একদিন হঠাৎ করেই শতদ্রু জে. এন. ইউ. তে পি. এইচ. ডি করতে চলে গেল l যাবার আগে অস্মিতার সঙ্গে একবার দেখা করতে গেছিল l অস্মিতা আশা করেছিল শতদ্রু সেদিন তাকে 'প্রপোজ' করবে l
জনা বন্দ্যোপাধ্যায়
অস্মিতা এক দৃষ্টে চেয়ে আছে তাতাই-এর ঘুমন্ত মুখের দিকে l শ্যামলা রঙ, টিকালো নাক-- মেয়েটা অবিকল ওর বাবার মতো দেখতে হয়েছে l রোজ রাতে শুতে যাবার আগে ঘুমন্ত মেয়েকে কিছু ক্ষণ দেখে অস্মিতা l স্মৃতির ছায়াপথে হারিয়ে আবার খুঁজে বেড়ায় নিজেকে l ভালো লাগা আর মন খারাপের ঘূর্ণাবর্তে এক অদ্ভুত অনুভূতি গ্রাস করে অস্মিতাকে, ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ে l
অস্মিতা একটি 'রেপুটেড' হার্ডওয়ার কোম্পানির 'এডিশনাল ম্যানেজার ' l ছোট থেকেই পড়াশোনায় ভালো ছিল l এম. এস. সি পাশ করে নিজের চেষ্টায় চাকরি পেয়েছে l বাবা মা-র একমাত্র মেয়ে হয়েও চাকরি করবে, স্বনির্ভর হবে--এই আত্মবিশ্বাস ছিল অস্মিতার l মৃদুভাষী, অভিমানী স্বভাবের, কবিতা পাগল সে l
অস্মিতার স্বামী পীযুষ মাসে একবারই মেয়ে ও স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে আসে l মুর্শিদাবাদ জেলার লাল গোলায় সরকারী অফিসার, বদলির চাকরি l তাই কলকাতায় মেয়ের সব দায়িত্ব একাই নিতে হয় অস্মিতাকে l পীযুষ ছোটবেলায় বাস দুর্ঘটনায় বাবা মাকে হারিয়েছে, মামার বাড়িতে মানুষ l
অস্মিতা কলেজ জীবনে আর পাঁচটা মেয়ের মতো ছিলনা l তার অনেক বান্ধবীরাই প্রেমে পড়েছিল l বান্ধবীরা মজা করে বলত দেখবি যখন প্রেমে পড়বি, তখন আর প্রেম থেকে পালাবার পথ পাবিনা! এই কথাটার অর্থ কতটা গভীর তা এম. এস. সি পাশ করে বুঝতে পারে l এম. এস. সি পড়ার সময় শতদ্রু অস্মিতার ব্যাচমেট ছিল l ইকোনমিক্স-এর ছাত্র শতদ্রুর মধ্যে ছিল শান্ত ভাব, তার চিন্তাশীল চোখগুলো ছিল গভীর l কথা প্রসঙ্গে অস্মিতা জেনেছিল শতদ্রুর মা একটি 'রেপুটেড ' হায়ার সেকেন্ডারী স্কুলের প্রধানা শিক্ষিকা l শতদ্রু, পারিজাত, সুবর্ণা, বৃষ্টি--এই চারজন ছেলেমেয়ের দলে সহজেই মিশত অস্মিতা l ওরা প্রায়ই শতদ্রুর বাড়ি যেত l শতদ্রু ঠান্ডা মাথার ছেলে l তাই সহজেই বন্ধুদের সমস্যার সমাধান করত l মুখে কিছু না বললেও শতদ্রু যে অস্মিতার প্রতি আকর্ষণ বোধ করত সে কথা অস্মিতা বুঝতে পেরেছিল l চন্দননগরে একবার ওরা বন্ধুরা মিলে 'ফিস্ট' করতে গেছিল l সময়টা ছিল শীতের শেষ, বসন্তের মৃদু আভাস আকাশে ছড়িয়ে পড়েছিল, অস্মিতা মাংস রেঁধেছিল,শতদ্রু সাহায্য করেছিল l সেদিন সবার অলক্ষ্যে অস্মিতার হাতটা আলতো করে ছুঁয়েছিল শতদ্রু l মুহূর্তের লজ্জাবোধ অস্মিতাকে ঘিরে ধরেছিল l
এম. এস. সি পাশ করে শতদ্রুর সঙ্গে অস্মিতার দেখা সাক্ষাৎ কমে যায় l শতদ্রু একটু চাপা স্বভাবের l অস্মিতা প্রায়ই ফোন করত শতদ্রুকে, জন্মদিনে উপহার দিতে যেত l অস্মিতা যথেষ্ট গুণী মেয়ে, সপ্রতিভ চেহারা, পড়াশোনাতেও ভালো, ব্রাইট কেরিয়ার, তাই মেয়ে হিসাবে অস্মিতাকে কারোর অপছন্দ হবার কথা নয় l তবু শতদ্রু বাড়িতে অস্মিতার ব্যাপারে কিছু জানায়নি l শতদ্রুকে মাঝে মাঝে খুব গম্ভীর লাগত l কী যেন একটা চাপা কষ্ট বুকে! অস্মিতা কয়েকবার জিজ্ঞাসা করেছিল, কিন্ত শতদ্রু এড়িয়ে গেছে l
