কবিতা লিখতে আসা যে কজন কবিকে আমাদের দেখার সৌভাগ্য হয়েছে তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন রুমা তপাদার।

Story and Article

 

শব্দ ও দৃশ্যের প্রজ্ঞা থেকেই জীবন মহিমার অন্বয় রচনা

🍁
তৈমুর খান
🍀
কবিতা লিখতে আসা যে কজন কবিকে আমাদের দেখার সৌভাগ্য হয়েছে তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন রুমা তপাদার। সম্প্রতি প্রকাশিত তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ 'এসো শব্দ এসো দৃশ্য'(জানুয়ারি ২০২২) পাঠ করতে গিয়ে আমার এমনই মনে হল। কবিতা শুধু ভাবের বাক্যবিন্যাস নয়, তার অভ্যন্তরে উপলব্ধির গভীর দর্শনও বিরাজ করে। রুমা সেটা পেরেছেন। বক্তব্য-বিবৃতিকে দূরে সরিয়ে শব্দ-দৃশ্যের অভিক্ষেপে ব্রহ্মজীবনের স্বরূপ সন্ধান করতে। তাঁর ভাষা পরম্পরায় যে মেদুর প্রাজ্ঞতা সাবলীল হয়ে উঠেছে তা একজন প্রকৃত কবিরই নিজস্ব অভিব্যক্তি সেকথা বলাই বাহুল্য।
মোট ৫৬ টা কবিতা নিয়ে 'এসো শব্দ এসো দৃশ্য' পূর্ণতা পেয়েছে। প্রথমেই পাঠক উপলব্ধি করতে পারবেন জন্মের কষ্ট কতখানি। প্রতিমুহূর্তে কতবার জন্মাতে হয় এবং কতবার সহিষ্ণু শক্তিকে বৃদ্ধি করতে হয়। মাত্র দুটি শব্দ এই কাব্যের মূল আধারে বিরাজ করছে: 'সহ্য' এবং 'জন্ম'। জন্মের সহ্য আছে, আবার সহ্যের জন্ম আছে। মাঝখানে 'ভাঙা' ক্রিয়াটি এই দুটিকেই গতিশীল করেছে তীব্রভাবে। কবি লিখেছেন:
"আরও সহ্য
ভাঙো জন্ম
ভাঙো সহ্য
আরও জন্ম"
এই প্রক্রিয়ার যেন শেষ নেই। জীবন এর মধ্যেই চক্র তৈরি করে বয়ে চলেছে। তাই জন্মও মৃত্যুর মধ্যে ফিরে এসেছে। আগুনের মধ্যেও ফিরে এসেছে। অন্ধকারের মধ্যেও ফিরে এসেছে। আকাশ-বাতাস-জলের মধ্যেও জন্ম ঘুরপাক খেয়েছে। বিস্তৃত হয়েছে। এই জন্মই ব্রহ্মজন্মের মহাসমারোহে মিশে গেছে। ঋকবেদের দেবীসূক্তে উল্লেখ আছে:
"অহমেব বাত ইব প্রবাম্যারভমাণা ভুবনানি বিশ্বা।
পরো দিবা পর এনা পৃথিব্যৈতাবতী মহিমা সম্বভূব।"
অর্থাৎ বায়ু যেমন নিজে থেকেই প্রবাহিত হয়, আমিই সেইরূপ স্বাধীনভাবে পঞ্চভূতের সমস্ত কার্য করে থাকি। নির্লিপ্তভাবে আমি বিশ্বের সকল বিকারের উপরে অবস্থান করি। কবির ব্রহ্মদর্শনে এই সত্যই সঞ্চারিত হয়েছে।
স্বাভাবিকভাবেই কবি নিজেকে দেখে পৃথিবীকে দেখতে শিখেছেন। নিজের রূপান্তরে জন্মান্তর খুঁজে পেয়েছেন। এই দার্শনিক চেতনাই তাঁর শব্দসাধনাকে তীব্র ও তীক্ষ্ণ করে তুলেছে। শব্দই যেহেতু ব্রহ্ম, আবার ব্রহ্মই যেহেতু শব্দ—সুতরাং উভয়েরই উচ্চারণ নানা ভাবে উঠে এসেছে এই কাব্যে। কবি নিজেই বলেছেন পৃথিবীর মেয়ে হয়ে, শব্দের ঔরসজাত হয়ে তিনি 'সৌরস্বভাব' লাভ করেছেন। এরকমই 'শব্দ' কবিতাটির কিছুটা অংশ:
