প্রতি অমাবস্যার নিশুতি রাতে সে নারী কণ্ঠস্বর নকল করে পুরুষদের আকর্ষণ করত এবং টুঁটি কামড়ে হত্যা করত।
জঙ্গলে মোহিনী
সুমিত তালুকদার
নদীর জলের আওয়াজের সাথে সাথে হঠাৎ মনে হোলো নারী কন্ঠের চিৎকার। ভয়ার্ত আর্তনাদে নিশুতি রাতের নিস্তব্ধতা খান খান হয়ে যায়।জঙ্গলের ভিতর থেকে চিৎকারটা শুনতে পেলাম যেন। শুনেছি এ জঙ্গলে চিতা বাঘ আছে। নদী পেরিয়ে হানা দেয় মাঝে মধ্যে লোকালয়ে। মুরগি-হাঁস, ছাগল-ভেড়া সুযোগ পেলে ঘাড় মটকে নিয়ে যায়। হয়ত কোনো চিতা বাঘ ঝাঁপিয়ে পড়েছে মহিলার উপর। টুঁটি টিপে মুহূর্তে ফালাফালা করেছে তার যুবতী শরীর। নরমাংসের স্বাদই আলাদা। চিলাপোতার জঙ্গলে ফরেস্ট অফিসার হয়ে এসেছি গত সপ্তাহে। যে বাংলোয় আপাতত আমার আস্তানা তাঁর নাম ম্যাথু সাহেবের বাংলো। ব্রিটিশ যুগে ম্যাথু সাহেব ছিলেন আমার মতোই ফরেস্ট অফিসার। আসলে চিলাপোতার জঙ্গলে প্রচুর চিতা বাঘ ছিল একসময়। জঙ্গলে কাঠ, মধু, শালপাতা সংগ্রহ করতে যেত স্থানীয় আদিবাসীরা। চিতা বাঘের অতর্কিত হানায় হতাহত হত প্রচুর। ফলত ভয়ে আর জঙ্গলে যেতে চাইত না কেউ। জঙ্গলের বনজ সম্পদ আহরণ বাধাপ্রাপ্ত হয়েছিল ভীষণভাবে। সরকারি আয়ও কমে গেছিল। ডাক পড়ল ম্যাথু সাহেবের। একাই রাইফেল হাতে চিলাপোতার জঙ্গল প্রায় চিতা বাঘ শূন্য করে ফেলেন। কিন্তু মোহিনী নামে একটি চিতা বাঘকে তিনি কিছুতেই বাগে আনতে পারছিলেন না। আহত বা হত্যা করা তো দূর অস্ত। জনশ্রুতি এই যে, এই চিতা বাঘিনীটি নাকি ছলাকলায় অত্যন্ত পটু ছিল। আশ্চর্য মনে হলেও প্রতি অমাবস্যার নিশুতি রাতে সে নারী কণ্ঠস্বর নকল করে পুরুষদের আকর্ষণ করত এবং টুঁটি কামড়ে হত্যা করত। স্থানীয় আদিবাসীদের এমনটাই অন্ধবিশ্বাস, অলৌকিক উপলব্ধি। তাই তারা চিতা বাঘিনীটির নাম দিয়েছিল মোহিনী। বিলেতপাশ ম্যাথু সাহেবের এসব আজগুবি ব্যাপারে বিশ্বাস ছিল না। হয় এস্পার না হয় ওস্পার এই বলে, তাঁর গুরু করবেট সাহেবের নাম স্মরণ করে, রাইফেল হাতে একদিন একাই চিলাপোতার গভীর জঙ্গলে অন্তর্হিত হলেন।
ঠিক তিনদিন পর তাঁর মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া গেল সাড়ে তিন হাত গভীর এক গর্তে। পাশে শায়িত তাঁর টোটাভরা রাইফেল। টুঁটির কাছে দুটো ক্ষত। আর ডান হাতের মুঠোতে ধরা একখণ্ড লাল কাপড়ের ছিন্ন অংশ। এই রহস্যের সঠিক ব্যাখ্যা বা সমাধান আজও হয়নি। তবে প্রচলিত বিশ্বাস এ নৃশংস হত্যাকাণ্ড মোহিনীর দ্বারাই সংঘটিত হয়েছে। সে ধরা দেবে না কিছুতেই। বাংলোর চেয়ারে বসে নারী কন্ঠের চিৎকার শুনে আমার ম্যাথু সাহেবের ঘটনার কথা মনে পড়ল। আজ অমাবস্যা। মনে মনে চাপা উত্তেজনা, কৌতূহলও হচ্ছিল। সত্যি