কিছু অমূল্য স্মৃতি আমাদের জীবনের সঙ্গে ভীষণভাবে পরিব্যাপ্ত হয়ে থাকে।
প্রথম বেড়ানোর স্মৃতি - প্রিয়াঙ্কা ঘোষ
কিছু অমূল্য স্মৃতি আমাদের জীবনের সঙ্গে ভীষণভাবে পরিব্যাপ্ত হয়ে থাকে। অবসরযাপন কালে সেই স্মৃতিগুলো মনের দরজায় একবার ঠক্ঠক্ করে যায়। আমার প্রথম বেড়ানোর স্মৃতিটা এমনই। মাঝে মাঝেই সেই স্মৃতি মনের মধ্যে জীবন্ত হয়ে ওঠে। তখন মনে হয় এখনই ছুঁতে পারবো।সেই রোমাঞ্চকর স্মৃতিকথাই কলমের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ পাবে লেখার ডায়েরিতে।
বেশ অনেক বছর আগে, মানে আমার কৈশোর বেলায় বাবা, মায়ের সঙ্গে আমি দীঘা বেড়াতে গিয়েছিলাম।আমার জীবনের প্রথম বেড়ানোর স্থান দীঘা যা পশ্চিমবঙ্গের একটি জনপ্রিয় সমুদ্রসৈকত। এই স্থানটি বাঙালির কাছে কখনো পুরোনো হবেনা। আজও সেই একইভাবে তার জনপ্রিয়তা বজায় রেখেছে।
দীঘা সফরের আয়োজন বাবার অফিস থেকেই হয়েছিল। তাই বাবার কলিগরাও তাদের পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল। দীঘাতেই জীবনে প্রথম সমুদ্রের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম,সে এক আলাদা অনুভূতি।তবে ঐ সময়ে মনের সব অনুভূতিকে বোঝার মতোন বোধ ছিল না,তবুও একটা ভালোলাগার পরশ ছিল।
আমাদের পুরো সফরই বাসে হয়েছিল। আমার খুব মনে পড়ে ভোরবেলা সূর্যোদয়ের আগে আমরা দীঘা পৌঁছেছিলাম। তখন সূর্যদেব উদিত হওয়ার তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছিল। দীঘার সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত অত্যন্ত নয়নাভিরাম একটা দৃশ্য।
সূর্যের কিরণে আমার সমুদ্রের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। তখন দেখলাম একটার পর একটা সমুদ্রের বুকে তৈরি হওয়া ক্লান্তিহীন বিশাল বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ছে সমুদ্রতটের বালিয়াড়িতে।আর যেখানে সমুদ্রের জল আর আকাশ একে অপরের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল ঠিক সেখান থেকেই প্রথম ভোরের আলো উঁকি দিচ্ছিল। দীঘায় দুটি সমুদ্র সৈকত রয়েছে।একটা ওল্ড দীঘার সৈকত আর একটা নিউ দীঘার সৈকত।
আমরা নিউ দীঘাতে উঠেছিলাম।সমুদ্রসৈকতের কাছেই আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল।আমরা হোটেলের সংলগ্ন দোকান থেকে প্রাতঃরাশ করেছিলাম, তারপর হোটেলে এসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়েই আবার সমুদ্রের সঙ্গে আরও ভালো করে আলাপ জমানোর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছিলাম।যেহেতু আমরা নিউ দীঘাতে ছিলাম,তাই প্রথমে নিউ দীঘার সমুদ্রসৈকতেই গিয়েছিলাম। তাছাড়াও নিউ দীঘার সমুদ্র সৈকত স্নানের জন্য উপযুক্ত।সমুদ্রসৈকতের রাশি রাশি তরঙ্গ আর সেখানকার মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমার কৈশোরের হৃদয়কে হরণ করেছিল। সেখানে একদিকে গভীর সমুদ্র আর অপরদিকে ঝাউগাছের অগভীর জঙ্গল। সারি সারি ঝাউগাছ নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতায় বিভোর। মাঝে মাঝে তারা সমুদ্রতটের নোনা বাতাসের আমেজ নিচ্ছে।
