চড়ুইপাখিরা একে একে আসছে আর ঠোঁটে খাবার নিয়ে উড়ে যাচ্ছে। সৌম্য ওদের শৃঙ্খলাবদ্ধ আসা-যাওয়া একদৃষ্টিতে দেখতে থাকে।
শৃঙ্খলা // জয়নারায়ণ সরকার
সকালে জানালাটা খুলে দিতেই একঝাঁক রোদ্দুর এসে পড়ে ঘরে। তার সঙ্গে সঙ্গে দুটো চড়াইপাখি এসে জানালার গ্রিলের ওপর বসে এদিক-ওদিক তাকাতে থাকে। দু'দিন পরে ঝলমলে সকাল দেখে মনটা চনমনে হয়ে ওঠে সৌম্যের। চড়াই দুটো মাঝে মাঝেই ডাকছে। ওদের ডাক শুনে মনে পড়ে দু-দিন ধরে বৃষ্টি হওয়ায় খাবার দেওয়া হয়নি। জানালার এক কোণে ভাঙা মার্বেলের টুকরো বসানো আছে। সেখানেই দেওয়া হয় কখনও বিস্কুট, কখনও মুড়ি। এবার চড়াইগুলো কিচিরমিচির করতে থাকে। রান্নাঘরে তখন মামন ব্যস্ত চা বানাতে। সৌম্য ঘর থেকেই হাঁক দিয়ে ওদের জন্য খাবার আনার কথা বলে। মামন কিছুক্ষণ বাদে এক বাটি মুড়ি দিয়ে যায়। সে উঠে ওই পাথরের ওপর ছড়িয়ে দেওয়া মাত্র আরো কয়েকটা চড়ুই এসে হাজির হয়। সৌম্য দেখে একজন নেওয়ার পর আর একজন এসে ঠোঁটে মুড়ি নিয়ে উড়ে যাচ্ছে। পর পর তারা এসেই যাচ্ছে। একদৃষ্টিতে দেখতে থাকে সে।
এর মধ্যে মামন চা এনে সামনের টেবিলে রাখে। সৌম্য তখনও পাখিগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। মামন অন্যমনস্কতা ভাঙাবার জন্য বলে, নাও, চা খেয়ে নাও। পাখিগুলোর দিকে তাকিয়ে অত ভাববার কি আছে?
সৌম্যের ভাবনায় ছেদ পড়ে। সে মাথা দুলিয়ে বলে, দেখ, পাখিগুলো কিন্তু হুড়োহুড়ি করছে না। একে একে এসে খাবার নিচ্ছে। দুদিন ধরে বৃষ্টির জন্য ওরাও তো অভূক্ত। খাবার দেখে হামলে পড়বে বলে ভেবেছিলাম। কিন্তু...
মামন ওর কথার মাঝে বলে ওঠে, তা ওদের না হয় পেট ভরল। কিন্তু আমাদের কী হবে? ঘরে যা ছিল দুদিন ধরে চলল। আজ বাজার না গেলে ভাতে ভাত খেতে হবে।
সে চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, তাহলে তো যেতেই হয়।
সৌম্য ওই জানালার দিকে তাকিয়ে দেখে এক এক করে চড়ুইপাখিরা তখনও এসেই চলেছে।
***
সৌম্যের আজ বার বার স্কুলের কথা মনে পড়ছে। প্রার্থনার সময় প্রত্যেক ক্লাস থেকে সারিবদ্ধভাবে এসে দাঁড়াত মাঠে। তারপর ঘণ্টা পড়লেই শুরু হত প্রার্থনা। এবং শেষ হলে সবাই একইভাবে ফিরে যেত ক্লাসে। এটা ছিল প্রতিদিনের ব্যাপার। মাঝে মাঝে লাইন ভেঙে কেউ এগিয়ে গেলে কোনো শিক্ষক এসে তাকে আবার তার জায়গায় ফিরিয়ে দিতেন।
স্কুলের কোনো অনুষ্ঠানেও তাদের নিয়ে যাওয়া হত ওইভাবে। উঁচু ক্লাসের দাদারা থাকতেন পাহারায়। কেউ লাইনচ্যুত হলেই দৌড়ে এসে তাকে আগের জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিত।
এভাবেই মনের ভেতর শৃঙ্খলার বাতাবরণ তৈরি হয়েছে সৌম্যের।
স্কুল থেকে কলেজ, তারপর চাকরিজীবন। অনেকটা পথ অতিক্রম করেছে সৌম্য।
