স্প্যানিশ-আমেরিকান কবিতা নিয়ে যখন কথা ওঠে , তখন প্রথম যে নামটি মনে আসে, তাঁর নাম 'রুবেন দারিও' ,

Story and Article

 

স্প্যানিশ কবিতা সংক্ষিপ্ত রূপরেখা

[ধারাবাহিক লেখা (প্রথম থেকে চতুর্থ পর্ব)]
শংকর ব্রহ্ম
স্প্যানিশ-আমেরিকান কবিতা নিয়ে যখন কথা ওঠে , তখন প্রথম যে নামটি মনে আসে, তাঁর নাম 'রুবেন দারিও' , যার কবিতার সাথে আধুনিকতা তথা স্প্যানিশ-আমেরিকান কবিতার শিকড়ের যোগাযোগ রয়েছে।
রুবেন দারিও এ শতাব্দীর শুরুতে অন্তত কুড়ি বছর স্প্যানিশ কবিতায় রাজত্ব করেছেন।
স্পেনের সাহিত্য তখন প্রধানতঃ ফরাসীদের ছত্রছায়ায় মুগ্ধ ছিল। স্প্যানিশ ভাষায় সে'রকম কোনও সাহিত্য আন্দোলন হয়নি। রুবেন দারিয়ে নিজেই একটি আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিলেন, যার নাম মডার্নিজম, যা আসলে অবশ্য তেমন কিছুই মডার্ন নয়। শুধু আধুনিকতা কথাটার উপর জোর দিয়েছিলেন। পূর্ববর্তীদের তুলনায় আলাদা কোনও চিন্তা ও রীতির সৃষ্টি করেননি, পুরনো সৌন্দর্যতত্ত্ব ও রক্তমাংসের বর্ণনার সঙ্গে তিনি ফরাসি সিম্বলিস্টদের রীতি জুড়ে ছিলেন মাত্র। যদিও লেখক হিসেবে তিনি অসীম শক্তিশালী ছিলেন,তাতে কোন সন্দেহ নেই।
দারিয়োর জন্ম দক্ষিণ আমেরিকার নিকারাগুয়ায়, তরুণ বয়েসে নানা দেশ ঘুরে তিনি চিলিতে এসে কিছু সাহিত্যিকের সংস্পর্শে এসে ফরাসি সিম্বলিস্ট কবিতার সঙ্গে পরিচিত হয়ে, প্রভাবিত হয়েছিলেন। সেই প্রভাব তাঁর রচিত কয়েকটি গ্রন্থে দেখা যায়,যা তাকে প্রভূত জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছিল এবং মূল স্প্যানিশ ভুখণ্ডেও তিনি অবিলম্বে প্রধান কবির স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। তাঁর একটি ভক্তদল গড়ে ওঠে এবং 'মডার্নিজম' কথাটির সূত্রপাত হয়। আসলে তাঁর বিষয়বস্তু ছিল বাস্তব থেকে পলায়ন, বিশুদ্ধ রূপের স্তুতি, বিদেশ বা অচেনা দেশের আঁকজমকপূর্ণ বর্ণনা এবং বোদলেয়ারের কাছ থেকে পাওয়া অবক্ষয় ও পাপের প্রতি কৌতূহল। ১৯১৬-তে রুবেন দারিয়োর মৃত্যুর অল্পদিনের মধ্যেই মডার্নিজমেরও মৃত্যু হয়। দারিয়োর রচনা এখন প্রায় ক্লাসিকাল পর্যায়ে পড়ে।
রুবেন দারিও (১৮৬৭-১৯১৬)
(নিকারাগুয়া)
অমোঘ নিয়তি
বৃক্ষেরা সুখী কারণ তারা নিশ্চেতন বললেই চলে
কঠিন শিলা সংবেদনহীন বলে আরো বেশি সুখী
বেঁচে থাকার মতো এতো বিপুল যন্ত্রণা কিছুতে নেই
সজ্ঞান জীবনের মতো কোনো বোঝা এতো ভারী নয়।
কী যে হবো জানা নেই, জ্ঞান নেই, এটা সেটা ত্রুটি
যা আছি তাতেই ভয়, যা হবে আতঙ্ক তার…
