দুটি কাব্যের কোনও কবিতারই শিরোনাম নেই। অথচ প্রতিটি কবিতাকেই প্রতিটি কবিতার অংশ হিসেবে মনে হবে।
দিশারী মুখোপাধ্যায়ের কবিতায় সত্যের বহুবিধতা
🌿
তৈমুর খান
☘️
আশির দশকের অন্যতম উল্লেখযোগ্য কবি দিশারী মুখোপাধ্যায় বাংলা কবিতায় বরাবরই নিজেকে আলাদা করে চিহ্নিত করতে পেরেছেন। সচরাচর বাংলা কবিতার প্রথাবদ্ধ পথে তিনি পা বাড়াননি। পোস্টমর্ডানিজম ধারাকে আত্মস্থ করেও নিজস্বতা বজায় রেখেছেন। তাই তাঁর কবিতার সাথে অন্যান্য post-modernist কবিদের কবিতা মিশে যায়নি। বিশেষ করে কবিতার স্ট্রাকচার নির্মাণে এবং শব্দ ব্যবহারে তিনি নিজেকে ভিন্ন পথে চালিত করেছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত তাঁর দুটি কাব্যগ্রন্থ 'অসমাপ্ত শব্দের তীব্র গর্ভাশয়'(নভেম্বর ২০২১) এবং 'গণিতবিহীন কিছু খেলা ও অনুভব'(জানুয়ারি ২০২২) পাঠ করলে বোঝা যায় বাংলা কবিতার দিগন্ত কতখানি বিস্তৃত এবং তাৎপর্যপূর্ণ।
দুটি কাব্যের কোনও কবিতারই শিরোনাম নেই। অথচ প্রতিটি কবিতাকেই প্রতিটি কবিতার অংশ হিসেবে মনে হবে। দুটি কাব্যের 'উৎসর্গ'ও ভিন্ন। পোস্টমডার্নিস্ট কবিদের মতোই পূর্ব বর্ধমান এবং কবির গ্রাম পর্বতপুর ও শহর দুর্গাপুরকে উৎসর্গ করা হয়েছে। উৎসর্গের মধ্যেও সার্বিকতা আনতে চেয়েছেন কবি। প্রচলিত কাব্য প্রকরণ, সংস্কৃতি, মিথ এবং বিশ্বাসের প্রতিও কবির বিদ্রোহ আছে। বহু ক্ষেত্রেই তা anti-poetry-এর কথা মনে করিয়ে দেবে। বক্তব্যকে ভেঙে দিয়ে পাঠকের ভাবনাকেও তিনি ভিন্ন পথের নির্দেশ দেন। ম্যানিলার ফিলিপিনো লেখক এবং ম্যান এশিয়ান সাহিত্য পুরস্কারের গ্র্যান্ড প্রাইজ বিজয়ী মিগুয়েল সিজুকো(১৯৭৬) পোস্টমর্ডানিজম ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন:
"Postmodernism was a reaction to modernism. Where modernism was about objectivity, postmodernism was about subjectivity. Where modernism sought a singular truth, postmodernism sought the multiplicity of truths."
