এই সময়ের কয়েকটি পত্রপত্রিকার আলোচনা

 

Story and Article





বাংলা ও বাঙালির সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হল পত্রিকা

  🌲

তৈমুর খান 

🍁

পৃথিবীতে বাঙালির মতো সাহিত্য-সংস্কৃতি সচেতন জাতির কোনো পরিচয় আমার জানা নেই। বাঙালিরা সাহিত্য সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যতটা আত্মত্যাগ করতে পারেন, পৃথিবীর ইতিহাসে তা অন্য কেউ করেছেন বলেও আমার মনে হয় না। সারাবছর ধরে পত্রপত্রিকা বের করা এবং নিষ্ঠার সঙ্গে সেগুলি সুসম্পাদনা করা যেন একটা ইতিহাস হয়ে চলেছে। বঙ্গদর্শন থেকে সবুজপত্র, কল্লোল থেকে কবিতা, কৃত্তিবাস থেকে পরিচয় যে পত্রিকারই নাম করি না কেন, সব পত্রিকার পেছনেই বাঙালির উপস্থিতি এক গৌরবের ইতিহাস হয়ে বিরাজ করছে। আমাদের চারিপাশে ছোট ছোট পত্র-পত্রিকাগুলি সাহিত্যচর্চার ধারাকে অব্যাহত রেখেছে। যার কারণে বাঙালির মনন ও চিন্তনে পরিশীলিত ও বিকশিত রূপ ফুটে উঠছে। আমরা আনন্দ-দুঃখ, ভালোবাসা-প্রতিবাদ, স্বপ্ন ও সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটও তৈরি করে ফেলছি এর মাধ্যমে। আজকের আয়োজনে এরকমই কতকগুলি পত্রপত্রিকা।



 সংবেদন


 একটি কবিতা অনুষ্ঠানকে উপলক্ষ করে একটি স্মারক সাহিত্য সংকলন 'সংবেদন'(২০২১)। কিন্তু তাহলে কী হবে, রীতিমতো বাছাই করা সাহিত্য সম্ভার যাকে লাইব্রেরিতে সসম্মানে রাখা যায়। সংকলনের প্রথমেই সভাপতি,সম্পাদক এবং পত্রিকা সম্পাদকের ভাবনার তিনটি কলামই খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই তিনজন হলেন: পূর্ণচন্দ্র মুখোপাধ্যায় তিনি লিখেছেন 'কবিতার কথা'। সেখানে উল্লেখ করেছেন 'সাহিত্য-শিল্পে এক যৌথ দ্বান্দ্বিক ক্রিয়ায় রসিক এবং রসের মিলন ঘটে। পাঠক এবং স্রষ্টা এক চমৎকার বিন্দুতে মিলিত হয়।' কাজী নিজাম উদ্দিন লিখেছেন 'কবিতায় সারাদিন ও সংবেদন'। সেখানে উল্লেখ করেছেন কাফকার কথা। তাঁর চিঠি লেখার প্রসঙ্গ 'যাকে তুমি ভালোবাসো তুমি তার কথা মনে রেখো। সে যত দূরেই যাক একদিন ঠিক ফিরে আসবে।' অর্থাৎ এই 'সংবেদন' ছিল ছাত্রজীবনেরই স্বপ্ন। পুনরায় তার প্রকাশ ঘটেছে। আশরাফুল মণ্ডল লিখেছেন 'পত্রিকা সম্পাদকের কলমে'। সেখানে উল্লেখ করেছেন 'সংবেদন সাহিত্যের আর একটি উৎসভূমি।' সমগ্র সংকলনটি একটি রুচিপূর্ণ মেধাবী সংকলন হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন ধরনের লেখায় পরিপূর্ণ। প্রায় শতাধিক কবি-লেখক ঠাঁই পেয়েছেন। বাংলার উল্লেখযোগ্য কবিরা সকলেই উপস্থিত। দুর্গাপুরের অকালপ্রয়াত কবি অনিকেত পাত্রকে নিয়ে লিখেছেন রামানুজ মুখোপাধ্যায়। কবি আবদুস সামাদকে নিয়ে লিখেছেন সমরেশ মণ্ডল। বই বিক্রির বাজার নিয়ে লিখেছেন নয়ন রায়। বেশকিছু কবিতাও মনে দাগ কাটে। গোলাম রসুল লিখেছেন 'জীবনে পৌঁছানোর জন্য পালক'। এই পালকেরই দেখা পেলাম সংকলনটি হাতে নিয়ে। যোগাযোগ: সমিরুন্নেসা বেগম, ঈমান, নতুনপল্লী, জে ব্লক, বেনাচিতি, দুর্গাপুর-১৩, পশ্চিম বর্ধমান, দূরভাষ-৯২৩২৪৮৭৬৩৯ পশ্চিমবঙ্গ, মূল্য-২০০ টাকা। 