একদিন হঠাৎ করেই শতদ্রু জে. এন. ইউ. তে পি. এইচ. ডি করতে চলে গেল l যাবার আগে অস্মিতার সঙ্গে একবার দেখা করতে গেছিল l অস্মিতা আশা করেছিল শতদ্রু সেদিন তাকে 'প্রপোজ' করবে l শতদ্রুর চোখ দুটো ছলছল করছিল, তবু অস্মিতাকে মনের কথা বলতে পারেনি l
এরপর মাস দুয়েক শতদ্রুর কোন ফোন পায়নি অস্মিতা l তখন সে নিজেও চাকরির চেষ্টা করছিল l কাগজ দেখে ইন্টারভিউ দিয়েছিল l চাকরি পেয়ে হার্ডওয়ার কোম্পানিতে 'Assistant Manager ' এর পোস্টে যোগ দেয় অস্মিতা lচাকরি পাওয়ার পর অস্মিতাকে প্রায়ই তার মা মনোরমা দেবী বিয়ের কথা বলতেন l অস্মিতা কিছু না বলে এড়িয়ে যেত l মনোরমা দেবী হয়তো মেয়ের মনের কথা বুঝতে পেরেছিলেন l তিনি এর আগে অনেক দিন অস্মিতাকে শতদ্রুর সঙ্গে ফোনে কথা বলতে দেখেছেন l কোনদিনই তিনি এ বিষয়ে আপত্তি করেননি l শিক্ষিকা মায়ের উদার মানসিকতার পরিচয় অস্মিতা জীবনে পেয়েছে l কিছুদিনের মধ্যেই মনোরমা দেবী শতদ্রুর মাকে ফোন করেন মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে l প্রস্তাবটা শুনে শতদ্রুর মা বিদিশা রায় শান্ত গলায় বলেন, "শতদ্রু তো আমায় বিয়ের কথা কিছু বলেনি l এই বছরটা ওর পি. এইচ. ডি-র ফাইনাল ইয়ার l একটা পার্ট টাইম চাকরি যদিও দিল্লীতে করে, তবু 'পার্মানেন্ট ' চাকরি তো নয় l বুঝতেই পারছি আপনি মেয়ের মা, তাই মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে চিন্তা তো থাকবেই!"
ফোন রেখে দেন বিদিশা রায় l এরপর কয়েকটা দিন কেটে যায় বিদিশা রায় আর ফোন করেননা l সেই দিনগুলো অস্মিতার কী যন্ত্রণায় কেটেছিল তা ভাবলে আজও কষ্ট হয়!
এরপর দুমাসের মধ্যে অস্মিতার কলিগের মাধ্যমে পীযুষের সঙ্গে পরিচয় হয় l বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে আর দেরী করেনি অস্মিতা l পীযুষের ভালো চাকরি,সুন্দর স্বাস্থ্য, শ্যামলা হলেও বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা l তাই অস্মিতার বাবা মা আর কোন আপত্তি করেননি l
বিয়ের পর পীযুষের মামার বাড়িতেই প্রথম কদিন থাকতে হয়েছিল অস্মিতাকে l ওদের বিয়ের দেড় বছরের মাথায় অস্মিতার মেয়ে তাতাই-এর জন্ম হয় l অস্মিতার বাবা মেয়ে জামাইকে একটা ফ্ল্যাট কিনে দেন l পীযুষ লালগোলায় বদলি হয়ে যায় l অস্মিতা নিজের চাকরি ছেড়ে পীযুষের সঙ্গে যেতে চায়নি l তাই সে মেয়েকে নিয়ে কলকাতার ফ্ল্যাটেই থেকে যায় l কেটে যায় আরো একটি বছর l
শতদ্রুর এক বন্ধু পারিজাতের সঙ্গে হঠাৎ-ই একদিন কলকাতার রাস্তায় দেখা হয়ে যায় অস্মিতার l পারিজাতের থেকে অস্মিতা জানতে পারে শতদ্রু জে. এন. ইউ থেকে ফিরে কলকাতার একটি মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করছে l বিয়ে করেনি l গত দুমাস আগে হার্ট অ্যাটাকে শতদ্রুর মা বিদিশা রায় মারা গেছেন l শতদ্রু এখন বাবাকে নিয়ে পুরোনো বাড়িতে থাকে l সব শুনে অস্মিতার চোখের জল বাঁধ মানেনি l
অনেক ভেবে শতদ্রুর বাড়ির ল্যান্ড ফোন নম্বর ডায়াল করে অস্মিতা l ভেতরে একটা অস্থিরতা অস্মিতাকে স্থির থাকতে দেয়নি l ফোনে শতদ্রুর গলাটা শুনে প্রথমে কথা হারিয়ে যায় অস্মিতার l তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, "কেমন আছিস? চিনতে পারছিস?"
