আসলে চল্লিশ পেরোলেই যে চালসে!
চালসে - জয়নারায়ণ সরকার
সকাল থেকে মেঘ আর রোদ্দুরের লুকোচুরি চলছিল। একটু বেলা বাড়তে বৃষ্টির দমক যেন আছড়ে পড়ে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে তন্ময় হয়ে বৃষ্টি দেখছিল সৌম্য। কত বড় বড় ফোঁটা পড়ছে। চারিদিকটা সাদা হয়ে গেছে। আবার মুহূর্তের মধ্যে বৃষ্টির দমক কমতে অবাক হয় সে। দূরে তাকালে সৌম্যের ঝাপসা লাগে চোখে। ঝাপসা লাগায় একটু উৎকন্ঠাও হয়। আসলে চল্লিশ পেরোলেই যে চালসে! সে চল্লিশ পেরিয়েছে সেই দশ বছর আগেই। এসব ভাবনার মাঝে চোখ দুটো একটু কচলে নিয়ে তাকায়। আবারও সে ঝাপসা দেখে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর কেটে যায়। সারি সারি উঁচু উঁচু বিল্ডিংকে ডিঙিয়ে চোখটা যতদূর যাচ্ছে, ততদূর অবধি তাকিয়ে থাকে সে। না, এবার আর ঝাপসা লাগছে না। দূরে বহু দূরে একটা পাখি উড়ে গেল, সেটাও চোখে পড়ছে তার। যাক্ তাহলে চালসে হয়নি। খানিকটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে সৌম্য।
সে এতটাই মগ্ন হয়ে পড়েছিল যে জয়া অনেকক্ষণ ধরে রান্নাঘর থেকে ডেকেই চলেছে। কিছুই কানে ঢোকেনি। হঠাৎ কানের পাশে জয়ার গলা পেয়ে সম্বিত ফেরে তার। জয়া বলেই চলেছে, কখন থেকে ডাকছি। শুনতেই পাচ্ছো না। তোমার কি হয়েছে?
সৌম্য খানিকটা চমকে উঠে বলে, না, না। কিছু হয়নি তো!
জয়া এবার কড়া গলায় বলে, বাজার যাওয়ার জন্য ডাকতে ডাকতে আমার গলা ব্যথা হয়ে গেল। অথচ তুমি বলছ কিছুই হয়নি?
সৌম্য আমতা আমতা করে বলে, না, না, আসলে ওই ঝাপসা...
জয়া তিরিক্ষি গলায় বলে, কিসের ঝাপসা?
সৌম্য তাড়াতাড়ি বলে, ও কিছু নয়। তুমি বুঝবে না। দাও, বাজারের ব্যাগ দাও। দেরি হয়ে যাচ্ছে।
কথাগুলো বলে সৌম্য আর দাঁড়ায় না। এক দৌড়ে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়ে।
জয়া হেসে বলে, পাগল কোথাকার!
ছোটবেলা থেকে যথেষ্ট ব্রিলিয়ান্ট ছিল। সে জন্য ছোট পিসি তাকে জুয়েল বলেও ডাকত। পারিপার্শ্বিক আবহাওয়ায় খাপ খাইয়ে নিতে পারত অনায়াসে। ছোট থেকে দেখেছে কোনও কিছুর অভাব নেই। ঘোড়ার মাথার মতো কালো রঙের টেলিফোনও ছিল বাড়িতে। সেই সময় একটা অঞ্চলে দু-একটা বাড়িতে দেখা মিলত। সেই কারণে পাড়া, বে-পাড়া থেকে কত লোক এসে ফোন করতেন তার ইয়ত্তা নেই। আবার কারও কারও কোনও খবরও আসত ওই টেলিফোনে। সৌম্যের ওপর ভার পড়ত খবরটা পৌঁছে দিতে। যেন খানিকটা উপযাচক হয়েই সাইকেল চালিয়ে দিয়ে আসত খবরটা। তার জন্য কখনও মনের মধ্যে কোনও প্রশ্ন উঁকি দেয়নি। বরং খুশি হত।
সময় যেন দ্রুত বদলে যেতে থাকে। কৈশোর পেরিয়ে যুবক। ঘন কালো চুলে ক্রমশ সাদার প্রলেপ পড়ছে। মনটা ছটফট করে ওঠে মাঝে মাঝে।