অর্থাৎ উত্তর-আধুনিকতা ছিল আধুনিকতার প্রতিক্রিয়া। যেখানে আধুনিকতা ছিল বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে, পোস্টমডার্নিজম ছিল সাবজেক্টিভিটি নিয়ে। আধুনিকতাবাদ যেখানে একক সত্যের সন্ধান করেছিল, উত্তর আধুনিকতা সত্যের বহুবিধতা চেয়েছিল। এই সত্যের বহুবিধতাকেই কবিতায় রূপ দিতে চেয়েছেন দিশারী মুখোপাধ্যায়। তাই তাঁর কাছে তীব্র শব্দের গর্ভাশয় চিরদিন অসমাপ্ত থেকে যায়। অনুভবও খেলাও হয়ে যায় গণিতবিহীন। সমূহ সৃষ্টি ও ভাবনার মধ্যেই এক বৃহত্তর মুক্তির সোপান প্রদর্শন করেন যা তখন আশ্চর্য পর্যটন হয়ে ওঠে।
🍁
'অসমাপ্ত শব্দের তীব্র গর্ভাশয়' ৫৮টি কবিতার সংকলন। কোনও কবিতা-ই উচ্চকিত নয়, কিন্তু অনবদ্য আবেদন নিয়ে আমাদের কাছে উপস্থিত হয়েছে। কবি ভেতরের কষ্টকে বাইরে মুক্তি দিতে চেয়েছেন, কিন্তু যান্ত্রিক সভ্যতার কংক্রিটময় অরণ্যে তাঁর কষ্ট লেখার কোনও শব্দ নেই। প্রচলিত ভাষা ও শব্দে তাঁর অস্তিত্বের বিপন্নতা সঠিকভাবে লেখা সম্ভব নয়। আমরাও জানি অনুভূতি লেখার প্রকৃত ভাষা আবিষ্কার হয়নি। কবি নিজেই বলেছেন:
"শব্দের অভাবে আমরা আজ যন্ত্রণা প্রকাশ করতেও অপারগ"
কবির কষ্ট পার্থিব সম্পদ বৈভবের অভাবের কষ্ট নয়, এ এক আত্মিকসংকট। আশির দশক থেকেই এই সংকটের শিকার হয়েছেন কবিরা। নিজের ছায়াকেই আর বিশ্বাস করতে পারেননি। যে প্রশান্তি ও আনন্দের খোঁজ তাঁরা করেছেন তা পার্থিব আয়োজনের কোনও বস্তুসভ্যতায় পাওয়া যাবে না। সেখানে শুধু হৃদয়হীন কারবার। ইট-কাঠ লোহা-লক্কড়ের প্রতিধ্বনি আবর্তিত হয়। হৃদয় না থাকলে নিছক উত্তাপহীন প্রাণহীন ভয়ঙ্কর স্বার্থপর এক জগৎ। কবির পদক্ষেপও একটি শব্দে কখনো ছোট হয়ে গেছে। কখনো তা দুটি শব্দে। আবার কখনো তা লাফ দেওয়ার মতো বড় বাক্যে প্রতিফলিত হয়েছে। সভ্যতার যান্ত্রিক আয়োজন এবং মানবিক সম্পর্ককে কবি এভাবে লিখতে চেয়েছেন:
"রাস্তা। পাকা বাড়ির জঙ্গল পার হলে। অদূরে প্রান্তর।
প্রতিদিনের অস্ত যাওয়া সূর্যগুলি যেখানে জমা আছে।
তাকে ট্রেজারি বলতে পার। প্রসূতি ভবন তোমার চারিদিকে।
জানালা খোলা রাখ। দীক্ষা নাও। করমর্দন কর দরজার সঙ্গে।"
পাকাবাড়ি, ট্রেজারি, প্রসূতি ভবন, জানালা, করমর্দন প্রসঙ্গগুলি এই সভ্যতারই সুখ ভোগের নির্ণায়ক। কিন্তু কোথাও সুখের চিহ্ন নেই। সুখ তো মনের উপলব্ধি। সেই মনই মৃতপ্রায়। স্বাভাবিকভাবেই একাকিত্বের গভীর বোধে কবি আচ্ছন্ন। 'একা' শব্দটিই কবির কাছে তীব্র হয়ে উঠেছে। সমগ্র কাব্য জুড়ে এই 'একা'রই অভিক্ষেপ:
"একা। উপরে আকাশ। একা। সামনে দিগন্ত।
চারপাশের প্রতিবেশীরা একা। একটি বেলগাছ একা।"
এই 'একা' লিখতে গিয়ে বেলগাছের কাঁটা, গলি রাস্তা, কয়েকটি দাঁত, ভাঙা গ্যারেজ, তুমি, আমি, সিঁড়ি, জানালা, বাংলা অভিধান, মশা, ফুলদানির ফুল, মানপত্র, স্মারক, শেয়ালদা স্টেশন এবং 'একা' শব্দটিকেও কবি 'একা'ই দেখলেন। পোস্টমডার্ন ভাবনায় এই একাকিত্ব anti-poetry হিসেবেই উঠে এসেছে। নিকানোর পাররা তাঁর কবিতায় একাকিত্ব নিয়ে এমনই উচ্চারণ করেছিলেন তাঁর The Individual’s Soliloquy কবিতায়:
I am the Individual
At first I lived in a rock
(there I carved some figures).
Later I looked for a more appropriate place.
I am the Individual.