"অস্মিতা! কতদিন পর!"
শতদ্রুর গলায় বিস্ময়ের মাত্রা l
"তুই এখন কোথায় থাকিস? পারিজাত কাছে শুনেছি তোর মেয়ে হয়েছে l"
বেশ কিছুক্ষণ দুজনের কথা হয় l অস্মিতা হঠাৎ-ই বলে ওঠে, " বিয়ে করবি কবে? পাত্রী ঠিক করেছিস? "
"অনেক সম্বন্ধ এসেছে l তবে আমার ভালো লাগেনি l"
অস্মিতার বিয়ে নিয়ে শতদ্রুর মনে চাপা অভিমান আছে এ কথা অস্মিতা বুঝতে পারে l কিন্ত অস্মিতার মনেও অভিযোগ কম নেই l শতদ্রু গত কয়েক বছর তার সঙ্গে কোন যোগাযোগই রাখেনি l তাছাড়া বিদিশা রায়ও এই বিয়ের ব্যাপারে কোন আগ্রহ দেখাননি l
এরপর একদিন অস্মিতা শতদ্রুর বাড়ি যায় l শতদ্রু আগের তুলনায় একটু মোটা হয়েছে l চুল বেশ খানিকটা পড়ে গেছে, তবু তার মননশীল চোখ দুটো আজও সুন্দর!
পীযুষ আজকাল তার কাজে এতটাই ব্যাস্ত যে গত দুমাসে একদিনও বাড়ি আসার সময় পায়নি l তাতাই তার বাবার সঙ্গে ফোনেই কথা বলতে অভ্যস্ত l এক এক সময় যেন গভীর শূন্যতাবোধ অস্মিতাকে গ্রাস করে!
আষাঢ়ের মেঘ যখন কালো হয়ে আসে অস্মিতার ভালো লাগে l আকাশের অভিমানী মুখ, গভীর বৃষ্টির আভাস তার মনকে উদ্বেলিত করে l মুহুর্তগুলো সতেজ পৃথিবীর প্রতীক্ষা করে l দিনটা ছিল এমনই এক আষাঢ়ের সন্ধ্যে l তীব্র বৃষ্টি ও ঘন ঘন বাজ পড়ছিল l অস্মিতা অফিস গেলে যে কাজের মাসি তাতাইকে দেখাশোনা করে, সেই মাসি আজ আসেনি বলে অস্মিতা অফিস যায়নি l সারা দুপুর তাতাই জেগেছিল, খেলা করেছে l তাই সন্ধ্যে হতেই আজ ঘুমিয়ে পড়েছে l তখন সন্ধ্যে সাতটা হবে l হঠাৎ-ই দরজায় কলিং বেলের আওয়াজ শুনে দরজা খুলতেই অস্মিতা অবাক হয় l শতদ্রু দাঁড়িয়ে l সঙ্গে ছাতা নেই,শার্ট টা ভীষণভাবে ভিজে গেছে, মুখ ভর্তি দাড়ি,এলোমেলো ভিজে চুল l অস্মিতা তাড়াতাড়ি টাওয়াল এগিয়ে দেয় l শতদ্রুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বসতে বলে অস্মিতা l
"না রে ভিজে জামাকাপড়ে বসতে পারবনা l তাছাড়া বাবাকে নিয়ে পরশু কানপুর চলে যাচ্ছি l
"কানপুর? কেন হঠাৎ?"