কালকেই পটল তোলার সুনিশ্চিত বিভীষিকা,
আজীবন কষ্ট পাওয়া, অন্ধকার পার হওয়া
পার হওয়া যা জানি না, যা সন্দেহও করি না
এবং যে মাংস শীতল আঙুরগুচ্ছের সাথে আমাদের টানে,
যে কবর শেষকৃত্যের শুচিজলের অপেক্ষায় থাকে
এবং যে আমরা জানি না কোথায় যাবো
এবং জানি না কোথা থেকে আমরা এসেছি!…
জাতিগতভাবেই স্প্যানিশরা অনেকখানি রূপাভিলাষী। সৌন্দর্যতত্ত্বে ও বিশুদ্ধরূপের অনুসন্ধান পরবর্তী খাঁটি আধুনিক স্প্যানিশ কবিদের মধ্যেও দেখা যায়। কিন্তু সে সৌন্দর্যজ্ঞান নিছক সময় বহির্ভূত এবং নিছক অভিভূত প্রকাশ নয়।
হিমেনেথের অকিঞ্চিৎকর বর্ণনা বর্জনের প্রয়াস এবং লোরকার পল্লীগাথার প্রতি আকর্ষণও এক হিসেবে এই সৌন্দর্য পিপাসারই ইঙ্গিতবহ। অন্যান্য দেশের সমসাময়িক কালের মতো নিষ্ঠুরতা, বীভৎস রসের প্রাধান্য, অলৌকিক কিংবা সুপ্ত মনের ভয়াবহতার প্রকাশ স্প্যানিশ কবিতায় বিশেষ দেখা যায় না।
আনতোনিও মাচাদো দূরের দ্বীপে বসে তাঁর রচনাগুলিতে রুবেন দারিয়োর বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ জানিয়ে গেছেন। দারিয়োর বাইরের আড়ম্বর ও উচ্ছলতা পরিহার করে তিনি প্রবেশ করেছেন অন্তরে, তার ভাষা প্রায় গদ্যের কাছাকাছি সরল, কিন্তু তিনি নিজের আত্মার দিকে তাকিয়ে তবেই দেখতে চেয়েছেন প্রকৃতির রূপের প্রতিচ্ছবি, আবিষ্কার করতে চেয়েছেন ব্যক্তিগত ঈশ্বরকে।
এখান থেকেই শুরু হয়েছে স্প্যানিশ কবিতায় নবীন সার্বজনীনত্ব। এই শতাব্দীর শুরুতে স্প্যানিশ ভাষায় আলাদাভাবে উচ্চারণ করার মতো প্রচার কোনও সাহিত্য আন্দোলন দেখা দেয়নি, কিন্তু বেশ কয়েকজন শক্তিমান কবির রচনা উপহার পেয়েছি আমরা।
১৯৫৬ সালে হিমেনেথ যখন নোবেল পুরস্কার পান, তখন অনেক সমালোচক বলেছিলেন, এ পুরস্কার শুধু হিমেনেথের নয়, আসলে এ পুরস্কার মিলিতভাবে তিনজনের হিমেনেথ, মাচাদো এবং লোরকার, কেননা, শেষোক্ত দু’জন তখন বেঁচে ছিলেন না, নইলে তাদের পুরস্কার না দেওয়া হলে নোবেল পুরস্কারেরই অপবাদ হতো।
মিগুয়েল দে উনামুনো
এই শতাব্দীর স্প্যানিশ চিন্তা ও সংস্কৃতিতে উনামুনো এক বিশাল স্তম্ভস্বরূপ। সলোমাংকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে বসে তিনি যখন বন্ধু ও শিষ্যদের সঙ্গে গল্পগুজব করতেন তখন তা শোনবার জন্য দেশ-বিদেশ থেকে আসত লেখক ও দার্শনিকরা। তার কাছে গুণীজন আসতেন যেন তীর্থদর্শনে। স্পেনের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় সলোমাংকা, সেখানে উনামুনো ছিলেন গ্রিক ভাষার অধ্যাপক, পরবর্তীকালে ওখানে রেকটর হয়েছিলেন। তার এই প্রকার আলাপচারি সক্রেটিসের কথা মনে করিয়ে দেয় , উনামুনোর দুর্ধর্ষ প্রতিভার খ্যাতি ছড়িয়েছিল তরুণ বয়সেই। জন্ম ১৮৬৪, এবং বিংশ শতাব্দী শুরু হবার মুখেই তিনি তরুণ বুদ্ধিজীবী সমাজের দলপতি হয়ে ওঠেন।
