“বাড়ির জন্য মন খারাপ করে না!? কোন যোগযোগ নেই?” রুহী জিভ কেটে বলে – “কেউ জানেই না আমরা কোথায় আছি ।

ধর্ম  রেজিনা কবীর


ধর্ম

রেজিনা কবীর

বসে বসে মন দিয়ে দু'জনে গলা মিলিয়ে নিখুঁতভাবে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করছিল অধুনা জনপ্রিয় হিন্দি মুভি 'শের শাহ'র ততোধিক জনপ্রিয় গান ‘কে রাতা লম্বেয়াঁ লম্বেয়াঁ রে, কাটে তেরে সঙ্গেয়া  সঙ্গেয়া রে…'  সামনে ক্রমাগত গর্জন করে চলা জোয়ারের ঢেউ যেন ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের ঘাটতিটুকু নিটোলভাবে পূরণ করে চলেছে। দু'জনের গানের গলাই বেশ সুন্দর। কিন্তু সব থেকে বেশি যে জিনিসটা চোখে পড়ার মতো তা হল দু'জনের কোঅর্ডিনেশন। গানটিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছে যেন দু'টিতে মিলে, যার সহজ বিনিময় লক্ষ করা যায় দু'জোড়া চোখের দ্যূতির বিনিময়ের মাধ্যমে। 

“মেরা এক ফোটো খিঁচ দিজিয়েগা প্লিজ?”— দ্বিধা কাটিয়ে একসময় বলেই ফেললাম। আসলে তো আলাপ জমানোর ছুতো। “হাঁ হাঁ, কিঁউ নহি”– বলে বেশ কয়েকটা ছবি তুলে মোবাইলটা ফেরত দিয়ে মেয়েটি বলল– “দেখিয়েতো দিদি, পসন্দ হুয়া কে নহি?” ছেলেটি ততক্ষণে দেওয়ালে পা দুলিয়ে যুত করে বসে একটা বিড়ি ধরিয়েছে। “আপলোগ কৌনসে হোটেল মে ঠ্যায়রে হো?” আরেকটু ভাব জমানোর চেষ্টায় আমার দ্বিতীয় প্রশ্নে মেয়েটি একগাল হেসে বলে– “হামলোগ ইয়েহিঁপে রহ্‌তেহে দিদি।“ কিন্তু পোষাকের ধরণ দেখে তো স্থানীয় মনে হয় না, তার ওপর স্থানীয় লোকের মুখে এরকম স্পষ্ট হিন্দির উচ্চারণ শুনে বোধহয় আমার ভ্রূযুগল আপনি কুঁচকে গিয়ে মুখে প্রশ্ন এঁকে দিয়েছিল। তাই মেয়েটি নিজের থেকেই বলল, “ওহ বড়ি লাম্বি কাহাঁনী হ্যায় দিদি।“ ভাবছিলাম কি ব্যাপার জিজ্ঞেস করব কি না, তার আগেই মেয়েটি তাদের কাহিনীর ব্যাকগ্রাউন্ড বলতে শুরু করেছে। বুঝলাম, আমার শোনার থেকে তার গল্প বলার আগ্রহ ঢের বেশি। ছেলেটি পাশ থেকে উঠে চলে যেতে আমি তার জায়গাটাতেই থেবড়ে বসে পড়লাম।

এ কাহিনীর সূচনা প্রায় বছর চারেক আগে, আর সূচনাস্থান সুদূর রাজস্থানের রণকপুর নামে একটি গ্রাম। সেই গ্রামের এক মধ্যবিত্ত মুসলিম জাঠ পরিবারের তিন ভায়ের একমাত্র বোন রুহী। পালি জেলার অন্তর্গত এই গ্রামটি জোধপুর ও উদয়পুরের মাঝামাঝি অবস্থিত। সম্পন্ন ব্যবসায়ী পরিবারের মেয়ে রুহীদের অন্ন বস্ত্রের সংস্থানের অভাব ছিল না কোন কালেই। তাই ক্লাস টেন পর্যন্ত যাত্রা বেশ মশৃণ বলা যায়। ক্লাস ইলেভেনে ভর্তিও হয়ে গেছিল দিব্যি, বিপদ বাঁধলো ক্লাস টুয়েলভে উঠে। সেদিন তাদের স্কুলের এক ছাত্রীর হঠাৎ মৃত্যু হওয়ায় প্রেয়ার হওয়ার পর শোক পালন করে স্কুল ছুটি হয়ে যায়। তাই সাত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে না দিয়ে তাকে তার বেস্ট ফ্রেন্ড সিমরন জোর করে রণকপুর জৈন মন্দিরে নিয়ে যায়।