উত্তর ভূমিকা 


'উত্তর ভূমিকা'(২০২১)২৮ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা উৎসব সংখ্যা হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে।  খুব সুন্দর একটি পত্রিকা। এই সংখ্যায় ফিচার, প্রবন্ধ, মুক্তগদ্য, রম্যগল্প, অণুগল্প, গল্প এবং অসংখ্য কবিতা আছে। উৎসব নিয়ে লিখতে গিয়ে শিউলি চক্রবর্তী লিখেছেন "দু'বছরের প্যানডেমিক জীবন এখন সবচেয়ে বড় উৎসব... বেঁচে থাকার নাম উৎসব... করোনামুক্ত সুস্থ জীবনের নাম উৎসব… প্রতিদিন স্কুলে কলেজে যাওয়া উৎসব…" আর লেখাটির শেষ করেছেন "সন্দেহের চোখে কাউকে না দেখে হাসিমুখে পাশে বসতে চাওয়ার নাম উৎসব…" কিন্তু এই উৎসব মানুষ এখনও ফিরে পায়নি। ভুবন ভরা আলোয় শুধু অন্ধকারের ছায়া। সাম্প্রতিক রাজনীতি ও মিথ্যাচার নিয়ে লিখেছেন নীলাদ্রি বিশ্বাস।  বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নিপীড়ন নিয়ে লিখেছেন নিখিলেশ রায়। ডুয়ার্সের বঙ্গজ অভিবাসী সমাজের বিকাশ ও বিলয় নিয়ে ইতিহাস পর্যালোচনা করেছেন আনন্দগোপাল ঘোষ। এখানে মিশ্র যে জাতির  জনগোষ্ঠী গড়ে উঠেছে তার একটি তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ আছে। সে দিক দিয়ে লেখাটি খুবই মূল্যবান। বাংলা ভাষা কতটা সংকটময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে এবং এই ভাষার ভবিষ্যৎ কোন পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে তা নিয়ে একটি অন্তর্তদন্ত করেছেন অভিজিৎ দাশ। বিশ্বাস ও নানা প্রথা নিয়ে গড়ে ওঠা পৌরাণিক মিথগুলি বিশ্লেষণ করেছেন আব্দুল মতিন আমেদ। বেশ আকর্ষণীয় মুক্তগদ্য লিখেছেন রঞ্জন রায়, ভগীরথ দাস, রূপক সান্যাল। রম্যগল্প লিখেছেন সৌভিক রায়। বড় গল্প লিখেছেন অর্ঘ্য ঘোষ, অমলকৃষ্ণ রায়, সৌম্য পাল, রামধন রায়চৌধুরী, গৌতমী ভট্টাচার্য, অলকানন্দা সমাজদার, মণিদীপা নন্দী বিশ্বাস, কিশোরনাথ চক্রবর্তী, চিরদীপা বিশ্বাস, মঞ্জুশ্রী ভাদুড়ী, বিক্রম শীল, নন্দিতা সাহা, কণিকা দাস, সুদীপ চৌধুরী ও সজল দে। কবিতায় অমর চক্রবর্তী, সন্তোষ সিংহ, প্রহ্লাদ ভৌমিক, শান্তনু পাত্র, সত্যম ভট্টাচার্য, অজিত অধিকারী, মাসুদ হাসান, সুজয় নিয়োগী, অরবিন্দু সরকার, অমিতাভ সরকার, মানসী কবিরাজ, হীরালাল সরকার, ইতি পাল প্রমুখ আরও অনেকেই। বাংলা কবিতার পাশাপাশি বেশ কিছু ইংরেজি কবিতা এই সংখ্যায় স্থান পেয়েছে। সব মিলিয়ে সংখ্যাটি বেশ সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে। যোগাযোগ: সম্পাদক গৌরাঙ্গ সিনহা, নিউ কদমতলা, কোচবিহার, চলভাষ:৯৭০৮৭৩৩০২৯, মূল্য-১৫০ টাকা।