পরবর্তীকালে দার্শনিক হিসেবে উনামুনো সর্বজনস্বীকৃতি পেলেও, তিনি ধর্মনেতা বা নৈতিক গুরুর ভূমিকা গ্রহণ করেননি কখনও। তিনি ছিলেন আজীবন বিপ্লবী, উনামুনো কথাটিরই শব্দার্থ বিজয়ী। গোঁড়া ক্যাথলিকদের দেশেও তিনি একটি ধর্মনিরপেক্ষ সাহিত্য সম্প্রদায় সৃষ্টি করেছিলেন। গলায় টাই পরতেন না, শৌখিন শার্ট গায়ে দিতেন না, কালো গলাবন্ধ কোট পরা তার চেহারা ছিল সাধুর মতো, কিন্তু কোন ধর্মের ক্রীতদাস ছিলেন না তিনি। যে'সময় রুবেন দারিও স্প্যানিশ কবিতায় আধুনিকতা এনে হইহই করছেন, বলছেন রক্তমাংসই শ্রেষ্ঠ দেবতা, তখন উনামুনো প্রকাশ করলেন সমস্ত সীমানা ভাঙার নির্দেশ। স্প্যানিশ সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে তিনি ইউরোপীয় তথা সর্ব জাগতিক হতে বললেন। মানুষ সম্পর্কেও তিনি বলেছেন, মানুষ তার জন্মভূমি থেকে লাফিয়ে সারা পৃথিবীর মধ্যে এসে ছড়িয়ে পড়ুক।
উনামুনো কবিতা লিখতে শুরু করেন ত্রিশ বছর পেরিয়ে যাবার পর। তার কাছে কবিতা ছিল, ব্যক্তিগত জীবনের মুহূর্তকে অনন্ত করা। মুহূর্তকে তিনি আদেশ করেছেন, 'তুমি দাঁড়াও, আমার ছন্দে তোমাকে আবদ্ধ করেছি'। এই কবিতাটি তার একটি অতি বিখ্যাত রচনা। বিষয় ও গভীরতায় কবিতাটি ভালেরির সমুদ্রের পাশে কবর-এর সঙ্গে তুলনীয়। কবিতাটিতে স্পষ্টত দুটি ভাগ, এখানে শুধু দ্বিতীয় ভাগটিরই অনুবাদ আছে। এই দ্বিতীয় অংশের যে বক্তব্য, তার অধিকাংশ রচনাও বহু বিতর্কমূলক বই দি ট্রাজিক সেন্স অব লাইফ-এরও বক্তব্য প্রায় এক। কবিতাটির প্রথম অংশে একটি কবরের বর্ণনা, সেখানে বৃষ্টি পড়ে, রোদ আসে, ভেড়ার পাল চরে বেড়ায়। দ্বিতীয় অংশে, কারখানার ক্রুশচিহ্ন মৃতদেহ পাহারা দেয়, আর জীবিত মানুষের জন্য কোনও ক্রুশ লাগে না কারণ ঈশ্বর স্বয়ং ব্যর্থ হয়ে মানুষের দিকে তাকিয়ে আছেন। নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখার জন্যই ঈশ্বরের মানুষকে দরকার। তুলনীয় রবীন্দ্রনাথের: 'আমায় নইলে ত্রিভুবনেশ্বর তোমার প্রেম হত যে মিছে।']
ক্যাসটিলিয়ার এক গ্রাম্য কবরে
(অংশ)
তোমার পাশ দিয়ে গিয়েছে পথ, জীবিত মানুষের
তোমার মতো নয়, তোমার মতো নয়, দেয়াল ঘেরা
এ পথ দিয়ে তারা আসে ও যায়
কখনও হাসে আর কাঁদে।
কখনও কান্নার কখনও বা হাস্যের ধ্বনিতে ভেঙে যায়
তোমার পরিধির অমর স্তব্ধতা!