রণকপুর জৈন মন্দির পঞ্চদশ শতকে তৈরী এক বিরাট মন্দির। শোনা যায় শেঠ ধর্না শাহ নামে জনৈক জৈন ব্যবসায়ী স্বপ্নাদেশ পেয়ে এই মন্দিরটির নির্মাণ শুরু করেন। মন্দিরটির নামকরণ তাঁর নামানুসারে করতে হবে এই শর্তে তৎকালীন  মেবারের রাজা রাণা কুম্ভ এই মন্দির নির্মাণের সমস্ত ব্যয়ভার বহন করেন। প্রথম জৈন তীর্থঙ্কর ঋষভনাথ বা আদিনাথকে উৎসর্গ করে এই মন্দির নির্মাণ করা হয়। ভারতবর্ষের বুকে উল্লেখযোগ্য পাঁচটি জৈন মন্দিরের মধ্যে অন্যতম হিসেবে সারা পৃথিবীতে প্রসিদ্ধ। ৩৭২০ বর্গমিটার জায়গা জুড়ে এই বিশাল মন্দিরটি অবস্থিত। মন্দিরে মোট ১৪৪৪ খানা মার্বেল স্তম্ভ আছে যার প্রতিটি  ভিন্ন ভিন্ন ধরণের কারু শিল্পের নিদর্শন বহন করে। মন্দিরটির একটি স্তম্ভ বিশেষভাবে দ্রষ্টব্য যেটিতে কেবলমাত্র  একটি পাথরকে খোদাই করে ১০৮টি সাপের নক্সা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এক কথায় যা অনন্য। মন্দিরের সব থেকে বড় আশ্চর্যজনক মনোমুগ্ধকর আকর্ষণ হল এই মন্দিরের মার্বেলের স্তম্ভগুলি সূর্যের আলোর স্থান পরিবর্তনের সাথে সাথে নিজেদের রং পাল্টে সোনালি থেকে ধীরে ধীরে ধূসর নীল রঙে পরিবর্তিত হয়। এই আশ্চর্য্য অপার সৌন্দর্য্য যে কোন মানুষকে মোহিত করে অন্যমনস্ক করে তোলে। সেদিন রুহীরও ঠিক তাই হয়েছিল। এমন বিহ্বল হয়ে পিলারের কারুকার্যের ওপর এই রঙের পরিবর্তন দেখে বিবশ হয়ে পড়েছিল যে পাশের সিঁড়ি মুছতে থাকা অতো বড় জলজ্যান্ত মানুষের শরীরটা তার নজরেই পড়েনি। একদৃষ্টে ওপরের দিকে তাকিয়ে পিছিয়ে আসতে আসতে কখন যে ধাপিটা শেষ হয়েছে খেয়াল করেনি। সোজা উল্টে সুমন্তের ঘাড়ে পড়েছিল। সুমন্ত না থাকলে সেদিন নির্ঘাৎ তার হাত পা কিছু একটা ভাঙত।

