বিলুপ্তির পথে বাংলা সংস্কৃতি - মোবারক মন্ডল
আমরা বাঙালি। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। প্রত্যেকটা জাতির বা দেশের নিজ নিজ সংস্কৃতি রয়েছে। যার উপরে সেই জাতির বা দেশের পরিচয় বহন করে এবং অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র দেখায়। যখন কোন জাতি সেই সংস্কৃতিকে ভুলে যায় বা অন্য কোন জাতির সংস্কৃতি মিশ্রণ ঘটে তখন সেই জাতি তার স্বতন্ত্রতা হারিয়ে ফেলে। জাতিগতভাবে বাঙালীর একটি নিজস্ব সংস্কৃতি আছে। সেটাই আমাদের পরিচয়। বাংলার সংস্কৃতিই আমাদেরকে পরিচয় করিয়ে দেয় যে আমরা বাঙালি।
সংস্কৃতি বা Culture হল বিভিন্ন সমাজে প্রাপ্ত সামাজিক আচরণ ও নিয়ম কানুনের সামষ্টিক বহিঃপ্রকাশ। মানুষের চিন্তা-চেতনা, আচার-আচরণ, জীবনযাত্রা, পোশাক, ভাষা, সাহিত্য, মূল্যবোধ, শিক্ষা, খাদ্যাভাস, ইতিহাস, রাজনীতি, অথনীতি এসবই হল তার সংস্কৃতি। মানুষ যা ধারণ ও চর্চা করে তাই তার সংস্কৃতি। বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি থাকে। দেশভেদে ও সময়ভেদে সংস্কৃতির পাথক্য ঘটে।
আজ বাংলা সংস্কৃতি বিলুপ্তির পথে। এর কারণ বাঙালী সংস্কৃতিতে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি মিশে এক মিশ্র সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে। এর প্রভাব এতটাই যে মাঝে মাঝে স্বকীয়তা খুঁজে বের করতেই কষ্ট হয়। বিদেশি সংস্কৃতি ভালবাসতে গিয়ে নিজের সংস্কৃতি হারাতে বসেছি। ভিনদেশীয় সংস্কৃতি আমাদের ওপর এতবেশি প্রভাব বিস্তার করছে যে আমরা কখনো কখনো যেন ঐ সংস্কৃতির দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছি। নিজ সংস্কৃতির প্রতি মানুষের কোন মমতা নেই, শ্রদ্ধা নেই, কোন আগ্রহ নেই। সারা বিশ্বে এখন পাশ্চাত্য সংস্কৃতির আগ্রাসন চলছে। এর ফলে আমরা আমাদের ঐতিহ্য, সন্মান হারাতে বসেছি । কেননা একটা জাতি তার সংস্কৃতির কারনে সন্মানিত হয়।
বাংলা সংস্কৃতি এখন অনাদুরে প্রাণহীন ইয়াতীম। ইংরেজী নববর্ষ সাড়ম্বরে, আতসবাজী, গান বাজনা বাজিয়ে, একে অপরকে হ্যাপি নিউ ইয়ারের অভিবাদন জানিয়ে আনন্দ মুখর পরিবেশে পালন করা হয়। দুঃখের বিষয়! বাংলা নববর্ষ পালন করা তো দূরের কথা বাংলা কোন মাস চলছে, কোন তারিখ আজ অনেকেই তা জানি না। আমাদের অজান্তেই বাংলা নববর্ষ অনাদরে পার হয়ে যায়। আজও বাংলা মাস তারিখ খুঁজতে গুগলে সার্চ দিতে হয়। লজ্জা!
