অধিকাংশ জনেরই আক্রমণের ভাষা একেবারেই মার্জিত নয়। এমন ভাষাও তারা প্রয়োগ করেছে যা আমি নিজে কখনও উচ্চারণ করতে পারব না। শুধু অশ্লীলই নয়, পীড়াদায়ক এবং ভীষণভাবে যন্ত্রণাদায়ক।

 

Story and Article

সৌরভ অঞ্জনদের কাছে মানবিকতার চর্চাও অসহ্য হয়ে উঠছে

  🤺

 তৈমুর খান

🙆


 নিজের লেখাতে, জীবনচর্চায়, বিশ্বাসে এবং আচরণের মধ্যেও সবার উপরে মানবিকতাকেই স্থান দিতে চাই। জাত-ধর্ম- বর্ণ-সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে 'সবার উপরে মানুষ সত্য' এই বিশ্বাসটিই আজীবন লালন করে আসছি। অর্থাৎ আমার সারাজীবন ধরে মানুষ হবার সাধনাটিই আমার স্বপ্ন হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই মানুষ হওয়ার পথ খুব মসৃণ নয়। পারিপার্শ্বিকের অনেকেই আমাকে পছন্দ করেন না, এমনকী সহ্যও করতে পারেন না। তাদের প্রশ্ন হল: "কেন মানুষ হবি? মুসলমানরা কখনও মানুষ হয়? ওরা তো সন্ত্রাসবাদী হয়! আর তোর নামটাও তো এক সন্ত্রাসবাদীর নাম। যে সম্প্রদায়ে তোর জন্ম সেই সম্প্রদায়ের কেউ মানুষ হয় না।" সুতরাং যতই লেখালেখি করি ততোই কিছু মানুষের ক্রোধ বাড়তে থাকে। প্রতিমুহূর্তে সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন মাধ্যমে চলতে থাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ। আক্রমণ জমতে জমতে পাহাড় হয়ে যায়। এমনকী মেরে ফেলার হুমকিও আসতে থাকে। উত্তরে ওদের জানাই: আমাকে মেরে ফেলা খুব সহজ। যেকোনো দিন চলে আসুন আর হত্যা করে চলে যান। আমি কোনো রাজনৈতিক নেতা নই। একজন সামান্য মানুষ। অতি নগণ্য।


  মানুষ এবং মানবিক শব্দগুলি ওদের পছন্দ নয়। আর এসব নিয়ে কাব্য-কবিতাও লেখা চলবে না। আমি যেন ভারতে থেকে এসব মানবিকতার কথা আর না লিখি। বেশ কিছুদিন আগে কলকাতা শহরতলীর কাছাকাছি থাকা এক তরুণ কবিতা চর্চাকারী আমাকে ইনবক্সে লিখলেন: "আপনি পাকিস্তানের যেতে পারেন, সেখানে গিয়ে উর্দুতে সাহিত্য চর্চা করতে পারেন। ভারতে কেন আছেন? ভারত তো আপনার দেশ নয়!"


    একে কী উত্তর দেবো সেটাই ভেবে পাইনি। পাকিস্তানে গিয়ে উর্দুতে সাহিত্যচর্চা করব তার উপদেশটি এখনও আমার কানে বাজে। এরা কতটা বিদ্বেষে আক্রান্ত সেটাই ভাবতে পারি না। সেই কবির সাথে ভবিষ্যতে আর কোনো সম্পর্ক রাখিনি।


    সাহিত্যজগতে অনেক ক্ষেত্রেই আমার নাম নিয়েই অনেকেই মূল্যায়ন করে থাকেন। আমার ভাবনা কেমন হবে, রুচি কেমন হবে, মেধা কেমন হবে, দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হবে, জীবনচর্চা কেমন হবে, এমনকী সাহিত্য কেমন হবে তা তারা চোখ বুজেই বলে দিতে পারেন। ওরা একটা বিন্দুতেই সর্বদা বিশ্বাস রাখেন সেটা হল: 'মুসলমানরা সন্ত্রাস ছাড়া কিছুই করতে পারে না।' সুতরাং বাকিটা আর ভাববার কোনো অবকাশই নেই।


      প্রতিদিন মানসিকভাবে নানা আঘাত পেলেও কখনও সোশ্যাল মিডিয়ায় মুখ ফুটে বলিনি। কিছু রচনার মধ্যে তা প্রতিফলিত হয়েছে। নিজের কাজে অটল থাকার চেষ্টা করেছি। কিছু ভালো বন্ধু অবশ্যই আছেন এবং তাদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। তাদের উৎসাহ ও প্রেরণা এখনও সাহস যোগায়। তবু সেদিন কর্মস্থলে যাবার জন্য ট্রেনে উঠে বসেছি। আমার পাশেই বসে আছেন স্বনামধন্য অধ্যাপক পি ব্যানার্জি। কথায় কথায় তাঁর সঙ্গেই আলোচনা হচ্ছিল সাম্প্রতিককালের রাজনীতি নিয়ে। তিনি একবার বললেন: "এইসব সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডে শুধুমাত্র মুসলমানরাই দায়ী নয়, অন্যরাও দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে না। আমি দেখেছি কারগিল যুদ্ধে বহু মুসলিম সেনা দেশমাতার নামে জয়ধ্বনি দিয়ে আত্মবলিদান করেছে। এখনও সেরকম মানুষ ভারতে বহু আছেন।"