সুমন্ত এই মন্দিরের মন্দির কমিটির প্রধাণ তত্ত্বাবধায়ক সুখরঞ্জন জৈনের বড় ছেলে। সে রণকপুরে থাকে না। দিল্লিতে হোটেল ম্যানেজমেন্ট নিয়ে পড়াশোনা করছে। ছুটিতে বাড়ি এসেছে ক'দিনের জন্য। সেদিন মন্দির দর্শনে এসে একদিকের সিঁড়ির খানিকটা অংশ পরিষ্কার করছিল। তখনই অমন কান্ড। রুহীর তো সে কি লজ্জা। কতবার যে ক্ষমা চেয়েছিল তার হিসেব নেই। রুহীর বিনম্র ব্যবহার আর আন্তরিকতা খুব ভালো লেগেছিল সুমন্তর। প্রথম দেখাতেই মন কেড়ে নিয়েছিল রুহী। সেই ভালোলাগার রেশ রুহীর মনেও ছড়িয়ে যেতে সময় লাগেনি খুব বেশি। দূরে থাকলেও তাদের যোগাযোগ কখনও ব্যাহত হয়নি। বাড়ির মেয়েদের ফোন ব্যবহারের অনুমতি ছিল না। অগত্যা চিঠিই ছিল যোগযোগের একমাত্র উপায়। সিমরনই ছিল তাদের যোগাযোগের  একমাত্র মাধ্যম। তার বাড়ির ঠিকানাতেই সমস্ত চিঠিপত্রের আদান প্রদান চলত। দেখতে দেখতে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষাটাও পার হল। তারপরেই শুরু হল আসল সমস্যা। রুহীর বিয়ের জন্য তার বাড়ি থেকে জোর কদমে পাত্র দেখা শুরু হল। মোটামোটি ভালো রেজাল্ট করলেও তার আর পড়াশোনা করা হবে না, এটা স্পষ্টভাবে বাড়ি থেকে জানিয়ে দেওয়া হল। অনেক কান্নাকাটিতেও কোন ফল হল না। শেষে বিপদ বাঁধল তার বিয়ে ঠিক হয়ে যাওয়ায়। কোন উপায় না দেখে সেদিন শুধুমাত্র সার্টিফিকেটকটা নিয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে এসেছিল রুহী।

সেদিন তারা প্রাণে বেঁচে গেছিল কেবল সুমন্তর উপস্থিত বুদ্ধির জন্য। দুপুরের খাবার খাওয়ার পর ঘাটে বাসন মাজতে গিয়ে উধাও হয়ে গেছিল রুহী। সারা সন্ধ্যা রাত তোলপাড় করেও তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি আর। আসলে ভাই কাকাদের চোখের সামনে দিয়েই সেদিন রুহীকে ফালনা  স্টেশন থেকেই আজমেরের ট্রেনে নিয়ে আজমের চলে এসেছিল সুমন্ত। আগে থেকেই ফালনা স্টেশনের পেছনের গুদাম ঘরটায় লুকিয়ে অপেক্ষা করছিল সুমন্ত। সে যে রণকপুরে এসেছে একমাত্র সিমরন ছাড়া আর কেউ তা জানত না। সেদিন পুকুরপাড়ে সিমরন আর রুহী দু'জনে দু'টো বুরখা পরে বেরিয়ে পেছনের মাঠ পেরিয়ে বড় রাস্তায় গিয়ে উঠেছিল। রুহীর পায়ে পরার স্যান্ডেলটা পর্যন্ত সিমরন নিয়ে এসেছিল। স্টেশনের পেছনের খালি গুদাম ঘরে এসে প্রথমেই রুহীকে একটা ছোট্ট টিকি রেখে ন্যাড়া করে নিজের ভাইয়ের একটা পুরোনো জামা পরিয়ে দেয় সুমন্ত। তারপর ট্রেনের বাঙ্কারে পেছন ফিরিয়ে শুয়ে এমনভাবে চাদর ঢাকা দিয়ে রাখে যে পেছন থেকে দেখে একটি মাথা ন্যাড়া অল্প বয়সী ঘুমন্ত বাচ্চা ছেলে বলে ভুল হয়। আর নিজের সারা মাথার চুল খ্যাপ্টা খ্যাপ্টা করে কেটে নোংরা ধুলো কাদা মাখা জামার ওপর ততোধিক নোংরা একটা ছেঁড়া কম্বল চাপিয়ে প্ল্যাটফর্মের উল্টো দিকের ট্রেনের দরজায় পাগলের মত বসে গোপনে রুহীর দিকে নজর রেখেছিল সুমন্ত। পুকুরপাড় থেকে হারিয়ে যাওয়ার ফলে বাড়ির লোকের প্রথমিক ধারণ হয়েছিল হয়তো জলেই কোন দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। সেখানে অনেকখানি সময় ব্যয় হয়ে যওয়ায় আর অন্য কোথাও সেভাবে খানা তল্লাশি করা সম্ভব হয় নি। যতক্ষণে তারা স্টেশনে এসে পৌঁছোয় তখন ট্রেন প্রায় ছাড়ার সময় হয়ে গেছে। তাছাড়া সুমন্তের রণকপুরে আসার খবরটা কেউ না জানায় অতখানি সন্দেহ হয় নি কারো। তারপর তো আজমেরে একটা দিন কাটিয়ে কলকাতারই একটা টুরিস্টবাসে ম্যানেজ করে সোজা ধর্মতলায় এসে পৌঁছোয় তারা। সেখান থেকে দীঘা। তারপর দিন গড়িয়ে গেছে কালের নিয়মে। এখন তারা মন্দারমণির একটা হোটেলেই থাকে। সুমন্ত দিনের বেলা কিচেনের কাজ সামলায় সাথে রুহী জোগাড়ে সামাল দেয়। আর সন্ধ্যের পর থেকে বারে গান গায় দুজনে। রেজিস্ট্রি করে বিয়ে করলেও রিশেপশন বাকী এখনো। দুজনেই টাকা পয়সা জমাচ্ছে। আর কিছুটা টাকা জমলেই তাজপুর বীচের ধারে একটা ছোটো মাচা বানিয়ে নিজেদের ফাস্ট ফুডের দোকান খুলবে দু'জনে। জায়গা দেখা, প্রাথমিক প্রস্তুতি সবটাই সারা, আর ক'টা দিনের অপেক্ষা। যেদিন নিজেদের চালা তৈরী হবে সেদিন এখানকার সব বন্ধুদের নিয়ে নিজের চালাতেই রিশেপশন পার্টি করবে তারা। তাই কাজ কর্ম সারা হয়ে গেলে এই জায়গাটাতে বেশির ভাগ দিনই চলে আসে দু'জনে। খানিকটা সময় কাটিয়ে আবার ফিরে যায়।