বাঙালির চিরাচরিত ঈদ,মহরম, দূর্গোপুজো উৎসবগুলি আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে যাচ্ছে। তার জায়গায় প্রাধান্য পাচ্ছে বড়দিন, থার্টি ফার্স্ট নাইট, এপ্রিল ফুল, ভ্যালেন্টাইনের মত পাশ্চাত্যের নোংরা অশ্লীল উৎসবগুলি। বড় বড় শহরগুলি মেতে ওঠছে নোংরা উল্লাসে। গত ২৫শে ডিসেম্বর বড়দিন উপলক্ষে পার্কস্ট্রীটে যে জনজোয়ার দেখা গিয়েছে তাতে মনে হচ্ছে যীশুখ্রীষ্ট বাঙালী মহামনীষীদেরই একজন।অথচ এই উৎসবগুলির সঙ্গে বাঙালির কোনও সংযোগ নেই। পৌষমাসে শীত পিঠে, নবান্ন উৎসব, চড়ুইভাতি, বনভোজন কবে কোথায় উধাও হয়ে গেছে তদস্থলে পিকনিক নামের ডিজে গানের আসর স্থান পেয়েছে।
হ্যাপী বার্থড ডে, ম্যারিজ অ্যানিভর্সারি, ইঙ্গেজমেন্ট, এ সবের মানে-টানেও একসময় কেউ বুঝত না। সিনেমা, টিভি ইন্টারনেটের বদৌলতে খুব দ্রুত প্রবেশ করছে এইসব পাশ্চাত্য সংস্কৃতি। বিশ্বায়নের সময়ে আছি আমরা। খুব সহজেই এখন সাংস্কৃতিক বিনিময় হচ্ছে। ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা, স্যাটেলাইট চ্যানেল ইত্যাদি অনুষঙ্গ আমাদের মুহুর্তেই জানিয়ে দিচ্ছে পৃথিবীর অন্য প্রান্তের খোঁজ-খবর, তাদের চিন্তা-ধারণা, সেখানকার জীবনাচরন। কখনো কখনো আমরা নিয়ে নিচ্ছি তাদের সাংস্কৃতির অনেক অংশই।
তাই জিজ্ঞেস করি, এ আবার কাদের কালচার? বাঙ্গালী, হিন্দু, না মুসলমানদের? এর উত্তর আসে মুর্খ গবেট সেকেলে কোথাকার?
বাঙালির ভাষায় এসেছে বিস্তর ফারাক। শুদ্ধ বাংলা বলার থেকে ইংরেজি বলা মানুষের মর্যদা অনেক বেশি। কথায় কথায় বাংলার সঙ্গে ইংরেজি মিশিয়ে বলা একটা ফ্যাশন। ছেলে-মেয়েকে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করে গর্ববোধ করে তথাকথিত আধুনিকবাদীরা। আজ যাদের ভাষাকে নিয়ে আমরা গর্ববোধ করছি তারা আমাদের ভাষাকে কানাকড়ি ও দাম দেয় না। অথচ তাদের জানা দরকার ছিল এই ভাষাতেই কবিতা লিখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্ব কবি হয়েছেন। এমন কি তিনি নোবেলও পেয়েছেন এই ভাষাতেই।
পাশ্চাত্যের প্রভাবে বাঙালির ব্যবহারিক জীবনে ব্যপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। রাম রহীম, করিম,জলিল এই সব অনাধুনিক নামগুলি এখন অত্যাধুনিক পরিবারে বেমানান। তাই আধুনিক ধারায় চলছে নামকরণ প্রতিযােগিতা। যেমন- প্রিন্স, রকি, ভিকি,পাপ্পু,পনি। যার সন্তানের নাম সে রাখবে এতে কারাে কোন অভিযােগ থাকার কথা নয়। তবে অনুতাপের বিষয় হচ্ছে নামকরণ প্রতিযােগিতায় বেসামাল হয়ে এমন সব শব্দে ভদ্রলােকেরা নামকরণ করছেন, যা সেই শব্দের স্বভাষীদের কাছে হাস্যকর ব্যাপার। তবে হ্যা ১৯৪৭ সালের পূর্বে যখন এদেশ বৃটিশ শাসনাধীনে ছিল সেই সময় যদি বাঙ্গালী সন্তানের এমন নামকরণ করা হ’ত, তবে ভাবা যেত বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের দমননীতির চাপে অথবা তাদের খুশি করার জন্য এমন সব নামকরণ করা হচ্ছে। কিন্তু না, সে সময়েও বাঙ্গালী হিন্দু-মুসলমানরা নিজ নিজ ধর্মীয় ভাবধারায়, মুছতাফা, মুহাম্মাদ, আলী, ওছমান, আমিনা, আয়িষা, ফাতিমা এবং হিন্দুরা রাম, শ্যাম, গােবিন্দ, গােপাল, রাখাল, কানাই, নিতাই, সীতা, সাবিত্রী এইসব প্রাতঃস্মরণীয় নামে নামকরণ করেছে। এতে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের পক্ষ থেকে কোন প্রতিক্রিয়া আসেনি। বহু দশক পর নামগুলি হয়ে গেল পুরানা ধাচের। বাংলা ও বাঙ্গালীর গৌরব ক্ষুন্ন হল। তবে শুধু নাম নয়, ডাকেও আধুনিকীকরণে তারা ব্যস্ত। সানন্দে শিশুদের ডাক শেখানাে হচ্ছে, ড্যাডি, পাম্পা, মাম্মী, আঙ্কেল, আন্টি ইত্যাদি।
বিদেশীদের ডেডি, মাম্মি আর বাঙ্গালী পরিবারের বাবা, মা ডাকের ভাবার্থ আমি মনে করি এক নয়। কারণ যারা হাতি দেখেছে, হাতির কথা মনে হলেই তাদের চোখের সামনে ভেসে উঠবে শুঁড় ও লেজ বিশিষ্ট বৃহদাকার একটি চতুষ্পদ জন্তু। তদরূপ মাম্মী, আন্টি শুনলে বাঙ্গালীর চোখের সামনে ভেসে উঠে অশালীন, বেপর্দা, জিন্স প্যান্ট পরা উচ্ছৃঙ্খল একজন পাশ্চাত্য নারী। আর ড্যাডী, আঙ্কেল শব্দে মনে হবে বিদেশী কৃষ্টিতে গড়া অত্যাধুনিক অস্থিরতায় বেসামাল একটা পুরুষ চরিত্র। পক্ষান্তরে মা, খালা, ফুফু এবং পিসি, মাসি শব্দ উচ্চারণ করলেই বাঙ্গালীর চোখে ভেসে উঠে ঘােমটা পরা সুশীলা মমতাময়ী শ্রদ্ধাভাজনী একজন রমনী। যার স্মরণে সন্তানের মস্তক এমনিতে অবনত হয়। আর বাবা, চাচা,কাকা শব্দে সামনে ভেসে উঠে গুরুগম্ভীর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এক মহান শ্রদ্ধেয় পুরুষ। যার বৃহৎ ভাণ্ডারের কাছে চিরকাল থাকবে সন্তানদের চাওয়া-পাওয়ার অধিকার। পাশ্চাত্যের প্রভাবে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বাংলা নাম, নামের সঙ্গে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বাংলার মা, বাবা ডাক। তার সঙ্গে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বাংলার কৃষ্টি-সংস্কৃতি। এর পরেও আধুনিকীরা পরিবর্তন করেছে বাংলা ক্রিয়ার আপন ভঙ্গি। খাবারের জন্য এখন তাদের হেঁসেলে বা রান্নাঘরে যেতে হয় না, তারা যায় কিচেনে। তারা গিয়ে বসে ডাইনিং টেবিলে। ওরা