মন্দাক্রান্তা 


'মন্দাক্রান্তা'(১৪২৮) দ্বাদশ বর্ষ উৎসব সংখ্যা হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে।  করোনাকালে নীরব অভিমান নিয়ে আর একটি উৎসব পেরিয়ে যাওয়ার সময়কে অনুধাবন করেই এই সংখ্যার 'কথামুখ' লেখা হয়েছে। সম্পাদক আশাবাদী যে আমরা সাহিত্যমুখী হয়ে উঠব আবার। সংখ্যাটি শুরু হয়েছে কবি সুবর্ণ রায়কে নিয়ে লেখা মোহিনীমোহন গঙ্গোপাধ্যায় এর একটি কবিতা দিয়ে। সেখানে কবি লিখেছেন: "জন্মের ভিতরে সংহার/ ছায়া পড়ে যৌবনের কাচে/ জলে ডুবে জলের সংসার/ দৃষ্টিতে আগুন মাখা আছে।" সুবর্ণ রায় যে যৌবনের কবি, তাঁর শব্দ টংকার যে সংহার ও শিহরন নিয়ে জেগে উঠেছে তা আর একবার মনে করিয়ে দিয়েছেন। বৃষ্টি করুণার হলেও, বৃষ্টিতে আগুনও থাকে। ভালোবাসা স্নেহের হলেও, শাসনও থাকে—প্রাজ্ঞ কবি  তা বুঝিয়ে দিয়েছেন। এই সংখ্যায় সুবর্ণ-র গুচ্ছকবিতাও ভালো লাগে। এক বিক্ষিপ্ত মননের ছায়া পড়েছে কবিতাগুলিতে। তবে আত্মদর্শনের প্রক্রিয়ায় তা নিবেদিত শব্দগুচ্ছ। এই সংখ্যার অন্যান্য কবিরা হলেন: মৃণাল বসুচৌধুরী, শ্যামলকান্তি দাশ, গৌরশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বেণু সরকার, তাপস ওঝা, শীলা সরকার, শঙ্খশুভ্র পাত্র, অভিরূপ বোস, দীপশিখা পোদ্দার, প্রবীর দাস, মধুমঙ্গল বিশ্বাস, ফটিক চৌধুরী, রবিন বণিক এবং আরও অনেকেই। পুস্তক সমালোচনা করেছেন অর্ণব সেন, পার্থ সেনগুপ্ত, উদয়শংকর মহান্তি, বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়, ফটিক চৌধুরী প্রমুখ। মনন কথা লিখেছেন পার্থ দাস, গৌতম হাজরা, অর্ণব সেন। উল্লেখ্য শঙ্খ ঘোষ থেকে বিষ্ণু দে এবং সুবর্ণ রায়কে নিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ আছে এই লেখাগুলিতে। উত্তরণ পর্যায়ের গদ্যগুলিও আকর্ষণ করে। আত্মগত উপলব্ধির বিষয় এগুলি। লিখেছেন রোজিনা পারভিন, নন্দিতা আচার্য, বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়। জীবনের উপকথা নিয়ে বিস্তারিত সালোকসংশ্লেষ সংগ্রহ করেছেন সুনীল মাজি। তাঁর গল্পকথন হৃদয়কে উথাল-পাথাল করে। ঝরঝরে সুন্দর পত্রিকা মন ভরিয়ে দেয়। যোগাযোগ: সম্পাদক সুবর্ণ রায়,২৮- টেগর টেম্পল রোড, ডাকঘর: শ্যামনগর, জেলা উত্তর ২৪ পরগনা-৭৪৩১২৭, মূল্য-১৫০ টাকা। 