রুহীকে জিজ্ঞেস করি - “বাড়ির জন্য মন খারাপ করে না!? কোন যোগযোগ নেই?” রুহী জিভ কেটে বলে – “কেউ জানেই না আমরা কোথায় আছি । জানতে পারলে জানসে মেরে দেবে পুরো দিদি।“ আর  সুমন্ত তার এতো খেয়াল রাখে যে মন খারাপ করার কোন সুযোগই পায় না সে।  ততক্ষণে সুমন্ত দুকাপ চা নিয়ে হাজির। দুকাপ চায়ের একটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে – “চায়টা পিয়ে লেন ম্যাডাম।“ উজ্জ্বল দুটো চোখের সাথে  আন্তরিক হাসিটা দেখে আর চাটা ফিরিয়ে দিতে ইচ্ছে করল না। দুচুমুক দিয়ে বলি – “তোমার কখনও মনে হয়নি সুমন্ত, কেবল একটা মেয়েকে ভালোবেসে বাড়িঘর সমস্ত কিছু ছেড়ে এসে নিজের পরিবারের প্রতি তুমি অন্যায় করেছো? নিজের ধর্ম থেকে বিচ্যূত হয়েছো?“ “নহি ম্যাডামজি। একবার ভি নহি। ধরমহি তো নিভিয়েছি আমি। কেবল ধরম হি নিভিয়েছি। যে আমাকে ভরসা করে নিজের সবকুছ ছোড়ছাড়কে আমার সাথে এসেছে। হরপল এখনো সুখে দুখে সাথ দিয়ে চলেছে, তাকে রক্ষা করার চেয়ে আর বড় ধরম কি আছে আমার!?“   

সামনে সমুদ্রের বুকে তখন হাজার হাজার হীরের কুচি ঝলমল করে জ্বলছে। সেই দ্যুতির দিকে নাগাড়ে তাকিয়ে থাকা যায় না, চোখে জল আসে। সুমন্তের জবাব শুনে সেই দ্যুতির ছটাকেও হার মানিয়ে রুহীর চোখের কোণ ঝিকমিক করে ওঠে। হাতে ফুরিয়ে যাওয়া চায়ের কাগজের কাপটি দুমড়ে নিয়ে ডাস্টবিনে ফেলার বাহানায় ওখান থেকে উঠে হোটেলের পথে পা বাড়াই। ভুল করেও পেছন  ফিরে চাইনি একবারও। ফিরে তাকালে পাছে রূপকথার রাজপুত্র আর রাজকন্যা উধাও হয়ে যায়।