দীপক বেসিন থেকে হাত ধুয়ে ঘুগনি-রুটি নিয়ে বসে পড়ে। একটা গভীর শ্বাস নিয়ে ঘুগনির গন্ধ নেয়।
হারিয়ে যাওয়া - জয়নারায়ণ সরকার
সবকিছু গোছগাছ হয়ে গেছে আগের দিন রাতে। জয়শ্রীর করা লিস্ট মিলিয়ে নিচ্ছিল দীপক। একটু পরেই ওদের বেরিয়ে পড়তে হবে। অন্তত দেড় ঘণ্টা আগে এয়ারপোর্টে পৌঁছতে হবে। ছেলে সন্তু আনন্দে ডগমগ করছে। অনেক দিন পরে সে যাচ্ছে মাসির বাড়ি। দীপকের যাওয়ার কথা থাকলেও অফিসে ছুটি না মেলায় শেষ মুহূর্তে টিকিট ক্যানসেল করতে হয়। এবার জয়শ্রী তাড়া দিতে থাকে। তাড়া দিলেও ওকে উদাস মনে হয় দীপকের। বিয়ের কুড়ি বছর পার করে এই প্রথম আলাদা কোথাও যাচ্ছে জয়শ্রী। ফোনটা বার করে একটা ক্যাব বুক করে। নিজেও দ্রুত তৈরি হয়ে নেয়। জয়শ্রী শেষ মুহূর্তে সব কিছু মিলিয়ে নিচ্ছে। লাগেজগুলো একটা, একটা করে নীচে নামায় দীপক। ততক্ষণে ক্যাব এসে গেছে। ফ্ল্যাটের দরজায় তালা দিয়ে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে নীচে নেমে আসে জয়শ্রী। দীপক ডিকিতে লাগেজ তুলে সামনের সিটে গিয়ে বসে। জয়শ্রী তড়িঘড়ি ছেলেকে নিয়ে পেছনের সিটে গিয়ে বসে দরজা বন্ধ করে দেয়। রাস্তায় জয়শ্রী বার বার বলতে থাকে, ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করবে। একদম না খেয়ে থাকবে না। রোজ রাতে ফোন করবে।
দীপক শুধু মাথা নেড়ে সায় দেয়।
এয়ারপোর্ট থেকে ফেরার সময় ফাঁকা বাসের জানলার ধারে বসে। বাসটা একটু বেশি জোরে চলছে। মুহূর্তের মধ্যে সরে সরে যাচ্ছে দোকানপাট। দীপক স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বাইরের দিকে। বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।
***
ঘুম চোখে ফোনটা ধরে দীপক। হ্যালো বলতেই ওপারে শুনতে পায় জয়শ্রীর গলা। 'কতক্ষণ ধরে ফোন করছি, এখনও ঘুমোচ্ছো। আটটা বাজে। অফিসে যেতে দেরি হয়ে যাবে। তাড়াতাড়ি উঠে পড়ো। চা-টা খেয়ে নাও। পরে আবার ফোন করব।' একনাগাড়ে কথাগুলো বলে ফোন কেটে দেয়। দীপক বুঝতে পারে ওখানে গিয়েও শান্তিতে নেই সে। দীপক এবার বিছানা ছেড়ে উঠে বাথরুমে ঢোকে। হঠাৎ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠে। সাড়ে ন'টা বাজে। আজ অফিস যেতে অনেক দেরি হয়ে যাবে। ফ্রিজে রাখা সামান্য দুধ গরম করে মুড়ি ভিজিয়ে খেয়ে ব্যাগ নিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছোটে মেট্রো স্টেশনের দিকে। অফিসে পৌঁছে নাড়ুকে ডেকে একশো টাকা দিয়ে ঘুঘনি আর পাউরুটি আনতে বলে। নাড়ু খানিকটা বিস্ময় প্রকাশ করে বলে, এত বছর এই অফিসে আছেন, কোনোদিন দেখিনি আপনাকে বাইরের খাবার খেতে। দীপক কম্পিউটারটা অন করে বলে, তোকে যা বলেছি তাই কর। এবার নাড়ু আহ্লাদে গলায় বলে, আমিও আজ কিছু খেয়ে আসিনি। দীপক এবার তার মতলব বুঝতে পেরে হেসে বলে, ঠিক আছে। তোর জন্যও নিয়ে আসিস। একথা শুনে মুহূর্তের মধ্যে হাওয়া হয়ে যায় নাড়ু। দীপক এবার মাউসে হাত দিয়ে কাজ করতে যাবে এমন সময় পাশের টেবিল থেকে সান্যাল বলে, কী দীপকদা, বউদি আজ কিছুই করে দেয়নি! কোনো ঝামেলা হয়েছে বুঝি?
দীপক মাথা নেড়ে বলে, আরে না না। ওরা কাল শালীর বাড়ি গেছে।
সান্যাল বলে, কোথায় থাকে তোমার শালী?
