অ্যান্টি-পোয়েট্রি অথবা অন্তঃবীক্ষণের কবি - তৈমুর খান

 
Story and Article

ফিলিস্তিনিদের জাতীয় কবি মাহমুদ দারবিশ(১৯৪১-২০০৮) একবার বলেছিলেন: "Poetry and beauty are always making peace. When you read something beautiful you find coexistence; it breaks walls down.”

অর্থাৎ কবিতা এবং সৌন্দর্য সর্বদা শান্তি তৈরি করে। সুন্দর কিছু পড়লে আপনি সহাবস্থান খুঁজে পান; এটা দেয়াল ভেঙে দেয়। অর্থাৎ একটা হৃদয় আর একটা হৃদয়ের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয়। একটা মন আর একটা মনের কাছে চলে যেতে পারে। সর্বদা তা ব্যাখ্যার অতীত। ভাষারও অতীত। এক ধরনের আবেশ ভালোলাগা তৈরি হয় যা আমাদের দৃষ্টি এবং উপলব্ধিকে মুক্ত করে দেয়। গৌতম রায়ের কবিতা পড়তে গিয়ে আমার এ কথাই মনে হয়েছে। সম্প্রতি তাঁর দুটি কাব্যগ্রন্থ 'ড্রোন-দৃষ্টি'(প্রথম প্রকাশ আগস্ট ২০২১) এবং 'চোখের পা'(প্রথম প্রকাশ সেপ্টেম্বর ২০১৩) পাঠের সুযোগ হয়েছে। গৌতম রায় কবিতার নির্মাণ এবং বিষয় নিয়ে বরাবরই ভিন্ন পথের পথিক। বিশেষ করে অ্যান্টি-পোয়েট্রি হিসেবেই কবিতার যে নতুন ধারা সৃষ্টি হয়েছে, মূলত তিনি সেই ধারাকেই অনুসরণ করেন। তাই সচরাচর তাঁর কাব্য পাঠ করে কবিতার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে না যাওয়াই ভালো। বরং কবিতা নির্মাণের প্রেক্ষাপটে যে আবহ সৃষ্টি হয়েছে তার শব্দ ও ইমেজের প্রক্ষেপণ কতটা মারাত্মক এবং অনন্য তা দেখা যেতে পারে।

অ্যান্টি-পোয়েট্রি সম্পর্কে আমেরিকান হরর গল্প ও উপন্যাসের বিখ্যাত লেখক স্টিফেন কিং(১৯৪৭) বলেছেন:

“It Was The Furthest Thing In The World From The Rosy-fingered Dawn Of Poetry And Old Technicolor Movies; This Was An Anti-dawn, Damp And As Pale As The Cheek Of A Day-old Corpse.”

অর্থাৎ এটি ছিল কবিতা এবং পুরানো টেকনিকালার চলচ্চিত্রের গোলাপি আঙুলের ভোর থেকে বিশ্বের সবচেয়ে দূরের জিনিস; এটি ছিল একটি বিরোধী ভোর, স্যাঁতসেঁতে এবং একটি দিনের পুরনো মৃতদেহের গালের মতো ফ্যাকাশে।

'চোখের পা' নামকরণের মধ্যেই 'গোলাপি আঙুলের ভোরে'র কথা মনে পড়ে যায়। সেই

'The Rosy-fingered Dawn Of Poetry' এর মধ্যে মাহমুদ দারবিশ কথিত 'always making peace'কে দেখতে পাই এবং উপলব্ধি করতে পারি। এটা মনশ্চক্ষের ক্রিয়ায় অনুধাবিত প্রজ্ঞার এক বিস্ময় জাগরণ। 'মোজা ছাড়াই' কবিতায় গৌতম বলেছেন: 'তোমাকে তোমার মতো করে ভাবতে বসেছি'। আর এই ভাবনার মধ্যেই এসেছে আবিষ্কার, বন্ধন, মুক্তি, সৌন্দর্য এবং অগ্রগমনও:

"এ বড়ো আবিষ্কার

এ বড়ো তোলপাড়

এ বড়ো অবলম্বন

এ বড়ো বন্ধন

এ বড়ো মুক্তি

এ বড়ো অগ্রগমন"

টু-হুইলার্সের সহযাত্রী যখন হাত ধরেছে আড়াল ছাড়াই, তখন তা শুধু বাইরের গতিমানতাকেই নির্দেশ করে না– ভেতরের ক্রিয়ারও দ্রুততা সম্পন্ন করে। ক্রিয়া তখন গিয়ারে পরিণত হয়। একে একে খুলতে থাকে সৌন্দর্যের নতুন আবিষ্কার। দেয়াল ভেঙে দেওয়ার ব্যাপারটি এখানেই পূর্ণতা পায়। এই পূর্ণতার মাঝখানে বিরাজ করে প্রেম। বাঁচার উচ্ছ্বাস। আত্মদর্শনের আত্মরতিও। তখন কবি 'চোখের পা' চালিত করেন 'ভালোবাসার দুটি চোখে':