আমি সমুদ্রের ভাঙ্গা ভাঙ্গা ঢেউয়ে পা ভিজিয়ে ছিলাম। স্নান করিনি।সমুদ্রতটে দেখেছিলাম পায়ে পায়ে হেঁটে চলা কাঁকড়া, শামুক, ঝিনুক, শঙ্খ ইত্যাদি। সেখানে পর্যটকদের মধ্যে অনেকেই সমুদ্রতটে বসে বালির দূর্গ নির্মাণ করছিল। আমি শুধুই দেখেছিলাম প্রয়াস করিনি।এরপর সবার স্নানপর্ব শেষ হলে আমরা আবার হোটেলে ফিরে আসি। তারপর দুপুরের খাওয়া শেষ করে সূর্যাস্তের পর সন্ধ্যার প্রাক মুহূর্তে আমরা ওল্ড দীঘার উদ্দেশ্যে রওনা হই। সন্ধ্যার ওল্ড দীঘা যেন মোহিনী রূপ ধারণ করেছিল।সেখানকার সমুদ্রের বাঁধানো পাড়ে বসে সমুদ্রকে দুচোখ দিয়ে শুষে নিয়েছিলাম আর সমুদ্রের গর্জনে যেন হৃদয়ে এক অদ্ভুত সুর ধ্বনিত হয়েছিল।
এ এক স্বর্গীয় অনুভূতি। সাদা ফেনায় ভরা ঢেউয়ের রাশি বোল্ডার গুলোকে একবার ছুঁয়ে আবার চলে যাচ্ছিলো।আমরা এই অপরূপ দৃশ্যকে মাছভাজা আর চা সহযোগে প্রাণভরে উপভোগ করছিলাম। তারপর এই অপরূপ দৃশ্যকে অন্তরের গভীরে বন্দী করে হোটেলে ফিরেছিলাম।পরেরদিন গিয়েছিলাম শংকরপুর,তালসারি, উদয়পুরের সৈকতে, সেখানেও ছিল বালিয়াড়ি আর চারপাশটা ঝাউগাছে মোড়া। তারপর চন্দনেশ্বরের মন্দিরে পুজো দিয়ে আবার হোটেলে ফিরেছিলাম।
দীঘায় কতদিন ছিলাম সেই বিষয়টি আঁধারেই তলিয়ে গিয়েছে।তবে দীঘার বিখ্যাত অমরাবতী লেকে যে গিয়েছিলাম তা স্মরণে আছে।নিউ দীঘা আর ওল্ড দীঘার সৈকতের আশেপাশে বেশ অনেক দোকানের সমাগম। যেমন নানারকম ঘর সাজানোর জিনিসের দোকান, ঝিনুকের তৈরি গয়না, মাছ ভাজার দোকান, কাজু বাদামের দোকান প্রভৃতি হরেকরকমের জিনিসের দোকান সেখানে বিরাজমান।আমি কিছু কিনেছিলাম কিনা তা এখন আর আমার মনে নেই।
তবে আমার আন্দাজ কাজু বাদাম কেনা হয়েছিল। দীঘায় সবাই একসঙ্গে অনেক আনন্দ করেছিলাম। সবাই যেন একই পরিবারের সদস্য হয়ে উঠেছিলাম।এরপর ছিল আমাদের ফেরার পালা। ফেরার দিন সবারই মুখে অন্ধকারের ছায়া নেমে এসেছিল কারণ ঐ কয়েকদিন সবাই মিলেমিশে একাত্ম হয়ে গিয়েছিলাম।ফিরে গিয়ে তো আবার সবাইকে গতানুগতিক যান্ত্রিক জীবনে প্রবেশ করতে হবে। তবুও তো ফিরতেই হবে নিজের নিজের আলয়ে।
সেই কৈশোরবেলার দীঘা ভ্রমণের কিছু স্মৃতি ম্লান হয়ে গিয়েছে,তা এই পড়ন্ত যৌবনে এসে লিখতে গিয়ে অনুধাবন করতে পারলাম। কিন্তু যে টুকরো টুকরো ঘটনা মনের কুঠুরিতে আছে সেই ঘটনাগুলোকে একত্রিত করেই দীঘার যাপন চিত্রটি অঙ্কন করার চেষ্টা করলাম। তবুও প্রথম বেড়ানোর স্মৃতি খানিকটা বিস্মৃতির অতলে গেলেও প্রায় বেশিরভাগ স্মৃতি আজও জীবন্ত।
এই অপরূপা দীঘা বারংবার হাতছানি দেয়।তাইতো মানুষজন সুযোগ পেলেই ছুটে ছুটে যায় দীঘায়। আমিও আরও একবার দু তিন বছর আগে গিয়েছিলাম।তখন গিয়ে দেখেছিলাম অনেক পরিবর্তন।অনেক সুন্দর সুন্দর হোটেল, আরও অনেক দোকান।এখন তাজপুর, মন্দারমনিতেও অনেক পর্যটকের সমারোহ। তবে দীঘার সৌন্দর্য খানিকটা অন্যরকম।আর লক্ষ লক্ষ পর্যটকের ভিড়ে দীঘা যেন আরও মোহময়ী হয়ে উঠেছে।।
© প্রিয়াঙ্কা ঘোষ
Post a Comment