স্কুলে শেখানো শৃঙ্খলার অবশিষ্ট এই ইঁদুর দৌড়ে মনের গোচরে থেকে যায়। সারিবদ্ধ থাকলে পিছিয়ে পড়ার ভয় গ্রাস করে সৌম্যকে। কিন্তু যা একবার মনের গভীরে রোপন হয়ে গেছে তা সে কিছুতেই উচ্ছেদ করতে পারে না। নিকটজনের মধ্যে কেউ কেউ শৃঙ্খলা ভেঙে চড়চড় করে এগিয়ে গেছে। সৌম্য পারে না, কিছুতেই পারে না। তাই আজও তাকে মধ্যবিত্ত মানসিকতা বলে গঞ্জনা সহ্য করতে হয়। সে বুঝেছে শৃঙ্খলা ভেঙে দৌড়তে একটা দম লাগে। ওই দমটাই তো ছুটিয়ে নিয়ে বেড়ায়। বুকটা একটু বেশিই ধুকপুক করে। রাতে শোওয়ার পরও থামতে চায় না। কিন্তু সৌম্যের বুকটাও তো ধুকপুক করে। তবে সেটার মধ্যে একটা ছন্দ আছে। রাতের বিছানায় তাই সে ঘুমকে বশে আনে অনায়াসেই।
***
এখন বাইরে বেরোনোটা ভীষণ হ্যাপার। মুখে মাস্ক, হাতে গ্লাভস, পকেটে স্যানিটাইজার। পথে নামলেই চারিদিক দেখে নেওয়া। কেমন একটা উত্তেজনা টের পায় সে। এভাবে আর কতদিন? এতে তো মানুষে মানুষে দূরত্ব আরও বেড়েই যাচ্ছে! ধুর! আর ভাবতে ভাল লাগছে না!
এর মধ্যে সমরদা প্রায় গায়ের কাছে এসে জিজ্ঞেস করে, কোথায় চললে সৌম্য?
এক লাফ দিয়ে খানিকটা সরে বলে, বাজারে।
সমরদা কী যেন বলতে যাচ্ছিলেন। সৌম্য এবার জোর কদমে পা ফেলে কিছুটা এগিয়ে যায়। এ লোকটা তো বড্ড গায়ে পড়া স্বভাবের। খানিকটা পালিয়ে যেতে যেতে বলে, দেরি হয়ে যাচ্ছে, পরে ফোনে কথা বলে নেব।
তাড়াতাড়ি মাছের বাজারে গিয়ে ঢুকে পড়ে। চেনা মাছওয়ালা তাকে দেখেই হাত নাড়ে। সামনে গিয়ে দ্যাখে তিনজন কিছুটা দূরে দূরে দাঁড়িয়ে লাইন দিয়েছে। সৌম্য সেই দূরত্ব বজায় রেখে পেছনে দাঁড়িয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পরে পেছনে ফিরে দ্যাখে আরও চারজন দাঁড়িয়ে। আজ অবশ্য দু-একটা দোকান খুলেছে। তাই এই অবস্থা। সে খেয়াল করে পেছনের লোকটা বার বার তার গা ঘেঁষে দাঁড়াচ্ছে। দু-বার সতর্ক করলেও কোনও হেলদোল নেই। তার ওপর মাস্কটাকে মুখের থেকে নামিয়ে থুতনির কাছে রেখেছে।
এবার সৌম্যের পালা। সে সামনে যেতেই পেছনের লোকটা একেবারে ঘাড়ের ওপরে এসে বলে, আমাকে এক কেজি দাও।
সৌম্য বিরক্তবোধ করে। মাছওয়ালা সাথে সাথে সৌম্যকে দেখিয়ে বলে, আগে উনি, তারপর...
সৌম্য ভাল করে দ্যাখে একটা মাত্র রুই মাছ পড়ে আছে। তার মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি খেলে যায়। সে পুরো মাছটা দিতে বলে। কিন্তু বেশিদিন ফ্রিজে রাখলে মাছের স্বাদ চলে যায়। মামনও চেঁচামেচি করবে। কিন্তু লোকটার ওপর রাগটা সে এভাবেই প্রশমিত করতে চায়। পরক্ষণেই চোখ যায় ওই লোকটার দিকে। তাঁর হতাশ চাউনি দেখে মায়া হয় সৌম্যের। সে এবার বলে, ওঁনাকে এখান থেকে কিছুটা দিয়ে দাও।
লোকটা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। সেখান থেকে বেরিয়ে কিছু সবজি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল বাড়ির উদ্দেশে।
ঘরে ঢুকেই সে গিয়ে দাঁড়ায় জানলার কাছে। তখনও চড়ুইপাখিরা একে একে আসছে আর ঠোঁটে খাবার নিয়ে উড়ে যাচ্ছে। সৌম্য ওদের শৃঙ্খলাবদ্ধ আসা-যাওয়া একদৃষ্টিতে দেখতে থাকে।
Post a Comment