সূর্য ধীরভাবে মাটিতে নেমে এলে
ঊষর সমতল স্বর্গে উঠে যায়
এখন স্মরণের সময় মনে হয়
বেজেছে বিশ্রাম ও পূজার ঘণ্টা
রুক্ষ পাথরের স্থাপিত ক্রুশখানি
তোমার মাটি ঘেরা প্রাচীরে দাঁড়িয়ে
নিদ্রাহীন অভিভাবক যেরকম
একলা প্রহরায় গ্রামের গাঢ় ঘুম।
জীবিত সংসারে গীর্জা ক্রুশহীন
এরই তো চারপাশে ঘুমোয় গ্রামখানি
ভক্ত কুকুরদের মতন ক্রুশখানি রয়েছে প্রহরায়
স্বর্গে যারা আছে, মৃতের সেই ঘুম।
রাত্ৰিময় সেই স্বর্গ থেকে যীশু
রাখাল রাজা তিনি
সংখ্যাহীন তার চোখের ঝিকমিকি
ব্যস্ত গণনায় মেঘের ঝাঁকগুলি।
দেয়াল ঘেরা এই কবরে মৃতদল
একই তো মাটি গড়া দেয়াল এখানের
শান্ত নির্জন মাঠের মাঝখানে
একটি ক্রুশ শুধু ভাগ্যে তোমাদের।
আনতেনিও মাচাদো
[ 'আমার হৃদয়ে বাসনার কাঁটা ফুটে ছিল। অনেক চেষ্টায় একদিন আমি সেই কাঁটাটা তুলে ফেললাম। তারপর থেকে আমি আমার হৃদয়ের অস্তিত্বই টের পাই না' —এই রকম সরল ভাবে আনতোনিও মাচাদো কবিতার মূল সত্যগুলি ব্যক্ত করতে পেরেছেন। পৃথিবী ও মানুষের জীবন ক্রমশ অতি জটিল হয়ে আসছে এই যুক্তিতে আজকের পৃথিবীর কবিতাও যখন জটিল—তখন মাচাদো অতি সহজ ভাষায় আশ্চর্য সৌন্দর্য সাধনা করে গেছেন। কবিতাকে তিনি বলেছেন 'আত্মার হৃৎস্পন্দন, শব্দ নয়, বর্ণ নয়, রেখা নয়, অনুভূতি নয়, কবিতা শুধু আত্মার হৃৎস্পন্দন।' এই নিবিড় ধ্যানময়তায় মাচাদো স্প্যানিশ ভাষায় এ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি।
জন্ম ১৮৭৫, দক্ষিণ স্পেনের আন্দালুসিয়ায়, শৈশব কেটেছে মাদ্রিদে, যৌবন ক্যাসটিলিয়ায়। ক্যাসটিলিয়ার বোরিয়া শহরে তিনি ছিলেন ফরাসি ভাষার শিক্ষক, এখানকার ভাঙা দূর্গ, দিউয়ো নদী, অরণ্য, পূর্বপুরুষের গর্ব নিয়ে বেঁচে থাকা বঞ্চিত মানুষ এই সব নিয়েই তার কবিতা। বিকেলবেলা তিনি একা হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতেন বহু দূরে, ফুলের সমারোহ আর ঝরে পড়া পাতার মধ্য দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তিনি কথা বলতেন নিজের সঙ্গে ( জীবনানন্দ দাশও তেমন করে কথা বলতেন, একা হাঁটতে হাঁটতে,সে'কথা শোনা যায়), প্রকৃতি তাকে মুগ্ধ করলেও তিনি প্রকৃতির স্তুতি পাঠক ছিলেন না, প্রকৃতি তাকে নিজের সঙ্গে কথা বলতে উদ্বুদ্ধ করত। এই রকম বেড়াতে বেড়াতেই বনের মধ্যে একদিন লিওনোর নামের একটি মেয়ের সঙ্গে দেখা হয়, সেই অপূর্ব রূপসীকে মনে হয় বনদেবী, মনে জেগে ওঠে ভালোবাসা। পরবর্তী কালে তিনি সেখানেই থেকেছেন, এই অঞ্চলটির কথা তার সব সময় মনে থেকেছে, এখানকার পরিবেশ নিয়েই লিখেছেন। ১৯৩৯-এ ফরাসি দেশে তাঁর মৃত্যু।
মাচাদো ধর্ম বিশ্বাসে ছিলেন অ্যাগনস্টিক বা নির্বিকার। তার অধিকাংশ কবিতারই নাম নেই, কারণ কবিতা যেহেতু আত্মিক উপলব্ধি—তাই তা রহস্যময় ও আখ্যার অতীত—এই ছিল তাঁর বিশ্বাস। সূর্য, ফুল, স্বপ্ন, আয়না— এই বিষয়গুলি তাঁর কবিতায় বারবার ঘুরে ঘুরে এসেছে।
তাঁর মরণের সময় মনে হয় -
'বেজেছে বিশ্রাম ও পূজার ঘণ্টা
রুক্ষ পাথরের স্থাপিত ক্রুশখানি
তোমার মাটি ঘেরা প্রাচীরে দাঁড়িয়ে
নিদ্রাহীন অভিভাবক যেরকম
একলা প্রহরায় গ্রামের গাঢ় ঘুম।
কাল রাতে ঘুমের ভিতরে
কাল রাতে ঘুমের ভিতরে
স্বপ্নে দেখি- দিব্য উদ্ভাসন
স্বচ্ছ এক ঝরণা বহে যায়
ঘুরে ঘুরে আমার হৃদয়ে।
বলল, কোন গুপ্ত গলি পথে
জল তুমি এলে আমার কাছে,
নতুন জন্মের ঝরণা তুমি
আমি যার পাইনি আস্বাদ?