ঘুনপোকা যেমন কাঠকে ভেতর থেকে ছিবড়ে করে দেয়, তেমনি তাদের সংসারটাও ভেতর থেকে ছিবড়ে হয়ে গেছে। এখন বুঝতে পারে সৌম্য। ততদিনে অনেক কিছুই হারাতে হয়েছে। বাবা-মা তো অনেক আগেই চলে গেছেন। এবার একে একে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবরাও হারিয়ে যেতে লাগল। যাদের সঙ্গে ওঠা-বসা-খেলা-ঘুমানো-সাঁতার কাটা-সাইকেল চালানো তারা যেন সবাই শত যোজন দূরের অধিবাসী হয়ে গেল। সেই দিনের কথা ভাবতে বসলে এখনও সৌম্যের শিরা-উপশিরাগুলো আজও জেগে ওঠে। তারপর আস্তে আস্তে মিলিয়েও যায়। আসলে কারণ খুঁজতে ভীষণ ভয় হয় তার। যদি কেউ কখনও কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়। নিজেকে বাঁচানোর জন্য সওয়ালের পর সওয়াল করতে হবে। হয়তো তার মধ্যে মিশে থাকবে মিথ্যে ভাষণও। তাই তার আর চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়ে ওঠেনি। আবার কেউ এসে সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করেনি, ওই বিশাল রাজত্বের ভরাডুবির জন্য কি তুই দায়ী? তাই তাকে আর প্রমাণও করতে হয়নি। সে খেয়াল করেছে সবাই কেমন পাশ কাটিয়ে চলে যেতেই ব্যস্ত ছিল। তাহলে এক আত্মায় বাঁধা পড়াটা কি অভিনয় ছিল! সে তো কোনও দিনই ভাল অভিনেতা হতে পারেনি। তাই হয়তো সম্পর্কের ভেতরের সূক্ষ্ম মিথ্যে বোনা জালগুলো তার চোখে কখনও ধরা পড়েনি।
রাতের পর রাত নিজের বিছানাও ভাগ করে নিয়েছিল বন্ধুর সাথে। ঘুমের ঘোরে কখনও কখনও বন্ধুর একটা হাত ধরে শুয়ে থাকা। ঘুম ভাঙলেও ধরা থাকত হাতটা। মনের মধ্যে একটা দামামা বেজে উঠত। সেই দামামার আওয়াজও মৃদু থেকে ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে কোথাও মিলিয়ে গেছে!
***
বাজার থেকে ফিরে ব্যাগটা রেখে এক ছুটে এসে দাঁড়ায় জানলার ধারে। আবার বড় বড় হাইরাইজ বিল্ডিংয়ের মাথা পেরিয়ে দূরে আরও দূরে তাকায় সৌম্য। হঠাৎ কাঁধে হাতের স্পর্শ পেয়ে চমকে তাকায়। দ্যাখে, জয়া এসে পাশে দাঁড়িয়েছে। জয়া এবার উৎকণ্ঠা ভরা গলায় বলে, কী হয়েছে তোমার? ব্যাগটা রেখে হুড়মুড়িয়ে চলে এলে জানলার ধারে।
সৌম্য একইভাবে তাকিয়ে থাকে দূরের দিকে। মুখ না ঘুরিয়ে অদ্ভুত একটা স্বরে বলে, দেখ তো জয়া, দূরে তাকালে কি ঝাপসা লাগছে?
জয়া হেসে বলে, কই না তো, তোমার মনে হয় গ্যাস হয়েছে। তাড়াতাড়ি জলখাবার খেয়ে নাও। বেলা হয়েছে। না হলে অনেক কিছুই ঝাপসা দেখবে।
সৌম্য একদৃষ্টিতে তাকিয়েই থাকে। জয়ার কথাগুলো যেন তার কানের ভেতর ঢোকেনি। সে বার বার চোখ কচলাতে থাকে। চালসে হয়ে যাওয়া সম্পর্কগুলোকে ঝেড়ে ফেলে, দু-চোখ মেলে তাকায় দূর থেকে দূরের নতুনের সন্ধানে। ভাঙাগড়ার খেলায় আবার নিজেকে সামিল করে সৌম্য।
Post a Comment