অস্মিতা অবাক হয় l
"হ্যাঁ, ট্রান্সফার নিয়েছি l নিজের সঙ্গে আর কতদিন যুদ্ধ করব বল!"
"মানে?"
অস্মিতা লক্ষ্য করে শতদ্রু অন্যমনস্ক হয়ে কী সব অসংলগ্ন কথা বলছে l
"তুই কি বলছিস কিছুই বুঝতে পারছিনা l"
এবার শতদ্রু অস্মিতার দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে বলে, "বাড়িটা আমার মাসতুতো ভাই বিমলকে লিখে দিয়েছি, আর ফিরবনা l"
অস্মিতার চোখে জল দেখে শতদ্রু রুক্ষ গলায় বলে,
"তোর চোখের জলই বলে দিচ্ছে তুই আজও আমার থেকে 'এক্সপেক্ট ' করিস l করিসনা l এই জন্যই কানপুর চলে যাচ্ছি ট্রান্সফার নিয়ে l"
অস্মিতা তার চোখের জল সামলে ক্ষোভের স্বরে বলে, "তুই কাপুরুষ! তাই কানপুর চলে যাচ্ছিস l তুই তোর বিবেকের সামনে দাঁড়াতে চাসনা, তাই কানপুর পালিয়ে যাচ্ছিস l"
শতদ্রু স্থির হয়ে কিছু ক্ষণ দাঁড়ায় l তারপর ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে যায় l
"শতদ্রু আজ তোকে বলতেই হবে কেন তুই আমাদের সম্পর্ককে সেদিন পরিণতি দিতে চাসনি?"
অস্মিতা কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ে l হঠাৎ-ই এক অজানা শক্তি শতদ্রুকে গতিহীন করে l ফিরে দাঁড়ায় শতদ্রু l
"কারণটা জিজ্ঞাসা করিসনা, আমি বলতে পারবনা l"
বাইরে মেঘ গর্জন শুরু হয় l সেই সঙ্গে অক্লান্ত বর্ষণে আকাশের বাঁধভাঙা কান্না যেন ব্যথার সাগর হয়ে বইছে!
"একবার অন্তত: অকপট হয়ে সত্যি কথাটা বল শতদ্রু, নইলে তোকে যে কোনদিনও ক্ষমা করতে পারবনা l"
অস্মিতার গলায় আবেগের মাত্রা বৃদ্ধি পায় l
"যে ছেলে কিশোর বয়স থেকে নিজের মায়ের সঙ্গে অন্য পুরুষের অবৈধ সম্পর্ক গড়ে উঠতে দেখেছে, কোনদিন মেনে নিতে পারেনি, প্রতিবাদও করতে পারেনি, তাকে দুর্বল ভেবে তোর ক্ষমা করে দেওয়া উচিত l"
সব শুনে অস্মিতার গলার স্বর রুদ্ধ হয়ে আসে l শতদ্রু বলতে থাকে, "আমার মা-র সঙ্গে মিঃ ধরের সম্পর্কটা আমি মেনে নিতে পারিনি বলেই দিল্লী চলে গেছিলাম l তোকে তখন কিছু বলতে পারিনি l আমার বাবাও জানত,কিন্তু নীরব থাকত l "
একটু থেমে শতদ্রু আরো বলে, "আমি চাইনা যে তোর সঙ্গে আমার যোগাযোগ থাকুক l আমি কলকাতায় থাকলে তোর সঙ্গে আমার সম্পর্কের সূত্রপাত হবে l আমরা কেউই কাউকে এড়িয়ে চলতে পারবনা l ভেবে দেখ, তোর মেয়ে তাতাই তো কোন দোষ করেনি l ওর নিষ্পাপ মনে এর ছায়া পড়বে l আমি চাইনা আমার কারণে আর কেউ আমার মতো কষ্ট পাক!"
কথাগুলো বলে বৃষ্টির মধ্যে উদভ্রান্তের মতো বেরিয়ে যায় শতদ্রু l
অস্মিতার জীবনে শতদ্রু যেন এক অদৃশ্য ছায়াপথ তৈরী করে দিয়েছে! যখন ইচ্ছে তখনই অস্মিতা সেই অদৃশ্য ছায়াপথ ধরে হাঁটতে পারে আর নিজের ভালোবাসার স্বপ্নগুলো ছুঁতে পারে! কেউই জানতে পারেনা এই ছায়াপথের কথা, তবু জীবনের অন্তরালে এরকম একটি ছায়াপথ হয়তো অনেকের স্মৃতিতেই থাকে!
Post a Comment