"এ নিছক গল্প নয়

চিরসুন্দরের দিনরাত্তির গল্প

আমি মাটির জন্য সুন্দর হতে পারি

আমি জলের জন্য সুন্দর হতে পারি

আমি বাতাসের জন্য সুন্দর হতে পারি

আমি আকাশের জন্য সুন্দর হতে পারি

আমি গাছের জন্য সুন্দর হতে পারি

আমি পাখির জন্য সুন্দর হতে পারি

আমি তোমার জন্য সুন্দর হতে পারি"

এই সৌন্দর্য সবুজ শুশ্রূষা থেকে নির্ভার ভোরের আলোয় মুগ্ধতা ছড়িয়ে দেয়। রামধনুর সোঁদাগন্ধ 'বিকেলি প্রজাপতিত্বে' নেমে আসে। স্রোতের বন্ধন থেকে বিপরীতমুখী পথের সঙ্গমে বহু বিভাজিকায় ছড়িয়ে যায়। তখন পলাশের কয়েক ধাপ আলো মনে হয়। ইতিহাসের জানালায় প্রিয়দর্শীর আঙুলের মুদ্রা ঘটমান বুনন জালের মতো বিস্তৃত হয়ে পড়ে। কতকগুলি ছবি অথবা না-ছবির ভিতর দূরের পৃথিবী অথবা পুরনো দিনের মৃতদেহের মতো ফ্যাকাশে বিক্ষিপ্ত সঞ্চরণশীল সময়ের স্বাক্ষর হয়ে জেগে থাকে।

'ড্রোন-দৃষ্টি' কাব্যের মধ্যেও কবির অন্তঃবীক্ষণ তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। যে শব্দ, যে বোধ, যে উপলব্ধি তিনি কবিতায় নিয়ে আসেন আলাদা হলেও আত্মরতির চক্রে উত্তরাধিকারের অন্বয় হিসেবেই গতি পায়। কাব্যের প্রথম কবিতা 'যোগ্যতা তুমি কার'-এ কবি লিখেছেন:

"এতো বিপর্যয়ের পরেও হাতে কোদাল

আল কেটে শিরায়-উপশিরায়

জল এনে দিতে চাই

তুমি যে মাথা কাটা পলাশ জঙ্গল বিথির মোরাম ধরে

সুখ অর্জনের ভাটা গড়তে চাও

ইটের পর ইট সাজিয়ে জাগাও পাঁজা

সেখানে একাডেমিক শংসাগুলি

কুচি কুচি করে ছিঁড়ে

মাটিতে ছড়িয়ে দিয়েছে একদিন"


তখন স্বাভাবিকভাবেই মনে হয় কবি সভ্যতার আদি স্তরে নেমে এসেছেন। কোথাও দূরত্ব নেই কারও সঙ্গে। আভিজাত্যের অসামাঞ্জস্য নেই। মনন ও কায়িক সাধনায় নিজেকেও মাটিতে নামিয়ে এনেছেন। অর্থাৎ কবির এই কবিতা অন্য কোনও কবিতাকে অস্বীকার নয়। অন্য কোনও জীবনকে বা অন্য কোনও প্রতিভাকেও ছাড়িয়ে যাওয়াও নয়। বরং একই সীমানায়, একই সমান্তরালে দাঁড়ানো। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে নিকারাগুয়ান কবি, রাজনীতিবিদ,পুরোহিত, চিত্রশিল্পী, ভাস্কর এবং অনুবাদক আর্নেস্টো কার্ডেনাল(১৯২৫-২০২০) এর একটি উক্তি:

“I myself have never called what I write anti-poetry. I also think that my poetry should not be only known as the poetry of Ernesto Cardenal but rather as Nicaraguan poetry.”

অর্থাৎ আমি নিজে যা লিখি তাকে কখনও কবিতা বিরোধী বলিনি । আমি এটাও মনে করি যে আমার কবিতাকে শুধু আর্নেস্টো কার্ডেনালের কবিতা হিসেবে নয়, নিকারগুয়ানের কবিতা হিসেবেও পরিচিত করা উচিত। এখানেই বোঝা যায় তাঁর কবিতা ব্যক্তির নয়, সমগ্র মানুষের, সমগ্র সমাজের, সমস্ত মানব সভ্যতারও। গৌতম রায় এই মানব সভ্যতারই কথা বলতে চেয়েছেন গ্রানাডা নিকাগুয়ান কবির মতোই। কাব্যের নাম কবিতাতেই তিনি তা আরও খোলাসা করেছেন:

"আমাদের ভেতর একটি ড্রোন অবস্থান করে

অযোধ্যার পাখি পাহাড়ের গথিক স্থাপত্যকে

পেড়ে এনে দেয় ডানা,

এ ডানায় পাখিপাহাড়ও ওড়ে

ডানার নান্দনিকতায় লেখা থাকে

গীতবিতান এর স্বরলিপি

লেখা থাকে কেমন করে গাইতে হয়

সমবেত ইন্টারন্যাশনাল"

এই 'সমবেত ইন্টারন্যাশনাল' গান গাইতে গাইতে আমাদের দৃষ্টিও শুধু আদ্দিকালের দিকে চলে যায়। পৌরাণিক মিথ থেকে চৈতন্য-রামকৃষ্ণ-মাদার টেরিজার মানবকল্যাণে তা থিতিয়ে পড়ে। করোনাকালে মানবচেতনার এই মহাজাগরণ চিরন্তন মানবের দৃষ্টি খুলে দেয়। কাব্যের অন্যান্য কবিতাতেও মানবজগতের চিরন্তন কবিতাকে খুঁজে পাই। গৌতম রায় তখন নিজেই একটা জগৎ হয়ে ওঠেন। মানুষের ভেতরেই জেগে ওঠে মহাকাশ:

"মানুষের ভেতরও নাক্ষত্রিক জগত

এ জগত লড়াইয়ের জন্য দানবীয় হলেও

তাকে উপেক্ষা করবে কে?

আবেগে আলিঙ্গন নয়

পাঞ্জার শঙ্খ মুদ্রায়

উঠোনে দিয়া বা মোম জ্বালো মানুষ

আলো এসে পড়বে রাস্তায়।"

এই নাক্ষত্রিক জগৎ যখন জেগে উঠে, তখন উঠোনের দিয়া বা মোমের আলোও রাস্তা আলোকিত করে। এই রাস্তা তো মানবসভ্যতার রাস্তা। এই রাস্তা তো মানবজীবনের পথও হয়ে উঠতে পারে। 'মৃত্যুঞ্জয়' কবিতায় আরও তীব্রভাবে তিনি মানুষের অভিমুখ বুঝিয়ে দিলেন:

"মানুষ তুমি জানো না

কী অপরিসীম সম্পদের অধিরাজ তুমি

উচ্চতা থেকে গর্ভগৃহে দাও উলফা,

খনন শ্রীজাত উড়ানের কলাপে

তোমার আত্মশক্তি

এ উড়ানে জয় তোমার নিশ্চিত,

তুমি তো উৎসে মৃত্যুঞ্জয়

মুখোশ খুলে এ নয় এ নয় বৃহতের দিকে

তোমার অভিমুখ।"

এই অপরিসীম সম্পদের প্রাচুর্যকেই সিঞ্চিত করেছেন কবি গৌতম রায়। সেই যোগ্যতাকেই অর্জন করেছেন তার শব্দ প্রক্ষেপণে। সমস্ত দূরত্ব ঘুচিয়ে দিয়েছেন। বৃহৎ-এর অভিমুখে দাঁড় করিয়েছেন মানবচৈতন্যকে। অতিভোরের পবিত্র, মনোশরীর, শব্দব্রহ্মের চমৎকারিত্ব চলমান ভারতবর্ষের বীরাঙ্গণার অস্মিতায় ফুটে উঠেছে। কবি কবিতার পৃষ্ঠায় সাজিয়েছেন অনন্তের আঁচল। আর নিজেই বলেছেন:

"শুদ্ধসত্ত্বের কাঙাল আমি—

সেই উঠোনে রাখি

একটি দীঘল প্রণাম।"


আদিপ্রজ্ঞার অনুভূমি থেকেই তখন গৌতম রায়কে ভারতীয়ত্বের ঐতিহ্যের ধারক অবিনশ্বর পুরুষ হিসেবেই দেখতে পাই। বহু মুনিঋষির বহু পথ অতিক্রান্ত যুগোত্তীর্ণ আলোকসাম্যে তিনি ব্যাপ্তিমান ঐশ্বর্যে সমন্বিত হয়েই জেগে ওঠেন। দুটি কাব্যেই এই আলোকশস্য ছড়িয়ে আছে।

১) ড্রোন-দৃষ্টি:গৌতম রায়, পাঠক, ৩৬ এ কলেজ রো, কলকাতা-৭০০০০৯, মূল্য-২০০ টাকা।প্রচ্ছদ :দেবাশিস সাহা।

২) চোখের পা :গৌতম রায়, কবিতা ক্যাম্পাস, ৪৮ ভৈরব দত্ত লেন, সালকিয়া, হাওড়া-৭১১১০৬, মূল্য-৬০ টাকা।প্রচ্ছদ : সঞ্জীব চৌধুরী।

(ছবিতে গৌতম রায় ও তাঁর দুটি কাব্যগ্রন্থ)

#Story_and_Article


Story and Article

Story and Article