কোনো মহিলা জঙ্গলে কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়ে বিপদে পড়েছে। হয়ত গভীর জঙ্গলে পথ হারিয়ে ফেলেছে। বাঘিনী, মোহিনী, নারীকন্ঠের আর্তনাদ- কোনো যোগসূত্র আছে কি? বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। নিজের চোখে পুরো ঘটনাটার সত্যাসত্য উদ্ঘাটন করতে চাইছিলাম। একজন দায়িত্ব সচেতন ফরেস্ট অফিসার হিসাবে জঙ্গলের ভালোমন্দ দেখা আমার কর্তব্য। কাচের আলমারি থেকে ম্যাথুসাহেবের রাইফেলটা হাতে তুলে নিলাম। চেক করে নিলাম। এতদিনেও ঠিক আছে। আসলে চিতা বাঘ হত্যা করা আমার উদ্দেশ্য নয়। শূন্যে ফায়ার করে ভয় দেখানো, আত্মরক্ষা করার প্রচেষ্টামাত্র। চিতা বাঘ সংরক্ষণের তালিকায় পড়ে। এখন গরমকাল। নদী প্রায় শুকিয়ে গেছে। আধহাঁটু জল পেরিয়ে জঙ্গলে প্রবেশ করতে অসুবিধা হোলো না। কিছুদূর যাওয়ার পর বাঘের পায়ের ছাপ লক্ষ্ করলাম। পায়ের ছাপ ধরে এগিয়ে গেলাম। কিন্তু একি! বাঘের পায়ের ছাপ হঠাৎ বদলে গেছে অবিকল মানুষের পায়ের ছাপে। তবে কি ম্যাথুসাহেবের ঘটনা সত্যি হতে চলেছে। মোহিনী আবার ফিরে এসেছে। আমার শিরদাঁড়া বেয়ে ভয়ের হিমশীতল স্রোত নেমে যায়। হঠাৎ অদূরে বাঘের গর্জন শোনা যায়। বারবার সেই গর্জনে যেন জঙ্গলের নিস্তব্ধতা খান খান হয়ে যায়। স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাইফেলের ট্রিগারে আঙুল চলে যায়। ঝোপ থেকে লাফ দিয়ে হঠাৎ বাঘটি আমায় আক্রমণ করে। তীক্ষ্ণ থাবায় বুকের মাংস খুবলে নেয়। রক্তাক্ত আমি। হাত কাঁপছে। গুলি চালাতে পারি না। আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করি, আরেকটি চিতা বাঘ হঠাৎ কোত্থেকে আমাকে আক্রমণ না করে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রথমটির ওপর। এরপর শুরু হয় দুজনের মধ্যে হিংস্র লড়াই। হিংস্র থাবায় আহত ক্ষতবিক্ষত দুজনেই। হঠাৎ দ্বিতী্য বাঘটি প্রথমটির টুঁটি কামড়ে ধরে। অকস্মাৎ নারী কণ্ঠস্বরে সমস্ত চিলাপোতা জঙ্গল কেঁপে ওঠে। অতর্কিতে ট্রিগারে আঙুল চলে যায়। ফায়ার। তারপর জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।
পরের দিন স্থানীয় আদিবাসীরা আমাকে উদ্ধার করে। লতাপাতার রস বেটে ক্ষতস্থানে প্রলেপ লাগিয়ে দেয়। ঘটনার সবিস্তার বর্ণনা দিই। আমার সামনে এখন দুটি চিতা বাঘের মৃতদেহ পড়ে।পুরুষ আর নারী। বিশ্বাস- অবিশ্বাসের দোলায় দুলছি। মনে মনে বলি, একজন যদি মোহিনী হয় তবে দ্বিতীয়জন কে? ম্যাথু সাহেব?
সুমিত তালুকদার, ৫৮ শ্যাম রোড, পোঃ – নৈহাটি, জিলা – উত্তর ২৪ পরগণা, পিন কোড – ৭৪৩১৬৫, দূরভাষ – ০৩৩২৫৮০৬১৯৪ / ৯১৪৩৭০১২৮৮
Post a Comment