কবি একজন একক মানুষ। তিনি পাহাড়ের উপর থেকে কতগুলি ছবি তুলেছেন। সবই একাকিত্বের ছবি। তারপরে খাদ্য অন্বেষণ করেছেন। কাঠকুঠো জোগাড় করেছেন। নিজেকে বার বার প্রশ্ন করেছেন আর উত্তরও পেয়েছেন:
"a voice answered me:
I am the Individual."
'আমি একজন একক মানুষ' হয়ে উঠেছেন দিশারী মুখোপাধ্যায়ও। তিনিও মাথার উপর আকাশ দেখেছেন। সামনে দিগন্ত দেখেছেন। একাকিত্বের ব্যাপ্তিতে চরাচর ছেয়ে গেছে। জার্মানিতে জন্মগ্রহণকারী এবং সুইজারল্যান্ডীয় নাগরিক বিখ্যাত সাহিত্যিক হেরমান হেসে (১৮৭৭-১৯৬২)বলেছেন: "Solitude is independence.” –অর্থাৎ নিঃসঙ্গতাই স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতা কবিকে নিজের মুখোমুখি দাঁড়াতে সাহায্য করেছে। 'আমি' বোধের ধারক ব্যক্তি কবি সর্বত্র নিজেকে চালিত করেছেন। ব্রহ্মাণ্ডের ব্রহ্মা নয়, নিজেই বরফ হয়ে বরফকে কামড়াতে দেখেছেন। আবার গাছ হয়ে কারও কাছে 'উদ্ভিদ', কারও কাছে 'পাদপ' নাম গ্রহণ করেছেন। 'আমি' শব্দটি 'আমার' হয়ে গেছে। 'আমার' শব্দটিও 'আমাদের' হয়ে গেছে। 'আমাদের' শব্দেই নির্মিত হয়েছে সভ্যতা। ভক্ত মানুষ এবং সর্বনাশা মানুষও। শব্দের মধ্যেই জাত-গোত্র, আমিষ-নিরামিষ, সাদা-কালো, লম্বা-বেঁটেও আছে। টিকালো-থ্যাবড়াও আছে। আবার শব্দের মিছিল, জনসভা, চুক্তি ও চুক্তিভঙ্গ আছে। শব্দের নখ ও দাঁত আছে। শব্দ রক্ত খায়। শব্দ কাঁদে। গর্জন করে। চমক দেয়। শব্দ প্রেমও চুষে। এভাবেই শব্দের ব্যাখ্যার শিকড় সন্ধান চলতে থাকে। দৈনন্দিন জীবনের রো-দ্দু-র বাতাসে জীবনের ঘুম ও জাগরণ, মায়াবী সম্মোহন শব্দেই লেগে আছে। তার মধ্যেই এক দার্শনিক চেতনাও:
"যারা ছিল তারা চলে গেল। কোথা গেল।"
কোথা যায় মানুষ, কোথা থেকে আসে মানুষ— সে উত্তর কারও জানা নেই। শুধু প্রবাহ বয়ে চলেছে সময়কে অতিক্রম করে মহাসময়ে। সেইতো অনন্ত আয়ু— কান্না, কান্না থেকে গান, গান থেকে নদী। সময়ের যন্ত্রণাকে কবি কিছুতেই ভুলতে পারেন না। পুরনো অ্যালবামের সব ছবি ক্রুশবিদ্ধ যিশু হয়ে যায়। তাই ভাবনাও পাল্টে যায়:
"যা কুড়িয়েছি সব পাপ। সব নির্বীজ। শিখণ্ডী। খোলস।
এখন নর্দমায় নেমে শুদ্ধ হব। নর্দমা দেব ভব।"
সব কিছুর মধ্যেই একটা বৈপরীত্য এসে উপস্থিত হয়। তাই প্রচলিত মূল্যবোধের উপর ভরসাহীন হয়ে পড়েন। নর্দমায় অপবিত্র হওয়াকেও পবিত্র হবার সাধনায় সামিল করেন। আরেকটি কবিতায় লেখেন:
"প্রতিপদ একাদশী বোঝে না।
প্রতিটি পালস-বিটে সে কেবল নর্দমার কথা ভাবে।
নর্দমা হতে চায়। নর্দমার কীট হতে চায়।"
মূল্যবোধ পাল্টে যাওয়া শব্দ এবং সময়কে কবি ভেঙে দেন। বিশ্বাসও ভেঙে যায়। তখন লেখেন:
"শ্বাসরোধ হয়ে ওঠে বেচারা বাসার। খারাপের তৃষ্ণায় তার
বুক ফাটতে থাকে।"
নিকানোর পাররার মতোই কবিরও উপলব্ধি হয় নরকের মধ্যে থেকে তিনি বেরিয়ে এসেছেন। তাই খারাপের তৃষ্ণা এখনো লেগে আছে। আকাশ মহাকাশ পৃথিবী এক একটা চরিত্র হয়ে ওঠে। সব চরিত্রের বৈশিষ্ট্যেই কবির ব্যক্তিসত্তা যোগ-বিয়োগে, জ্বরে-ব্যধিতে, নীরবে-কলরবে আত্মপ্রকাশ করে। কখনো 'আম-ই' 'আমি' হয়। এভাবেই তাঁর বহুমুখী আত্মপ্রজ্ঞার বিন্যাস পাঠককে অভিভূত করে রাখে।
🍁
'গণিতবিহীন কিছু খেলা ও অনুভব' কাব্যের ৬৪টি কবিতায় কবি যুক্তি ও বাস্তবতার পরম্পরাকে ভেঙে এখানেও ব্যক্তিকে বহুমুখী বোধের ধারক ও বাহক করে তুলেছেন। স্বাভাবিকভাবেই খণ্ডিত ও বিক্ষিপ্ত কবির চেতনায় যে চিত্রলিপিগুলি বসতি চায় তা বাস্তবকে অতিক্রম করে অতিবাস্তব এর আলো-আঁধারিতে রহস্যময় হয়ে ওঠে। কবি জানিয়ে দেন সংসারের আবর্জনা সংগ্রহ শুধু, খাস মহলের কোনও আয়োজন নয়। কিন্তু কাব্যের সমস্ত কবিতাগুলিই এক বিশেষ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। প্রতিটি কবিতা-ই শিরোনামহীন ৩+৪+৩ পংক্তির স্তবকে বিন্যস্ত। চিত্রলিপির সঙ্গে এক কম্পনেরও ধারক বলে প্রথম কবিতাতেই কবি বলে দেন:
"যে বাতাসে ডানা সঞ্চালিত হয়েছিল, সে এখনও
কম্পনকে ধরে রেখেছে। কম্পন এমন এক ঘটনা যা
স্থিরত্বকেও অস্থির করে তোলে। চরাচর এসব খবর ছাপে।"
কবিতার গতিময়তায় ধরা পড়ে বোধের বিনির্মাণ তত্ত্ব। সাময়িকতাকে গ্রহণ করেই যাত্রা শুরু হয়। তাই প্রথম কবিতায় যে যন্ত্রণার উৎপত্তিস্থলে যাত্রা শুরু হয়েছিল, শেষ কবিতায় আবার সেই উৎপত্তিস্থলে আমরা পৌঁছে যাই। প্রবাহিত কম্পন তখন ব্যাপ্তিতে ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। কম্পনই কাব্যের কবিতার স্থিরত্বকে অস্থির করে তোলে। প্রসঙ্গক্রম পাল্টে দেয়। মূল্যবোধের উল্লংঘন করে। বাস্তবতা অতিক্রম করে যায়। গোলকধাঁধাময় এক রহস্যের সৃষ্টি করে। স্বয়ংক্রিয় অভিমুখ হয়ে ওঠে কবির শব্দ প্রক্ষেপণ। অনিশ্চয়তার ক্রিয়াগুলি থেকে খণ্ডতা ও দ্বান্দ্বিকতা ফুটে উঠে দৃশ্যপটগুলিতে। প্রচলিত কথনের ঢঙে সংলাপধর্মী এক পর্যায় সৃষ্টি করেন কবি। স্মৃতিকে পুনর্স্থাপনের মধ্যে দিয়ে বর্তমানে এনে উপস্থিত করেন। বিষয়কে বহু কৌণিক দৃষ্টিকোণে পর্যবেক্ষণ করায় তার রূপও বহুমুখী হয়ে ওঠে। তাই অসংখ্য দৃশ্যপট, ক্রিয়া সংযোগ, অলংকারহীন, আবেগহীন বিজ্ঞান ও গণিতের ভেতর ভাবনাকে চালিত করেন। পোস্টমডার্ন ভাবনায় যাকে বলা হয়:
"No single thing abides; and all things are fucked up."