কবিতার সরাণ


'কবিতার সরাণ'(২০২১) দ্বিতীয় সংখ্যা বিশেষ প্রবন্ধ সংখ্যা 'কবিতার ভবিষ্যৎ ভবিষ্যতের কবিতা' শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে। কবিতা নিয়ে এমন গভীরভাবে আলোচনা সংখ্যাটিকে উল্লেখযোগ্য করে তুলেছে। লেখকদের তালিকায় রয়েছেন এই সময়ের উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রমী কবিরা। কবি প্রভাত চৌধুরী লিখেছেন "অতীতের কবিতা থেকে বর্তমানের কবিতা অন্যরকম হবে। বর্তমানের কবিতা থেকে ভবিষ্যতের কবিতা ভিন্ন রকম হবে।" অর্থাৎ প্রতিটি কবিতাই তার বর্তমান সময়কে অনুধাবন করে। গতানুগতিকতাকে পরিহার করে এগিয়ে চলে। তাই কবিতা সর্বদা একটি পরিবর্তনশীল শিল্প। তিনি দেখিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ থেকে সুভাষ মুখোপাধ্যায় আলাদা। সুভাষ মুখোপাধ্যায় থেকে বর্তমানের পোস্টমডার্ন যুগ আলাদা। সুতরাং এই বদলকে মেনে নেওয়াই দস্তুর। মুরারি সিংহ লিখেছেন: কবিতার পরিবর্তন মুখীনতা ও বিশ্বের বিভিন্ন কবিতা রচনার প্রেক্ষাপটের ইতিহাস। সামাজিক, রাজনৈতিক ধর্মীয় ও পৌরাণিক প্রভাবের সঙ্গে মনন জগতের সম্পর্কটিও তিনি নির্ণয় করতে চেয়েছেন। নব্বই দশকে এসে তিনি দেখলেন পোস্টমডার্ন এর প্রভাব। এই সময়ে সমাজের নানা শ্রেণি ও তাদের সংস্কার কবির চোখে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক পরিবর্তন এবং টেকনোলজির হাতছানিও মানবসমাজকে গ্রাস করল। মানুষ হল আত্মকেন্দ্রিক, রাজনৈতিক সচেতন, কখনও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু সামাজিক শোষণ ভেতরে ভেতরে বজায় থাকল। সমাজে অনাচার অত্যাচার ধর্ষণ রাহাজানিও বেড়ে গেল। পরিবারও ভেঙে গেল ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর নিউক্লিয় পরিবারে পরিণত হল। কবিতা এই বিচ্ছিন্ন পর্যায় থেকেই তার রসদ সংগ্রহ করল। নানা ভাষা নানা মত নানা আঙ্গিকে বিনির্মাণ চলতে লাগল। লাগামছাড়া কবিতায় তত্ত্ব লজিক প্রয়োগ হতে লাগল। সুতরাং ভবিষ্যতের কবি বলতে "কবিরা হবে বনের পাখি, তারা নিজের শর্তে কবিতা লিখবে, কোনো ব্যাকরণ, উপদেশ, পরামর্শ বা শাসনের কাছেই সে দাসখৎ লিখে দেবে না।" অলোক বিশ্বাস লিখেছেন: "আজকের প্রজন্ম যেভাবে জটিল প্রযুক্তিতে পারদর্শী হয়ে উঠছে সেভাবেই জটিল কবিতার সঙ্গেও অভ্যস্ত হয়ে উঠবে মানুষ।" তিনি আশা করেন একুশ শতক পেরিয়ে কবিতায় আসবে আবার নতুন এক বাঁকবদল, যে কবিতায় থাকবে ভাষিক সূক্ষ্মতা ও বহুস্তরীয় অনুভব। সুজিত রেজ লিখেছেন: "কবিতার ভবিষ্যৎ শুধু নয়, যে কোনো কিছুরই ভবিষ্যৎ জানার কৌতূহল দ্বিধা যুক্ত…" এই কারণে বর্তমানে আগামীর আশা-ভরসা রাখাও সঙ্গত হবে না। তবে কবিতা বেঁচে থাকবে। তিনিও জানেন অল টাইম ইজ এটার্নালি প্রেজেন্ট।  হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় বর্তমানের বাংলা কবিতা কোন পথে তার দিক নির্দেশ করেছেন। তিনি বিশেষ করে কবিদের সততার উপর জোর দিয়েছেন। কবিরা কবিতা লিখে আনন্দ পান না। কবিতা প্রকাশ করার ক্ষেত্রেও তিনি নিজেই উদ্যোগী হন। স্বাভাবিকভাবেই একটা মানদণ্ডের অন্তরায় থেকে যায়। কবিতা প্রকাশের ক্ষেত্রে নানা ছদ্ম কৌশলও পাঠককে বিভ্রান্ত করছে এটাও কবি দেখেছেন। সুতরাং ভালো-মন্দের দূরত্ব বা বিচারবোধ হারাতে বসেছে কবিতা পাঠকেরা। এই সংখ্যায় আরও দুজন তরুণ কবি গৌতম সাহা ও রুদ্র কিংশুক প্রবন্ধ লিখেছেন। রুদ্র কিংশুক বিশ্বের নানা ভাষার সাহিত্য মন্থন করে দেখাতে চেয়েছেন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাস্তব জীবনেও নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়ে মানুষ। সেইসব সমস্যাকে আত্মস্থ করেই কবিরা তাঁর উপলব্ধিকে শিল্পমণ্ডিত করে তোলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাঠকও বদলে যায়। এভাবেই কবিতা সঞ্চারিত হয়ে চলে আর বদল ঘটতে থাকে। গৌতম সাহা ব্যক্তি থেকে নৈর্ব্যক্তিক যাত্রাকেই কবিতার দীর্ঘজীবন ভাবেন। বর্তমান সময়ের বহু বিশিষ্ট কবির কবিতা এই সংখ্যাটির পূর্ণতা এনে দিয়েছে। সংগ্রহ করার মতন একটা সংখ্যা। যোগাযোগ: সম্পাদক সন্তোষ দাস, গ্রাম পরোটা, ডাক:কীর্ণাহার, জেলা বীরভূম-৭৩১৩০২, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত। চলভাষ:৯৬৩৫৪২২৭২৭, মূল্য-৮০ টাকা। 