কাল রাতে ঘুমের ভিতরে
স্বপ্নে দেখি— দিব্য উদ্ভাসন—
একখানি জীবিত মৌচাক
আমার হৃদয় জুড়ে আছে।
সোনালি রঙের মৌমাছিরা
কাজে ব্যস্ত হৃদয়ে আমার
খুঁড়ে খুঁড়ে পুরনো ব্যর্থতা
মোম আর মধু তৈরি করে।
কাল রাতে ঘুমের ভিতরে
স্বপ্নে দেখি— দিব্য উদ্ভাসন
একটি জ্বলন্ত সূর্য উঠে
জেগে আছে বুকের গভীরে।
সে ছিল জ্বলন্ত বিকিরণ
লাল উনুনের মতো তাপ
এবং সে সূর্য, তাই আলো,
সুর্য এসে আমায় কাঁদাল।
কাল রাতে ঘুমের ভিতরে
স্বপ্নে দেখি—দিব্য উদ্ভাসন—
সেই তো ঈশ্বর আমি যাকে
হাতের মুঠোয় ধরে আছি।
একটি বসন্তের ভোর আমায় ডেকে বলল
একটি বসন্তের ভোর আমায় ডেকে বলল
আমি তোমার শান্ত হৃদয়ে ফুল ফুটিয়েছি
বহু বছর আগে, তোমার মনে পড়ে পুরনো পথিক,
তুমি পথের পাশ থেকে ফুল ছেঁড়নি
তোমার অন্ধকার হৃদয়, সে কি দৈবাৎ মনে রেখেছে
আমার সেই পুরনো দিনের লিলির সুগন্ধ?
আমার গোলাপেরা কি এখনও ঘ্রাণ মেখে দেয়
তোমার হীরের মতো উজ্জ্বল স্বপ্নের পরীর ভুরুতে?
আমি বসন্তের ভোরকে উত্তর দিলুম:
আমার স্বপ্নেরা শুধু কাঁচ
আমি আমার স্বপ্নের পরীকে চিনি না
আমি তো জানিনি, আমার হৃদয় ফুলের মধ্যে আছে!
তুমি যদি সেই পবিত্র ভোরের জন্য অপেক্ষা করো
যে এসে ভেঙে দেবে কাঁচের পাত্র
তবে হয়তো পরী তোমার গোলাপ ফিরিয়ে দেবে
আমার হৃদয় দেবে তোমায় লিলির গুচ্ছ।
.
হুয়ান র্যামোন হিমেনেথ
[হিমেনেথের জন্ম ১৮৮১ সালে, মৃত্যু ১৯০৫ সালে। জন্ম মৃত্যুর মাঝখানে একমাত্র বড় ঘটনা হল তাঁর নোবেল প্রাইজ পাওয়া। সেকারণে তিনি সমস্ত বিশ্বে, এবং বাংলা দেশেও বহু আলোচিত হয়েছেন। হিমেনেথের শুধু দুটি কবিতা এখানে বাংলায় দেওয়া হলো। কবিতা দু'টি তাঁর জীবনের দুই প্রান্তের, প্রথমটি লিখেছিলেন যখন তিনি সদ্য-যুবা, আর দ্বিতীয়টি লেখেন বার্ধক্যে পৌঁছে, স্বদেশ থেকে দূরে সমুদ্রের অন্য পাড় আমেরিকায় যখন প্রবাসী। প্রথম কবিতাটি সংলাপের ভঙ্গিতে লেখা আর দ্বিতীয়টি কবির কণ্ঠস্বর । প্রথম স্তবকে জল ও ফুল নামক স্পর্শসহ অস্তিত্বে ব্যক্তিত্ব আরোপ করে, দ্বিতীয় স্তবকে এনেছে হাওয়া ও মায়া। হিমেনেথের কবিতায় দণ্ডিত কামেলাইট, সেন্ট জন অব দি ক্রশ- প্রভৃতি ছাব্বিশটি কবিতার জন্য যিনি অমর হয়ে আছেন— তাঁর যথেষ্ট প্রভাব আছে। হিমেনেথের বিখ্যাত কবিতাবলী, প্লাতেরো নামক একটি গাধার সঙ্গে কথাবার্তা, এই বিষয়টিও তিনি পেয়েছেন সেন্ট জন অব দি ক্রশের কাছ থেকে। জন নিজের শরীরটাকেই বলতেন, মাই ব্রাদার অ্যাস। অর্থাৎ, এখানেও, নিজের সঙ্গেই কথাবার্তা।
তাঁর রচনা যতটা গভীর, ততটা অবশ্য গতিশীল নয়। আধুনিক স্প্যানিশ কবিতায় হিমেনেথের অনুকরণ তেমন নেই।]
কেউ না
—ওখানে কেউ না। জল।— কেউ না?
