লাল জাম
আর অন্ধকার আকাশে
পাখিদের নৈশকালীন পরিযাণ।
আমি মুষড়ে পড়ি, ভাবি
মৃতেরা এই দৃশ্য আর দেখতে পাবে না ;
আমরা নির্ভর করি এসবে,
এরা মিলিয়ে যায়।
কি করলে তবে প্রাণে সান্ত্বনা পাবো?
নিজেকে বলি হয়তো ওদের এসব বিলাসিতা লাগে না;
হয়তো কিছু না হয়ে থাকাটাই যথেষ্ট,
যদিও তা কল্পনায় আনা কঠিন।
রোদ্দুরের এমন ঝিলিক
বরফগুলোও হিরের মতো জ্বলছে,
জীবন আলো-হাসি হাসছে আর
উষ্ণতায় ভরে আছে আমার সর্বস্ব।
কার ইঙ্গিতে এত আলো, এত হাসি
কে এই আনন্দের কারিগর!
কাঁধের ওপর দিয়ে বরফ ছুড়ে দিলাম
এরা সব আমারই থাকুক।
তবু মেঘ জমেছে কার্বনের মতো
ফিরে আসছে ভয়ংকর কালো
কোথায় হারাল আনন্দ আর আলো!
সূর্যের কাছে হাত পেতেছিলাম, শান্তির কাছেও
এই তো ছিল; এই নেই।
আনন্দ শব্দটা ধুলোজমা শব্দের মতো অতীতে হারালো...
অনেক দিন তাকে খুঁজে পাই না।
সুখ
দুজন শুয়ে আছে রাত্রির কোলে
সাদা বিছানার চাদরে শুয়ে আছে দুজন মানুষ।
ভোর খুব কাছে,
এইবার ওদের ঘুম ভাঙবে
মাথার কাছে লিলি জাগছে ফুলদানিতে
সূর্যের আলো ওদের পানপাত্রে তৈরি—
এখনই চুমুক দেবে।
পুরুষটি পাশ ফিরল, কোমল স্বরে ডাকল সঙ্গীকে
পর্দাটা দুলে উঠল, গেয়ে উঠল পাখিরদল
নারীটি এবার পাশ ফিরল, আর তার সর্বাঙ্গ
তপ্ত হলো সঙ্গীর নিঃশ্বাসে।
চোখ খুললাম আমি...
সূর্যেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে ঘরময়
আমি তোমার মুখের দিকে তাকালাম,
আয়নায় দেখতে পেলাম আমাকেই।
আমরা স্থির; শুধু সূর্যটা আমাদের
যেতে থাকল পেরিয়ে, আলো ছড়াতে ছড়াতে।

Post a Comment