"যেখানে অতল কণ্ঠস্বর ঘোর হয়ে কানে থাকে
শব্দ, সেখানেই দৃষ্টি ছোঁয়াও।
একাকী দাঁড়িয়ে যে মেয়েটি পৃথিবীর মেয়ে হতে
শব্দ, তুমি তাকে গর্ভে নাও।
শব্দ, তুমি তাকেই ঔরসজাত করো।"
এই শব্দই ব্রহ্মের কণ্ঠস্বর। তখন তাঁর কবিতার আলোর কাছে আমাদের দাঁড়াতে হয়। অন্ধকারের কাছেও দাঁড়াতে হয়। রবীন্দ্রনাথ আগেই জানিয়েছেন:"অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো/ সেই তো আমার আলো।" তখন আলোও অন্ধকারের পরিপূরক। আর রাত্রি তো তার ছবি। কবি লেখেন:
"ভাবলেই রাতের মতো ছবি হয়ে যাও তুমি।"
অথবা
"দুহাত পেতেছি আজ সমস্ত আলোর সামনে।"
এই আলো ও অন্ধকারে সেই ব্রহ্মই জেগে ওঠেন যাকে 'ঈশ্বরের চোখ' বলেছেন কবি।
আর এই ব্রহ্মের মধ্যেই ব্রহ্মাণ্ডকে পেয়ে যান। তখন নক্ষত্রযাপনেরও টের পান। যে পঞ্চভূতের শরীর—আকাশ, আগুন, জল,বায়ু ও মাটি সবই সেখানে বিদ্যমান। কবি লেখেন:
"দূরত্বের মধ্যে একটা আকাশ-আকাশ গন্ধ আছে
ঘননীল বিশ্রামের গন্ধ
জলের মতোই পাশ কাটিয়ে ঝরে পড়ার উদাসী ভাব
বয়ে চলার অসুখ আছে ওতে"
(দূরত্ব)
পঞ্চভূতের কার্যকারণের মধ্যেই এভাবেই ব্রহ্মের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। কবি আরও খোলসা করে এর ব্যাখ্যা করেন। যে 'বীজমন্ত্র' অনন্তের মধ্যেই প্রবহমান— তার মৃত্যু বা জন্মের কোনও সীমানাও থাকতে পারে না। আকাশ দূরত্বের হলেও তা ব্রহ্মাণ্ডেরই অসীমতাকেই নির্দেশ করে। মাটিও সেখানে কার্যকরী একটি আধার। তাই কবি লিখলেন:
"একজীবন রয়েছে এই পৃথিবীতে
শুধু আকাশের দিকে নয়
পৃথিবীর কেন্দ্র দেখো চোখ খোলো
মাটি খোঁড়ো, মাটি ছড়াও সরাও
এই পৃথিবীর সবথেকে বড় বীজ মাটি।"
পঞ্চভূতের পূর্ণতায় মাটির এই অবদানকে স্বীকার করেই কবির নিজ নির্মাণেরও স্বরূপ উপলব্ধ হয় বলেই লিখতে পারেন:
"জমিন মানে তো বুক"
'জমিন' শব্দের মধ্যেই মাটির দর্শন লুকিয়ে থাকে। যে মাটির অসীম শোষণক্ষমতা। যার ভিতর 'কান্নাজল' গড়িয়ে যায়। যার ভিতর পাথরের মতো স্তব্ধতা বিরাজ করে। যার ভিতর বাতাসেরও দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়। কিন্তু এতদসত্ত্বেও বীজমন্ত্র যে উজ্জীবন ফিরে পায় তার অনর্গল জন্মমুহূর্তের মধ্যে—তা কবিও জানেন। সেই কারণেই পঞ্চভূতের আবেগচারণায় জন্ম-মৃত্যুর চক্র ঘুরতে থাকে। কিন্তু 'বীজমন্ত্র' থেকে যায়। এই বীজমন্ত্রই 'শিকড়'। কবি লিখেছেন:
"কত অন্ধকার বুকে নিয়ে চেয়ে রয়েছে শিকড়
মাটির গভীরে থাকা জলের শরীরে।
জলের ভিতরে লাভা
মাটি বলে কেউ নেই
জল বলে কিছু নেই
শুধুমাত্র বিচ্যুত-উত্তাপ শান্ত হয় যার কাছে এসে
তাকেই পৃথিবী বলি।
প্রত্যাশা রাখিনি কিছু
নিজেকে আড়াল রাখি দিগন্ত-পাঁজরে তার;"
পৃথিবী সৃষ্টির সময় থেকেই কবিও এই ব্রহ্মাণ্ডের আদিচেতনায় গ্রস্ত এবং অবিন্যস্ত হয়ে আছেন। তাই পৃথিবী-ভাবনায় নিজেও 'পৃথিবী' হয়ে গেছেন। প্রতিটি আলোর অবিমিশ্র জন্মস্রোতে আত্মপ্রকাশ উপলব্ধি করেছেন। এই আত্মপ্রকাশ 'শব্দ' ও 'দৃশ্যে'র নিহিত তাৎপর্যেই বিনির্মাণ রচনা করেছে:
"এসো শব্দ, এসো দৃশ্য
আমাকে দিগন্তজ্ঞানে মুঠোবন্দি করো।
হাওয়ার আঘাত শব্দ
জলের আঘাত শব্দ
ভালোবাসাই, আমাকে সমস্ত শেখাল।"
শব্দ ও দৃশ্যের এই প্রজ্ঞা থেকেই জীবন মহিমার অন্বয় রচনা করে চলেছেন কবি। সেখানে ভালোবাসাই মূল বিভাবের অনুজ্ঞা। জীবন-মন্থনের অন্ধকারেই প্রকৃত অমৃতের অনুসন্ধান। যাকে কবি বলেছেন:
'সহজ আনন্দ'
'সহজ দুঃখবোধ'
ব্রহ্মাণ্ডের প্রাচুর্যে আত্মদর্শনের প্রক্রিয়াটি এই দুটি শব্দেই সর্বদা সচল হয়ে উঠেছে—'আনন্দ' ও 'দুঃখ'। এই দুটি শব্দই ভিন্নমাত্রায় তাবৎ স্রষ্টার কাছেই ফিরে আসে। 'সহ্য' ও 'জন্ম'-এর মধ্যে দিয়ে এই দুটি শব্দকেই লালন করেছেন। বিখ্যাত ফরাসি ঔপন্যাসিক দ্যুমা দাভি দ্য লা পাইয়্যত্রি যাঁর প্রচলিত নাম আলেক্সঁদ্র দ্যুমা (১৮০২-৭০)। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন:
"All human wisdom is contained in these two words—wait and hope."
অর্থাৎ মানুষের সমস্ত জ্ঞান এই দুটি শব্দের মধ্যে নিহিত—অপেক্ষা এবং আশা। এই 'অপেক্ষা' ও 'আশা' কাব্যের শেষ অংশে 'ব্রহ্মাণ্ডের কাছে দাবি' কবিতায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে :
"আলো জব্দ হও,আলো জব্দ হও, দাও চাবি
সূর্যের উপরে যাব
নিজস্ব ইশারা-জোরে
ব্রহ্মাণ্ডর কাছে আজ এইমাত্র দাবি।"
এই অপেক্ষা এবং আকাঙ্ক্ষা নিয়েই জীবনের প্রজ্ঞায় উজ্জীবিত হয়েছেন রুমা তপাদার। নিজেকে অন্বেষণ করেই তাঁর আত্মযাত্রা অব্যাহত রেখেছেন। নির্মেদ কবিতাগুলি উজ্জ্বল উপলব্ধির বাঙ্ময় প্রকাশ হয়ে উঠেছে।
🌳
এসো শব্দ এসো দৃশ্য: রুমা তপাদার,কবিতা আশ্রম প্রকাশন, চাঁপাবেড়িয়া, বনগাঁ, উত্তর ২৪ পরগণা-৭৪৩২৩৫,প্রচ্ছদ : দেবাশীষ সাহা, মূল্য-২০০ টাকা।


ছবিতে রুমা তপাদার
Story and Article

Story and Article