৫ 




গোর্গাবুরু


'গোর্গাবুরু'(২০২১)  উৎসব সংখ্যাটি অসাধারণ প্রচ্ছদ নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। ভয়ঙ্কর দুঃসময়ের মধ্যেও পত্রিকাটি মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াবার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। এই সংখ্যায় বিশিষ্ট কবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন: সুবোধ সরকার, শ্রীজাত, অংশুমান কর, গৌতম ঘোষদস্তিদার, তন্ময় দত্তগুপ্ত, যশোধরা রায়চৌধুরী, সম্রাজ্ঞী বন্দ্যোপাধ্যায়, বীথি চট্টোপাধ্যায়, দীপ মুখোপাধ্যায়, অনিমেষ গুপ্ত, হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, মধুসূদন দরিপা, গৌতম রায়, সুমন বন্দ্যোপাধ্যায়, সৌমাল্য গড়াই, মীনাক্ষী লায়েক, সতীন্দ্র অধিকারী, বেবী পোদ্দার, সোমা দাস, শুভনীতা মিত্র, সৌরভ লায়েক, তনুশ্রী বাগ, নির্মাল্য ঘোষ, অদিতি চক্রবর্তী  প্রমুখ এবং গুচ্ছ কবিতা লিখেছেন স্বরাজ মিত্র। প্রতিটি কবিতাই সুনির্বাচিত। করোনাকালীন সময়ের কবিতা নিয়ে আলোচনা করেছেন বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়। গৃহবন্দি জীবনের যন্ত্রণা থেকে বাংলা ভাষার কবিরা যে শব্দ উচ্চারণ করেছেন, যে উপলব্ধির যাপন করেছেন সেইসব কবিতাগুলিই তুলে ধরেছেন। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, পবিত্র মুখোপাধ্যায়, শ্যামলকান্তি দাশ, শংকর চক্রবর্তী, রণজিৎ দাশ,  সুজিত সরকার, অজিত বাইরী এবং আরও বহু কবির কবিতার উদ্ধৃতি তিনি তুলে ধরেছেন। প্রথম কাব্য প্রকাশের অনুভূতি নিয়ে গদ্য লিখেছেন দেবাশিস সরখেল। সবমিলিয়ে সংখ্যাটি অসাধারণ। যোগাযোগ: সম্পাদক অনিমেষ চক্রবর্তী, প্রযত্নে সুমিতকুমার বেরা, স্টেট ব্যাংক পাড়া, লোয়ার ঝরিয়াডি, আদ্রা, পুরুলিয়া-৭২৩১২১,মূল্য-৫০ টাকা।



