পরিতোষ চিরকালই অন্তরমুখী.বিনয়ী.কারও সাথেই সে বেশী মেলা মেশা পছন্দ করে না.

 

Story and Article

ছোটগল্প

-------------
সোনার হরিণ
--------------------
অমিতাভ মুখোপাধ্যায়

প্রতিদিন কাঁধে একটি স্কাই ব্যাগ নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয় পরিতোষ.8-24এর ট্রেন ধরে সে. বাড়ি ফেরে কোনদিন 9-30টার বা 10-10এর ট্রেনে.যে পাড়ায় সে থাকে সেই বিধান পল্লী-তে সেখানে কেউ কারও নয়. মুখে শুকনো হাসি দিয়ে মাঝে মধ্যে পরিচিত জনের সঙ্গে পথে ঘাটে, বাজারে বাক্য বিনিময় হয় একে অপরের. হৃদ্যতার সম্পর্ক কোন কোন পরিবারের মধ্যে আছে বটে তাও নিজের ওজন এককথায় একটা প্রচ্ছন্ন অহমিকা বোধ বজায় রেখে তারা চলে . পাড়ার দুর্গাপূজার সময় প্রতিবেশীদের মধ্যে একটা সাময়িক মিলিজুলি সম্পর্ক প্রতিবছরই গড়ে ওঠে. নবমী নিশিতে সেই সম্পর্ক ফিকে হতে শুরু করে. বিজয়ার পর তা বিচ্ছেদে পরিণত হয়. পর পর দুবছর কোরোনার কল্যাণে এখন আবার এক অন্য মাত্রা পেয়েছে.সম্পর্ক গুলো ধরি মাছ না ছুঁই পানি গোছের হয়ে দাঁড়িয়েছে. .
পরিতোষ চিরকালই অন্তরমুখী.বিনয়ী.কারও সাথেই সে বেশী মেলা মেশা পছন্দ করে না. পরিতোষের বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই.কয়েক বছর আগে তার নিকট আত্মীয় অবিনাশ বাবু তার বিয়েও দিয়ে দিয়েছেন. তখন সে একটা প্রাইভেট এজেন্সীতে কাজ করতো. সেটিও এখন নেই. সরকারি চাকরি তো আজকাল সোনার হরিণ. তাই তার মতো একজন সাধারণ গ্রাজুয়েট ও কম্পিউটার ট্রেন্ডএর পথে পথে একটা নির্দিষ্ট কাজের আশায় ঘুরে বেড়ানো ছাড়া উপায় কী? পরিতোষ তবুও কলকাতার বিভিন্ন অফিসে সি ভি জমা দিয়ে অপেক্ষা করে যদি কোথাও ডাক পায়. কিন্তু মেলে না. মিললেও ইদানীং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে একটা রেওয়াজ হয়েছে, কয়েক মাস নাকে দড়ি দিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়া . কনফার্মেশনএর মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে - অতিরিক্ত সময় কাজ করিয়ে নিয়ে, পরে কোন এক মাসে, মাস মাইনে বন্ধ করে দিয়ে --
বিনীত ভাবে জানিয়ে দেওয়া , 'আপনার কাজে আমরা সন্তুষ্ট নই. তাই আপনাকে আর আসতে হবে না.'
পরিতোষএর এই ধরনের নির্মম অভিজ্ঞতা এখন রুটিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে. এক রাশ হতাশা নিয়ে পরিতোষ কয়েক বার নিয়োগ কারীদের কাছে জানতেও চেয়েছে, 'কোথায় তার ত্রুটি বিচ্যুতি হয়েছে?'এসব প্রশ্নের উত্তর মেলে নি, কোনোদিন মিলবেও না.বিমর্ষ পরিতোষ জানতে চায় -
-আমার গত মাসের মাইনেটা?
ও আপনার একাউন্টএ চলে যাবে.
সেই টাকা আর একাউন্টএ ঢোকে না.--
পরিতোষএর কর্মজীবনের ধারাটা কয়েক বছর ধরে এই রকমই চলছে. যেন এক অনিশ্চিত দিন যাপন.