   আমাদের পাশেই থাকা এক তরুণ যুবক তিনিও একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মী। তাঁর কথাটি ধরে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন: "এসব ফালতু কথা বলবেন না, কোনো মুসলমান দেশের জন্য কখনও প্রাণ দিতে পারে না। ওরা সবাই পাকিস্তানের সাপোর্টার। এখন যাকে নিরীহ দেখছেন, আসলেই সে নিরীহ নয়। সন্ত্রাসবাদের বীজ বুকে নিয়ে সে ঘুরছে। সুযোগ পেলেই তার প্রয়োগ করবে। আর আপনাদের মতো শিক্ষিত হিন্দুরাই ওদের আস্কারা দিচ্ছে।"


   ওর কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে ওর মুখের দিকে চেয়ে রইলাম। এই আমাদের ভারতবর্ষ। পি ব্যানার্জি ছেলেটিকে দণ্ডবৎ করলেন। তার সঙ্গে তর্কে পারবেন না বলে আর কিছুই উত্তর করলেন না। কেননা অনেকেই ছেলেটির পক্ষে ইতিমধ্যে দাঁড়িয়ে গেছে। আমাকেও মাথা নিচু করে চুপচাপ হজম করতে হল সবকিছু।


    চারিপাশের বন্ধুজনের সঙ্গে যতটা পারি হাসিমুখে আলাপ-আলোচনা করি, এসব কথার প্রসঙ্গ কখনও উত্থাপন করি না। কিন্তু যাদের সঙ্গে কখনও দেখা হয় না, কখনও যাদের নামই শুনিনি। যারা বাংলাদেশে থাকেন, অসমে থাকেন, দিল্লীতে থাকেন, মহারাষ্ট্রে থাকেন, উত্তরপ্রদেশ বা মধ্যপ্রদেশে থাকেন; হয়তো চাকরিসূত্রে, কিংবা উদ্বাস্তু হিসেবে, কিংবা ভিন্ন কারণে প্রবাসী হিসেবে, কিন্তু তারাও যখন গালিগালাজ করেন সোশ্যাল মিডিয়ায় —তখনই বেশি খারাপ লাগে। ওরা যদি জানত, চিনত আমাকে, এবং তারপরও গালিগালাজ করত তাহলে হয়তো এমন ভাবে আঘাত আসতো না। কিন্তু তারাও মানবিকতার সমর্থনকে বা বক্তব্যকে কিছুতেই সহ্য করতে পারেন না। ইদানীং বাংলাদেশের লোকেরা আমাকে বেশি গালিগালাজ করছেন। সৌরভ অঞ্জন (Showrav Anjan) নামে মেডিকেল বিভাগের এক কর্মীও সম্প্রতি আমাকে যে ভাষায় আক্রমণ করেছে সেটি উদাহরণ হিসেবে তুলে দিলাম।

Story and Article


অধিকাংশ জনেরই আক্রমণের ভাষা একেবারেই মার্জিত নয়। এমন ভাষাও তারা প্রয়োগ করেছে যা আমি নিজে কখনও উচ্চারণ করতে পারব না। শুধু অশ্লীলই নয়, পীড়াদায়ক এবং ভীষণভাবে যন্ত্রণাদায়ক। দীর্ঘদিন ধরে এই আক্রমণ সহ্য করে করে আমি বুঝতে পারছি, পৃথিবীতে মানুষ কখনোই সভ্য হবে না। হিন্দু-মুসলিম করে করে তারা তাদের সমস্ত জীবন কাটিয়ে দেবে আর নিরন্তর গালিগালাজ করে যাবে। সৌরভ অঞ্জনের ফেসবুক আইডিতে শুধু দেবদেবীর ছবি আর অন্য কিছুই নেই। তার কাছে একটি প্রশ্ন: মানবিকতা কে দূরে সরিয়ে রেখে, অথবা মুসলমানদের গালিগালাজ করে তার ঠাকুর দেবতাকে কি সন্তুষ্ট করা যাবে? না তার ধর্মকে মহৎ প্রমাণ করা যাবে? মানুষকে ভালোবাসা কি ধর্ম নয়? বাংলাদেশের কুমিল্লায় কে ঠাকুরের মূর্তি ভেঙেছে জানি না। যে ভেঙেছে তাকে ধিক্কার জানাই। পাকিস্তানে কে বা কারা কাকে ধর্মান্তরিত করেছে তাও জানি না। তবে ধর্মান্তরিত জোর করে করা যায় না। ধর্মান্তরিত হওয়াও যায় না। প্রত্যেকেরই নিজস্ব বিশ্বাস আছে। যে কোনো পর্যায়ে সে তার স্রষ্টাকে বিশ্বাস করতে পারে। তবে সব ধর্মের মূল কথা যে মানুষকে ভালোবাসা তা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। সৌরভ অঞ্জন, এত সংকীর্ণতা নিয়ে, এত বিদ্বেষ নিয়ে, সুট কোট টাই পরে, দেবদেবীর ছবি লাগিয়ে কি প্রকৃত ধার্মিক হওয়া যাবে?


  🧖