দুষ্টু 


'দুষ্টু'(১৪২৮) শারদ সংখ্যাটি বরাবরই ভালোলাগা একটা পত্রিকা। ছোটদের নিয়ে গদ্যে-পদ্যে-ছড়ায় আমাদের ভাবনার অবকাশ কম। এই পত্রিকাটি কিন্তু এই কাজটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করে চলেছে। গৃহবন্দি ছেলেমেয়েরা বিদ্যালয় এবং খেলার মাঠেও যেতে পারে না। তাদের চিত্তবিনোদনের নানা ঘাটতি দেখা দেয়। এইটি বিবেচনা করেই এবারেও এই সংখ্যাটি সাজানো হয়েছে। বড়দের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েদেরও কবিতা, গল্প, অভিজ্ঞতার কথা এবং তাদের আঁকা চিত্রও যত্নের সঙ্গে ছাপানো হয়েছে। বেশ আকর্ষণীয় একটি পত্রিকা। পড়তে পড়তে আমাদের ছোটবেলাকে ফিরে পাই। হাসি-খুশির একটা জগৎ আমাদের চোখের সামনে উদ্ভাসিত হয়। এই পত্রিকার সম্পাদক সুভাষচন্দ্র বসু নিজেও একজন শিশু সাহিত্যিক। রূপকথার নতুন নতুন জগৎ নিয়ে তিনি উপস্থিত হন প্রতিটি সংখ্যায়। এই সংখ্যাতেও তিনি দারুণভাবে আকৃষ্ট করেছেন 'সং' নামের গল্প লিখে। ছোটদের উপযোগী এরকম গল্প সমস্ত বয়সের পাঠকদেরই মনের খোরাক যোগাবে। অন্যান্য কয়েকজন গল্পকার হলেন: সুদর্শন নন্দী, অঞ্জনা গোড়িয়া, সমাজ বসু, মঞ্জিলা চক্রবর্তী, বৈশাখী সিংহরায় (পাণ্ডা), শিবপ্রসাদ পুরকায়স্থ, আব্দুর রহমান, অভিজিৎ রায়, সৌরভকুমার ভূঞ্যা, চন্দন চক্রবর্তী,পম্পা পণ্ডিত ঘোষ, সুনীল মাজি, ভবতোষ নায়েক, কমল ঘোষ, প্রিয়াঙ্কা চক্রবর্তী মজুমদার, মনোজমোহন চক্রবর্তী, মণীষা পলমল প্রমুখ। ছোটদের জন্য গদ্য লিখেছেন: দেবব্রত ভট্টাচার্য, শ্যামলচন্দ্র দে, তাপস মুখোপাধ্যায়, অভিষেক রায়চৌধুরী প্রমুখ। প্রায় দুই শতাধিক ছড়া আছে এই সংখ্যাটিতে। যোগাযোগ: সম্পাদক সুভাষচন্দ্র বসু, মালঞ্চ-রাখাজঙ্গল, খড়্গপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর-৭২১৩০১, চলভাষ : ৯৪৩৪৩৬৩৮৪২, দাম-৮০ টাকা।