(Philip K. Dick, The Transmigration of Timothy Archer)
অর্থাৎ কোনও একক জিনিস স্থির থাকে না; এবং সব জিনিসই ভেঙে যায় বা অসুখী এবং আবেগগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিখ্যাত আমেরিকান সাহিত্যিক এবং কল্পবিজ্ঞানের লেখক ফিলিপ কে ডিক(১৯২৮-১৯৮২) এর কথাটিই সত্য হয়ে উঠেছে দিশারী মুখোপাধ্যায়ের কবিতায়। কবিতাগুলিতে এ দৃষ্টান্ত আমরা দিতে পারি:
"গুগল্ হারিয়ে ফেলা নদীর চরে এক দম্পতির প্রেম
প্রাসঙ্গিকতার মধ্যে নেই। বিক্রির বর্গফল যা দাবি করে
তাকে স্বাগত জানায় ক্রয়ের বর্গফল। নিয়ম এমনই"
সাম্প্রতিককালের সাংস্কৃতিক কার্যকলাপে ব্যবহৃত পরিভাষাগুলি উঠে এসেছে কবিতায়। সনাতন রীতিকে পুরোপুরি অস্বীকৃতির সঙ্গে সঙ্গে প্রচলিত মূল্যবোধের প্রতিও চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া এই লেখার উদ্দেশ্য। চিরস্থায়ী বলে কিছুই নেই। কবিই কবিতার বাস্তব মুহূর্ত তৈরি করেছেন। শুরু ও সমাপ্তি এবং বিস্তার এর ব্যাপারে কবির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। কবির ভাবনা সর্বদা মুক্ত। বিজ্ঞান, গণিত, প্রযুক্তিবিদ্যা, পুরাণ এবং লোকজ বিশ্বাস একসঙ্গে ব্যবহার করেও কবিতার বিনির্মাণ সংঘটিত হয়। কবি সেই পরিস্থিতিই উত্থাপন করেন:
"ইতিহাসকে অতীতের হাতে ছেড়ে দাও। মানো
সে যা করে গেছে তাকে। একটি জলজ ফুলের
এই মর্জি তো দুর্বল। ডিলিট করো। এডিট করো
বিশ্বকর্মা,আমার দাস, বিনির্মাণ করো"
এরপরেও অ্যাপসের, আপডেটের, ভাইরাসের কথার সঙ্গে গাঙ্গেয় উপত্যকা, আমাজনের দাবানল, নেট দুনিয়া, যুদ্ধ এবং রোমান্টিকতা সবকিছুই চলে আসে। বহুমুখী উৎস ও বিন্যাসে পাঠকের প্রত্যাশাকে ভেঙে দেন। ব্যঙ্গাত্মক বা বিদ্রূপাত্মক বিচ্ছিন্নতায় পাঠকও ছিটকে পড়ে:
"অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে কোনো হাতের স্পর্শ, যাকে পেলে
স্বাদবিহীন অভিধানে তাই পাঁচফোড়নের সাঁতলানো ঘ্রাণ
ঘ্রাণের ভেতর এক সবুজ সুড়ঙ্গ, যাতে যাত্রা কেবল অবিরাম"
কাব্যের সব কবিতাতেই আগাগোড়া একটি অস্থির বিষয় যা themes of resttlessness অর্থাৎ মুক্ত ফর্ম ব্যবহার করেছেন। যার সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায় না। ইতিহাসের মিথ বা চিরাচরিত ধারণা এই কবিতায় পাল্টে যায় এবং পুরোপুরি প্রতিষ্ঠানবিরোধী হয়ে ওঠে। অস্তিবাদকে সমর্থন না করলেও মাঝে মাঝে কবিতায় তা দেখা যায়।ক্ষার লাল লিটমাসকে নীল করলেও অ্যাসিড সমাজ বিব্রতবোধ করে। তেমনি অরণ্যের সবুজ মানুষের শরীরে রক্ত তৈরির কৌশল দেখে। দুই মেরুর কথা বলতে গিয়ে রাধা ও কানাই এর সঙ্গে আমি ও আপনির কথাও চলে আসে। পানকৌড়ির ডুব মারাও ডুবের কলাকৈবল্যবাদ, আবার শিকার ধরাও সঠিক প্রেসক্রিপশন নয়। চারণভূমির ডাক, বনভূমির ইশারা, জলাভূমির আদর জেগে উঠবার বিপুল আয়োজন এবং খেলার মাঠের অপেক্ষায় পাণ্ডুলিপি নিয়ে বসে থাকেন কবি। শরীরও অশরীরে, সময়ও মহাসময়ের নিদর্শে দ্রবীভূত হয়ে গেছে। কবি লিখেছেন:
"একটা পাথর ক্রমশ একজন যুবতী হয়ে ওঠে, সেই যুবতী ক্রমে
মা হয়ে ওঠে পুরুষের, পাথরের। সত্যের। একদা এক নদীর ধারে
বিরাট এক সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। সেখানেই ছিলাম আমরা সকলে"
পোস্টমডার্ন ভাবনায় বস্তু এবং প্রাণের মধ্যে তফাত থাকে না। ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় উভয়কেই একযোগে সামিল করা হয়। প্রাগৈতিহাসিক চেতনার সন্ধানে আবার উৎসমূলে ফিরে যেতে হয়। এখানেও সেই ভাবনাটিই ক্রিয়াশীল। তাই শকুন্ত-শহরে গ্রাম রোপণ সহজ হয়ে ওঠে। চতুর্দিকে গাছেদের মধ্যে সচেতনতা দেখেছেন কবি। নাসার বিজ্ঞানীরাও সূর্যের ওম ধ্বনি শুনেছেন। ঈশ্বরও নারী-পুরুষে, সাদাকালোতে, ছোট-বড়োতে ধরা দিয়েছেন। কবিও নির্দিষ্ট কোনও যৌনতা নিয়ে সীমাবদ্ধ নন। সর্ব লিঙ্গেই প্রবেশ্যমান। গোলাপজলে অলৌকিকতার স্নান হয়। স্বপ্নরাও বাসে উঠে চলে যায়।
এই কাব্যের একটি কবিতা শেষ হলে আর একটি কবিতার শুরুতে আগের কবিতার রেসটি সূত্রাকারে তুলে আনেন। একই সুতোয় মালা গাঁথার মতো শেষ-শুরু মিলিত হতে থাকে। কবিতার শিরোনামেরও প্রয়োজন হয় না। প্রতিটা কবিতার শেষ সর্বদা open-ended অর্থাৎ মুক্ত। পোস্টমডার্ন কবিতা হলেও কবির নিজস্বতায় তা অনন্যতা পেয়েছে। জীবনের বহু বিভাজিকা হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। 'আমি' খণ্ডিত বিস্তৃত ব্যাপৃত সঞ্চারিত হয়ে অভিঘাত সৃষ্টি করেছে। স্পার্টাকাসের তৃষ্ণা এবং শৃংখল ইতিহাস থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের উপলব্ধির সামনে দাঁড়িয়েছে। সভ্যতা ও ইতিহাসের নিরিখে জীবনের মহাবোধির প্রেক্ষিতে কবির বিনির্মাণে আমরা সচকিত হয়ে উঠি এই কাব্যে।
দুটি কাব্যই বাংলা কাব্য ধারার ইতিহাসে এক নবতর সংযোজন। কবির অভিজ্ঞতা এবং বিনির্মাণের ক্ষেত্রে মেধাবী উত্তরণ লক্ষ করা যাবে।
🌿
১)অসমাপ্ত শব্দের তীব্র গর্ভাশয়: দিশারী মুখোপাধ্যায়, বার্ণিক প্রকাশন, কৈয়ড় বর্ধমান, প্রচ্ছদ: অর্পণ, মূল্য-১২০ টাকা।
🌿
২) গণিতবিহীন কিছু খেলা ও অনুভব: দিশারী মুখোপাধ্যায়, দিবারাত্রির কাব্য,২৯/৩ শ্রী গোপাল মল্লিক লেন, কলকাতা-৭০০০১২, প্রচ্ছদ: ফয়সল অরফিয়াস, মূল্য: দেড়শো টাকা।
🐴
Post a Comment