দীপক বলে, মুম্বই।
সান্যাল আর কথা বাড়ায় না। সে কাজে মন দেয়। এরমধ্যে নাড়ু ঘুগনি-রুটি নিয়ে এসেছে। প্লেটে দিতে দিতে নাড়ু বলে, গরম-গরম খেয়ে নিন। আমিও এখুনি খেয়ে নেব।
দীপক বেসিন থেকে হাত ধুয়ে ঘুগনি-রুটি নিয়ে বসে পড়ে। একটা গভীর শ্বাস নিয়ে ঘুগনির গন্ধ নেয়।
***
হেলাবটতলার পাশে কার্তিকদার দোকান। ছুটির দিনে সকালবেলায় বন্ধুদের সাথে ঘুগনি-রুটি খাওয়ার মজা আলাদা। তখন ওরা ক্লাস সেভেনে পড়ে। স্কুলের টিফিনের পয়সা জমিয়ে রেখে কার্তিকদার দোকানে আসা। অবশ্য সেই টাকা জমা থাকত প্রদীপ্তর কাছে। ওরা চারজন প্রদীপ্ত, দীপক, সঞ্জীব আর ইন্দ্র। কার্তিকদাও বুঝেছিল ওরা ছুটির দিনগুলোতেই আসে।
একদিন ঘুগনি-রুটি দিতে দিতে কার্তিকদা বলে, তোমরা যে আমার দোকানে আসো তা বাড়ির বড়রা জানে?
ইন্দ্র সাথে সাথে বলে, কেন? তোমার দোকানে কি আসতে নেই?
কার্তিকদা আর কোনো কথা বলে না। সেই ঘুগনির স্বাদ আজও জিভে লেগে আছে দীপকের। তবে পরে তারা জেনেছিল কার্তিকদার দোকান লাগোয়া ছিল সাট্টার ঠেক।
***
কাজ করতে করতে কখন যে টিফিন আওয়ার্স শুরু হয়ে গেছে বুঝতে পারেনি। পাশের টেবিলে সান্যালের টিফিন ক্যারিয়ারের আওয়াজে তার হুঁশ ফেরে। এবার চেয়ারে বসেই 'নাড়ু' বলে হাঁক দেয়। নাড়ু কিছুটা দূরেই দাঁড়িয়ে ছিল ডাকের অপেক্ষায়। সে দ্রুত চলে আসে টেবিলের সামনে। দীপক টাকা দিয়ে বলে, চাউমিন আর চিলি চিকেন নিয়ে আসবি।
নাড়ু তবুও ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। দীপক এবার ধমক দিয়ে বলে, কী হল, যাবি তো। নাড়ু তাও নড়তে চায় না। দীপক বুঝতে পেরে আরও কিছু টাকা দেয়। মুহূর্তের মধ্যে নাড়ু ভ্যানিশ হয়ে যায়। টিফিন খেয়ে জলের বোতল থেকে জল খায়। টেবিলে রাখা মোবাইল বাজতে থাকে। সে দেখে জয়শ্রীর ফোন। হাতে তুলে হ্যালো বলে।
জয়শ্রী বলে, দুপুরে কী খেলে? উল্টোপাল্টা কিছু খাবে না। শরীর খারাপ হলে মুশকিলে পড়বে। রাতে তরকা-রুটি কিনে নিয়ে যেও।
***
হাইওয়ের ধারে পেট্রোলপাম্প লাগোয়া পারমিন্দারের হোটেল। ওই শিখ ভদ্রলোককে ছোটবেলা থেকে দেখেছে সে। তাদের পাশের পাড়াতেই একটা বাড়িতে ভাড়া থাকত। একবার পাড়ার ফাংশানে ভাংড়া নাচের জন্য সুপ্রিয়াদি ও কমলদার মাথায় পাগড়ি বেঁধে দিয়েছিল পারমিন্দারের স্ত্রী মানে আমাদের ভাবী। তাঁদের দুই মেয়ে নান্নী-মুন্নি পাড়ার দিদিদের কোলে কোলে ঘুরত সকাল-বিকেল। ওদের পরিবার আমাদের আপনজন হয়ে উঠেছিল। ওঁর হোটেলের তরকা এলাকায় বিখ্যাত ছিল । সঙ্গে একটু আচারও দিত। তখন এগারো ক্লাসে পড়ে দীপকরা। বন্ধুরা মিলে মাঝে মাঝে রাতে চলে যেত ওই হোটেলে। দড়িতে বোনা খাটিয়ায় বসে গরম গরম রুটি আর তরকা পরম তৃপ্তিতে খেত তারা। পাঁচ-ছ'টা রুটি কখন শেষ হয়ে যেত বুঝতেই পারত না। কোনো কারণে একদল লোক পারমিন্দারের হোটেল ভাঙচুর করে। কিন্তু সে ঘটনার বিন্দুবিসর্গ যোগ ছিল না পারমিন্দারের। সে ছিল নিরপরাধ। সেই রাতে চোখের জল বাঁধ মানেনি দীপকের। কিছুদিন বাদেই পারমিন্দার পরিবার নিয়ে দেশে চলে গিয়েছিল। সে চলে যাওয়ার সাথে সাথে তরকার ওই স্বাদও হারিয়ে যায় দীপকের কাছে।
***
একটু রাত করে ফোন করে জয়শ্রী। সে একনাগাড়ে সব খবর নিতে থাকে। শরীরের খেয়াল রাখার কথা বলতেও ভোলে না। তারপর গুড নাইট, সুইট ড্রিম বলে ফোন রেখে দেয়। ঘরে এখন জিরো পাওয়ারের লাইট জ্বলছে। আধো আলো-আধো অন্ধকার ঘিরে রেখেছে দীপককে।
প্রতিদিন জয়শ্রীর বারবার ফোন তাকে পাগল করে। আবার বেশ ভালও লাগে। মোবাইলের স্ক্রিনে জয়শ্রীর নাম ভেসে উঠলে বুকের ভেতরে কেমন যেন করে। এর আগে এভাবে তার খোঁজ রাখেনি কেউ। সে ক্রমশ ভালবাসার গভীরে হারিয়ে যেতে থাকে।
Post a Comment