জল কি কেউ নয়?—ওখানে
কেউ না। ফুল।—ওখানে কেউ না?
তবু ফুল কি কেউ না?
—ওখানে কেউ না। হাওয়া।—কেউ না?
হাওয়া কি কেউ না?—কেউ
না। মায়া।–ওখানে কেউ না? আর
মায়া কি কেউ না?
পাখিরা গান গায়
সারা রাত জুড়ে
পাখিরা
আমাকে শোনালে তাদের রঙের গান।
এই রং নয়
সুর্যোদয়ের ঠান্ডা হাওয়ায়
তাদের ভোরের ডানার
এই রঙ নয়
সূর্যাস্তের অগ্নিবর্ণে
তাদের সান্ধ্যবুকের
এই রঙ নয়
রাত্তিরে নিভে যাওয়া
প্রত্যহ চেনা ঠোঁটের
যে রকম নেবে
ফুল ও পাতার
প্রত্যহ চেনা রঙ
অন্য বর্ণ
আদিম স্বর্গ
এ জীবনে যাকে হারিয়ে ফেলেছে মানুষ।
সেই যে স্বর্গ
ফুল ও পাখিরা
শুধু যাকে চেনে গভীর
ফুল ও পাখিরা
সুগন্ধে আসে যায়
সৌরজগতে ঘুরে ঘুরে তারা ওড়ে
অন্য বর্ণ,
অবিনশ্বর স্বর্গ
মানুষ সেখানে স্বপ্নে ভ্রমণ করে।
সারা রাত জুড়ে
পাখিরা আমাকে শোনালে তাদের রঙের গান।
অন্য বর্ণ
শুধু রয়েছে তাদের অন্য জগতে
শুধু রাত্তিরে নিয়ে আসে তারা হাওয়ায়।
কয়েকটি রঙ
আমি তো দেখেছি অতি জাগ্রত
জানি আমি তারা কোথায়।
জানি আমি ঠিক কখন
পাখিরা আসবে
রাত্রে আমায় শোনাতে তাদের গান।
জানি আমি ঠিক কখন
পেরিয়ে বাতাস পেরিয়ে বন্যা
পাখিরা গাইবে গান।
লেয়ন ফেলিপ
[পৃথিবীর সব দেশেই প্রায় এই শতাব্দীর কবিতা সম্পর্কে দুর্বোধ্যতার অভিযোগ আছে। স্প্যানিশ কবিতা সম্পর্কে সে অভিযোগ নেই বললেই চলে। 'লেয়ন ফেলিপ' এমন একজন কবি, যিনি সরল, স্পষ্ট, কিছুটা গদ্যময় কবিতায় বিশ্বাসী। তার কবিতা বই পড়ার চেয়ে সভা-সমিতিতে আবৃত্তি শুনলে বেশি ভাল লাগে। এইরকম সর্বপ্রকাশ্য কবিতায় লেয়ন ফেলিপ অত্যন্ত জনপ্রিয়।
লেয়ন ফেলিপের পুরো নাম লেয়ন ফেলিপ কামিনো গালিথিয়া। জন্ম স্পেনে, ১৮৮৪। অন্যান্য অনেক স্প্যানিশ কবির মতোই, তিনিও গৃহযুদ্ধের সময় দেশ থেকে পলাতক হন। এখন মেক্সিকোয় স্থায়ী নিবাস।]
আমি নই গভীর সঞ্চারী
—’আমার গভীর সমুদ্র সঞ্চারী বন্ধু পাবলো নেরুদাকে’
আর, কালকেই এসে কেউ বলবে:
এই কবি তো কোনোদিন সমুদ্রের গভীরে আসেনি
এমনকী ছুঁচো বা নেউলের মতো মাটি খুঁড়ে যায়নি ভিতরে
এই কবি কোনোদিন দেখেনি সুড়ঙ্গের প্রদর্শনী
অথবা ভ্রমণ করেনি ঘোর তন্তুর অরণ্যে
সে ঢোকেনি মাংস ভেদ করে, খুঁড়ে দেখেনি হাড়
কখনো পৌঁছতে পারেনি অন্ত্র, পাকস্থলী পর্যন্ত
শিরায় শিরায় খালে-নদীতে সে অনুপ্রবেশ করতে পারেনি,
রক্তের মধ্যে জীবাণুবাহী হয়ে পাল তুলে ভ্রমণ করতে করতে
সে পৌঁছয়নি মানুষের জমাট হৃদয়ে।
কিন্তু সে বৃক্ষ চূড়ায় দেখেছে কীট