দেশের হাজার হাজার পরিতোষ প্রায় প্রতিদিনই কাঁধেএকটা মলিন ব্যাগ, ভেতরে মার্কশীটএর একটা ফাইল, অন্য জায়গায় কাজ করার কয়েকটি সার্টিফিকেটস, একটা রং চটা জলের বোতল আর পাঁচটাকা দামের একটা বিস্কুটের প্যাকেট নিয়ে কলকাতা, সল্টলেক, হাওড়ায় ঘুরে বেড়ায় .
পরিতোষ ইদানীং স্বাভাবিক কারণেই মানসিক দিক দিয়ে ভেঙে পড়েছে. সে জানে কলসীর জল একদিন শেষ হয়ে যাবে. কী ভাবে চলবে তাদের আগামী দিনগুলো? বিবাহিত স্ত্রী আশার কাছে তার যে কোন মূল্যই থাকবে না. একটা সন্তান চাইলেও - তার দুধের জোগাড় করতে পারবে না. এটাই কী পরিতোষদের নিষ্ঠুর ভবিতব্য? অবিনাশ বাবু ও তার স্ত্রীও পরিতোষকে নিয়ে উদ্বিগ্ন. অবিনাশ বাবু কয়েক জন প্রভাব শালী ব্যক্তিকে একটা অন্ততঃ চতুর্থ শ্রেণীর সরকারি কাজ পরিতোষএর জন্য করে দেওয়ার কথা বলেছিলেন. তাঁরা দেখবো বলে পাশ কাটিয়ে গেছেন----
অবিনাশ বাবু জানেন, সরকারি, বেসরকারি কাজ পাওয়ার পরীক্ষা গুলি প্রায় সবই প্রশ্ন চিহ্নের মুখে. লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও, ইন্টারভিউএর আগে উমেদার ধরতে হয়. ডাইনে বামে কামিনী- কাঞ্চনের খেলা চলে. শিক্ষকতার চাকরি নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরেই হাই কোর্টএ মামলার পাহাড় জমেছে . কেউ কারও ভালো দেখতে পারে না. মামলা করা আর জিতিয়ে দেওয়ার মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া এক শ্রেণীর উকিলএর রোজগারএর একটা পথ খুলে দিয়েছে. পরোক্ষে সরকারকে এঁরাই চাকরি না দেওয়ার ব্যাপারে সাহায্য করছেন. একটা স্থগিত আদেশ বের করে দিয়ে দায় সারছেন.
পরিতোষএর মতো হতভাগ্যদের শিক্ষকতার কাজ পাওয়ার মতো অতিরিক্ত যোগ্যতাও নেই.
না করণিক না শিক্ষক কোন কর্ম ক্ষেত্রের পথই না কেন্দ্র না রাজ্য কোথাও আজ খোলা নেই. করোনা আবহে স্থায়ী অস্থায়ী পদে কোটি কোটি ব্যক্তি ইতিমধ্যেই
কাজ হারিয়েছেন. সরকার কারও পাশেই সে ভাবে দাঁড়ায় নি. দু 'কেজি করে চাল গম দিয়ে দায় সেরেছে.
অবিনাশ বাবু খবরের কাগজের পাতা উল্টে চাকরির বিজ্ঞাপন খুব কমই দেখেন. যাও বা দু'একটা মেলে সেখানেও অভিজ্ঞতা চাই. যে পোড়া দেশে চাকরিই নেই -সেখানে আবার অভিজ্ঞতা বেকার ছেলেরা কোথা থেকে জোগাড় করবে? ব্যাবসায়িক বুদ্ধিও সকলের থাকে না. তাহলে এরা কী করবে? কোন অসামাজিক কাজও পরিতোষরা করতে পারবে না.
এরা অতি সাধারণ. এদের চাওয়ার মধ্যেও একটা সীমাবদ্ধতা ইতিমধ্যেই তৈরী হয়ে গেছে. এরা আর গাড়ী বাড়ীর স্বপ্ন দেখে না. শুধু দুবেলা দুমুঠো খেয়ে পরে বেঁচে থাকতে চায়. এরা এতদিনে হোঁচট খেতে খেতে বুঝে গেছে, সরকারি চাকরির মতো সোনার হরিণের স্বপ্ন দেখার অধিকার নেতা মন্ত্রীদের ছেলে -মেয়েদের থাকলেও তাদের অন্ততঃ নেই.
পরিতোষরা আজ শুধু সমাজ সংসারের বোঝা নয়. সারা দেশের কাছে নাগরিক অধিকার বঞ্চিত এক অবাঞ্ছিত জন সংখ্যা মাত্র.