পাসওয়ার্ড 


সাহিত্য ও সংস্কৃতির 'পাসওয়ার্ড'(২০২২) বইমেলা সংখ্যা ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। খুব পরিচ্ছন্ন এবং মনোরম একটি পত্রিকা।  প্রবন্ধ,কবিতা,গল্প, অনুবাদ কবিতা, অনুবাদ গল্প, আঞ্চলিক কবিতা, লোকসাহিত্য, ছড়া, বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের স্মরণ, পুরনো কবিতা, পত্রিকা এবং বই রিভিউ প্রভৃতি বহুমুখী আয়োজনে পত্রিকাটি সমৃদ্ধ হয়েছে। যে কোনো শ্রেণির পাঠকের কাছেই পত্রিকাটি সমাদৃত হবে। এই সংখ্যার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো তরুণ কথা সাহিত্যিক 'তালাশনামা' উপন্যাসের লেখক ইসমাইল দরবেশের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার। ইতিমধ্যেই 'তালাশনামা' পাঠক মহলে যথেষ্ট সাড়া ফেলেছে এবং বিখ্যাত অনুবাদক রামস্বামী এটি ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করছেন। খুব শিগগির সেটি প্রকাশিত হবে 'হারপার কলিন্স' থেকে। উপন্যাসটির জন্মবৃত্তান্ত এই সাক্ষাৎকারটিতেই উঠে এসেছে। লেখক ইসমাইল দরবেশকে পাঠক অনেকটাই চিনতে ও জানতে পারবেন। পাঠকের আরও প্রাপ্তি আছে এই সংখ্যায় তা হলো শক্তিশালী চারণ কবি দাউদ আলি, মোহাঃ আফতাবুদ্দিন এবং হাজী মৌলানা মোহাম্মদ ইসমাঈল শুজাপুরী সম্পর্কে আলোকপাত। প্রথমজন চারণ কবি হলেও অসাধারণ দক্ষতায় কাব্য রচনার পরিচয় দিয়েছেন। তাৎক্ষণিকভাবে অন্ত্যমিলযুক্ত পয়ার ও দীর্ঘপায়ারে তাঁর জ্ঞান ভাণ্ডার উজাড় করে দিতেন।  ভাগ্যবিড়ম্বিত ছিলেন মোহাঃ আফতাবুদ্দিন। কবিতার সঙ্গে ছোটগল্প, নাটক এবং প্রবন্ধও লিখেছেন। তৃতীয়জন ছিলেন বিখ্যাত মাওলানা এবং বহুভাষাবিদ। তাঁর ১৫টি গ্রন্থ রয়েছে। কুরআন সুন্নাহের আলোকে পরকাল-ইহকাল সম্পর্কেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ আলোকপাত করেছেন। ব্যক্তিত্বের আলোকে, মেধার উচ্চতায় এবং জ্ঞানের বিকিরণে এই তিনজন ব্যক্তিই অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। এই প্রথম এঁদের সম্পর্কে জানতে পারলাম। উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ লিখেছেন মোমেন মিশু: 'বই পড়ার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব', এবং পাভেল আক্তার: 'বিপন্ন শৈশব: উত্তরণের সন্ধানে। দুটি প্রবন্ধই সমাজ সচেতনতার সঙ্গে আত্মসচেতনতার গুরুত্ব অনুধাবন করায়। শিক্ষা ও শিশু দুটি বিষয়কেই বর্তমানে বেশি নজর দেওয়া দরকার। ছোটগল্প লিখেছেন: গোলাম মোস্তাফা মুনু ও সৌরভ হোসেন। দুটি গল্পেই উত্তরণ ঘটেছে বাস্তব জীবনের সংকটাপন্ন পারম্পর্যের। হাসান উজ জমান আনসারী এবং ড.মোহাম্মদ আকবর আলী বিশ্বাসএর অনূদিত গল্পদুটি বেশ উপাদেয়। মোঃ মোনিরুল ইসলাম নাদিম অমৃতা প্রীতমের দুটি কবিতা অনুবাদ করেছেন। বেশ সহজ ও সাবলীল অনুবাদ। বেশ কিছু ভালো লাগা কবিতা আছে। সাতটি অণুগল্পই চমৎকার। পত্রিকাটি সংগ্রহযোগ্য। যোগাযোগ: সম্পাদক মুহাম্মদ জিকরাউল হক, প্রযত্নে মুহাম্মদ ওয়াহেদুজ জামান,২ডি, এসবি টাওয়ার, রবীন্দ্র এভিনিউ, মালদা-৭৩২১০১, চলভাষ:৯৪৭৫০৯৫১১৮/৯৭৩৩৭৪৮২১১

মূল্য-৫০ টাকা। 

তৈমুর খান