গম্বুজের মাথায় দেখেছে পঙ্গপালের ঝড়
হীরকোজ্জ্বল জলকে দেখেছে লালচে আর পঙ্কিল হতে,
দেখেছে হলদে প্রার্থনা
দেখেছে মৃগী রুগি পাদরির পুরু ঠোঁটে সবুজ লালা
গোল ঘরের ছাদে সে দেখেছে চটপট প্রাণী
প্রার্থনার বেদিতে দেখেছে রাত-পোকা
গির্জার দরজায় দেখেছে উঁইয়ের বাসা
বিশপের শিরস্ত্রাণ দেখেছে ঘুণ…
সে মোহান্ত প্রভুর ধূর্ত পিটপিটে চোখ দেখে বলেছে:
ইদারার শুকনো ছায়ায় আলো মরে আসছে ক্রমে
এই আলো আমাদের বাঁচাতেই হবে, কান্নার বন্ধনে।
ভেলাথকোয়েথ অঙ্কিত ‘ভালেকা-র শিশু’ চিত্রের পরিচিতি
এখান থেকে কেউ যেতে পারবে না
যতদিন এই ভালেকার শিশুর বিকৃত মাথাটি থাকবে
কেউ চলে যাবে না ।
কেউ না
না সন্ন্যাসী, না আত্মহত্যাকারী।
প্রথমে চাই তার প্রতি অন্যায়ের প্রতিকার
প্রথমেই চাই তার সমস্যার সমাধান
আমরাই তার সমাধানের জন্য দায়ী
এর সমাধান চাই বিনা কাপুরুষতায়
পোশাকের ডানা মেলে বিনা পলায়নে
অথবা স্টেজের মধ্যে গর্ত খুঁড়ে লুকিয়ে না গিয়ে
এখান থেকে কেউ চলে যেতে পারবে না
কেউ না
না সন্ন্যাসী, না আত্মহত্যাকারী।
নিরর্থক
নিরর্থক সব পলায়ন
(ওপরে বা নীচে)
সকলকেই ফিরে আসতে হবে।
বারবার।
যতদিন না (এক সুদিনে)
ম্যামব্রিনোর হেলমেট
এখন আলোর বৃত্ত, হেলমেট বা গামলা নয়।
সাঞ্চোর মাথায় ঠিক খাপ খেয়ে যায়
এবং আমার ও তোমার মাথায়
ঠিক ঠিক, মাপে মাপে—
সেদিন আমরা সবাই চলে যাব
ডানা মেলে
তুমি, আমি, সাঞ্চো
এবং সন্ন্যাসী ও আত্মহত্যাকারী।
[ভেলাথকোয়েথ, বাংলায় যাকে আমরা বলি ভেলাস কুয়েজ, তার এই বিখ্যাত ছবিটি একটি বাচ্চা বামনকে নিয়ে আঁকা, যার সর্বাঙ্গ বিকৃত, মনও নির্বোধ ও জড়। রাজা চতুর্থ ফিলিপ এই ধরনের বাচ্চা বামনদের রাজসভায় এনে মজা উপভোগ করতেন। কবি এখানে ওই বামনটিকে সমস্ত মানব সমাজের নির্যাতন, অপমান ও দুঃখভোগের প্রতীক করেছেন।
ডন কুইক্সোট (আসল উচ্চারণ যাই হোক না কেন) এবং তারা অনুচর সাঞ্চোকে বাংলাতে আমরা বহুদিন চিনি। ডন কুইক্সোট একদিন একটা নাপিতের পেতলের গামলা কেড়ে নিয়ে মাথায় দিয়ে ভেবেছিলেন, তিনি মহাশক্তিমান দুর্ধর্ষ দৈত্য ম্যামব্রিনোর বিখ্যাত হেলমেটের অধিকারী হয়েছেন।
দ্বিতীয় কবিতার শেষ অংশে কবি এর উল্লেখ করে বলছেন, ওই হেলমেট শক্তি ও সামর্থ্যের প্রতীক, ডন কুইক্সোটের মাথায় সেটা হয়ে ওঠে কবিত্ব ও কল্পনার আলোকমণ্ডল, কিন্তু পৃথিবীর সমস্যা দূর করতে গেলে, সাঞ্চোর মতন তীক্ষ্ণ বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের মাথাতেই তার বেশি দরকার।]
.