নাস্তাও করে না, খাবারও খায় না; ওরা করে লাঞ্চ, ডিনার, ব্রেকফাষ্ট। বাঙালীর প্রিয় মাছ ভাত এখন সেকেলে। বিদেশিদের পিজ্জা, বার্গার, চাওমিন, এগরোল ইত্যাদি এখন খাবার প্লেট দখল করেছে। অভিবাদনে এসেছে পরিবর্তন, সকাল বিকাল সাঁঝে গুড মর্নিং, গুড ইভিনিং, গুড় নাইট ইত্যাদি। সুন্দর কাজের জন্য কাউকে ধন্যবাদ দিতে হয় না, থ্যাংক ইউ-এর মর্যাদা এখন অনেক বেশী।
যে কোনো সংস্কৃতির একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে পোশাক। বাঙালির পোশাকেও পাশ্চাত্য প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ধুতি, পাঞ্জাবি, শাড়ি, লুঙ্গি হল বাঙালির আদি পোশাক। বর্তমানে চোদ্দটা তালি লাগানো, সামনে পিছনে ছেঁড়া, দশটা পকেট লাগানো প্যান্ট শার্ট, হাটু অব্দি মিনি স্কার্ট হল বাঙালির নব্য পোশাক। মাঝে মাঝে নির্ণয় করা মুশকিল হয় এটা ফ্যাশন নাকি দারিদ্র্যতার কারন! ছেলে নাকি মেয়ে! তাছাড়া কিছু বেহায়া পোষাক দেহের দুই তৃতীয়াংশ উন্মোচন করে দেয়। যা পোশাক পরিধানের উদ্দেশ্যকে বিফল করে দেয়। পোশাকের সাথে পাল্টেছে চুলের স্টাইলও। এগুলো কাদের সংস্কৃতি?
বাঙালির লোকজ খেলাধুলাও তো কম নয়।কানামাছি, লাঠি খেলা, কাবাডি, কুতকুত, গোল্লাছুট, বিকেল হলে কানামাছি, লুকোচুনি, ডাংগুলি, হাডুডু, ইত্যাদি খেলা ছিল বাঙালির অঙ্গে জড়িত। এসব খেলা এখন পাবজি, ফ্রি ফায়ার সহ জীবন নষ্ট করা গেমের কাছে পরাজিত। যেখানে না আছে শরীর চর্চা না আছে শারীরিক বিকাশ।
প্রজন্মের ধারাবাহিকতায় অত্যাধুনিক পরিবারের আগামী দিনের নাগরিকরা মাতৃভাষার জন্য আরও যে কত কি করবে, তা আমাদের ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে আসে না। হয়তাে আরও কত নিত্য-নতুন রং-এর তুলিতে বুড়াে কৃষ্টি-সংস্কৃতিকে নব যৌবনা রূপবতী করে তুলবে। কেউ হবে আমেরিকা, লন্ডন, জাপান, জার্মান প্রবাসী, কেউ হয়তাে ঐ সব দেশ থেকে উচ্চ ডিগ্রী নিয়ে এসে এদেশের কর্তৃত্ব হাতে নিবে। সেদিন হয়তাে এ দেশ থেকে চির বিদায় নিবে মা, বাবা, চাচা, ফুফু, খালা,এবং দিদি, মাসি, পিসিরা সবায়। তান্ডব লীলায় মেতে উঠবে ড্যাডি, মামী, আঙ্কেল, আন্টির দল। হয়তাে সেদিন মা, বাবা শব্দের অর্থ খুঁজতে ডিকশনারী, বা গুগলে সার্চ করবে এ দেশের কৃতি সন্তান পাপ্পু, রকি, ভিকি, মেরী, কুড়ি, ডায়নারা। এই কি বাংলার গৌরব?এটাই কি বাঙালীর পরিচয়? একটা সভ্য জাতির সভ্যতার নিদর্শন বহন করে সেই জাতির কৃষ্টি-সংস্কৃতি। তবে কি এগুলিই সেই নিদর্শন? দুর্ভাগ্য, শত দুর্ভাগ্য আমাদের।
Post a Comment