সেজার ভায়েহো
[এক বৃহস্পতিবার, প্রবল বর্ষার দিনে প্যারিসে আমার মৃত্যু হবে—এই নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলেন সেজার ভায়েহো, তখন তার বয়েস ২৮, এবং আশ্চর্য, এর ১৫ বছর পর কবিতাটিতে বর্ণিত অবস্থায় প্যারিসেই তার মৃত্যু হয়। অনাহারে, প্রবল যন্ত্রণা ও অপমান সহ্য করে, প্যারিসের একটি ঘরে মরে পড়ে ছিলেন তিনি ১৯৩৮ সালে।
তার জন্ম ল্যাটিন আমেরিকার পেরুতে ১৮৯৫ সালে। ১৯১৮ সালে প্রথম কবিতার বই ছাপা হবার পর তাকে নির্যাতন, বিচার ও কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়। পরবর্তী জীবনে প্রবল দারিদ্র ও উপবাসকে সঙ্গী করে স্পেন ও ফ্রান্সে ভ্রাম্যমাণ হয়ে কাটিয়েছেন। মৃত্যুর পর তার কবিতা ক্রমশই বিশ্বজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
প্রথম কবিতাটির শিরোনামার অর্থ এই, তার দেশের প্রাচীন রীতি ছিল জীবনের কোনও শুভ ঘটনার স্মৃতিচিহ্ন রাখা হত সাদা পাথরের ফলক লাগিয়ে, দুঃখের ঘটনায় কালো পাথর।]
একটি সাদা পাথরের ওপর কালো পাথর
প্রবল বর্ষার দিনে প্যারিসে আমার মৃত্যু হবে
সেই দিন,—আমার স্মৃতিতে গাঁথা আছে:
প্যারিসেই মরব আমি—এ কথায় ভয় পাইনি কোন
শরৎকালের এক বৃহস্পতিবার ঠিক আজকেরই মতো।
বৃহস্পতিবারই ঠিক, কারণ আজকের এই বৃহস্পতিবারে
আমার কবিতা লেখা গদ্যের মতন রুক্ষ হয়ে আসে
দু’হাতের হাড়ে খুব ব্যথা করে, যে'রকম ব্যথা আমি কখনও বুঝিনি;
দীর্ঘ পথ ঘুরে এসে জীবনে কখনও আগে নিজেকে এমন
মনে হয়নি পরিত্যক্ত একা।
সেজার ভালেখা আজ মারা গেছে। সকলেই মেরেছিল তাকে। অথচ কারুর কোনো ক্ষতি সে করেনি। তারা তাঁকে ডাণ্ডা দিয়ে মেরেছিল, কঠিন প্রহার কখনও চাবুকে; তার সাক্ষী আছে
বৃহস্পতিবারগুলি, দু’হাতের ব্যথাময় হাড়
আর নির্জনতা, বৃষ্টি, দীর্ঘ পথ।
আমিই একমাত্র বিদায় নিয়ে
আমি একমাত্র, পিছনের সবকিছু ফেলে বিদায় নেব:
আমি এই বেঞ্চি থেকে উঠে দূরে চলে যাচ্ছি
আমি আমার আন্ডারওয়্যার থেকে দূরে চলে যাচ্ছি
আমার কাজ, এই নির্দিষ্ট জগৎ থেকে আমি চলে যাচ্ছি
আমার ভেঙে ছিটকে পড়া বাড়ির নম্বর থেকে চলে যাচ্ছি দূরে
সব কিছু ফেলে আমিই একমাত্র বিদায় নিয়ে যাচ্ছি।
সাঁজেলিজে থেকে দূরে চলে যাচ্ছি আমি
চাঁদের পিঠে কোনো এক অদ্ভুত গলিপথে একবার বাঁক নিতে
আমার মৃত্যুও আমার সঙ্গে যাচ্ছে, আমার বিছানা বিদায় নিয়েছে;
চারপাশে রিক্ত, স্বাধীন মানুষের দল নিয়ে
আমার শারীরিক দ্বিতীয় সত্তা বেড়াতে বেরিয়ে এক এক করে
বিদায় দিচ্ছে তার প্রেতগুলিকে।
আমি সব কিছু থেকে বিদায় নিতে পারি, কারণ
পিছনে সব কিছু পড়ে থাকবে সূত্র হিসেবে।
আমার জুতো, ফিতের গর্ত, কোণায় লেগে থাকা কাদা
পরিষ্কার ধপধপে শার্টের ভাঁজ—এরাও থাকবে।
[দ্বিতীয় কবিতায় উল্লেখিত সাঁজেলিজে হয়তো অনেকেরই পরিচিত, তবু বলি, সাঁজেলিজে হচ্ছে প্যারিসের একটি বিখ্যাত, সুরম্য রাজপথ, মূল বানান Champs Elysees]

(ক্রমশঃ)

Story and Article