কবি তৈমুর খানের কবিকথা / কবির জন্মদিনের শুভেচ্ছা । পর্ব - ২ - নাসির ওয়াদেন

 

Story and Article

নাসির ওয়াদেন

কবিদের লড়াই আবহমান, কালের কদর্যের বিরুদ্ধে, অন্ধকারের বিরুদ্ধে, অনাচার-অত্যাচারের বিরুদ্ধে, এ লড়াই চিরকালীন, চিরন্তনী ।

     স্বপ্নে আজ সারারাত যুদ্ধ করে ফিরে এলাম ।
     বাস্তবেও রক্ত মাখা গায়ে,
     দশনে দশনে কলঙ্ক কেটে চাঁদ ওঠে ছিলো,
     জোৎস্নার নীলমেয়ে প্রসব করেছে যে
      যুদ্ধ জয়ের শেষে মালা দেবে বলে ।

কবি মানবিকতার নৌকোয় চড়ে পাড়ি দিতে চান মহাজাগতিক পরিক্রমণে। আধুনিক মানব সভ্যতায় মানুষের আদিমতা আজও চির প্রবহমান, বহন করে চলেছে অনৈতিক চিন্তার রসদ ঝোলায় পুরে। আদিমতার মধ্যে যে দুর্নিবার কামনা মনোজগতে কিড়ার মতন কিলবিল করত, যার পরিণতিতে সেক্সচুয়্যাল ভার্চুয়ালি স্বগীয় সুখের নন্দনকাননে অনল প্রজ্বলন করেছিল, আদম ঈভের শান্তি সুখচ্যুতি ঘটেছিল, সেই ধর্মীয় চেতনালোকের দ্বারা পরিচালিত হয়ে মানুষ ধর্মকে অনড়,অনপট ও একমাত্র মুক্তির নৌকো কল্পনা করে ভেসে চলেছে। ধর্ম মানুষকে যে নৈতিক শিক্ষা দিয়েছে এবং তার বিপরীতে আড়ালে কুৎসিত নরবিদ্বেষী ভাবনা, কল্পনার জিগির, জিজীবিষাকে উসকানি দেয়, তার প্রতি কবির সতর্ক বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। কবি সোল্লাসে চিৎকার করে বলছেন,
          আমাকে হিন্দু করোনা, দেবতা,
          আমাকে মুসলমান করোনা, দেবতা
          আমাকে মানুষ কোরো ---
ধর্মটা যে কিসের আকারে দৃশ্যমান, পরকালটা কেমন রঙিন রোমাঞ্চকর, কবি তা কোনদিনই বুঝতে পারেননি । তাই তার সমাজে দুর্নাম আছে, তিনি নাকি ধর্মহীন, ঈশ্বরহীন জীবন যাপন করেন। যে জীবনে অভাব আর দারিদ্রের ধোঁয়ায় আকাশ পরিপূর্ণ,  যেখানে অলৌকিক জ্যোতি প্রবেশ করতে পারে না, কৈশোরের দুর্মতি আর ভীতি, যৌবনের দুর্মর প্রতিজ্ঞা জীবনযুদ্ধের অলৌকিক বাহনযন্ত্রে  উপবিষ্ট হয়ে জীবনকে প্রাজ্ঞ, পুষ্ঠিত পূর্ণ, শুভ্র ও পবিত্র করে তুলতে প্রয়াসী, সেই শারীরবৃত্তীয় কাঠামোতে যৌন ইচ্ছা, ভোগলালসা, পার্থিব ধনৈচ্ছা তাঁকে আকুল করে না, বরং স্বর্গীয় তৃপ্তি ঠোঁটে তুলে দেয় কবিতার শরীর, শব্দের গন্ধ, বাক্যের মূর্ছনা, ভাষার নৈঃশব্দ্যের বিমলতা।
       মৃত্যু, জীবনের পরিসমাপ্তি এক অধ্যায়ের । এই মরে যাওয়ার যন্ত্রণা যেমন মারাত্মক, তেমনি এই মৃত্যু আর এই জীবন, সংক্ষিপ্ত কালদেশের মধ্যে কবিতাই পারে মনোরম সেতু গড়ে, পারাপারে সাহায্য করতে। কবিরা সেই সেতুর পৃষ্ঠদেশে অবস্থান করেন, কোনোদিকেই চলে যেতে পারে না, কণ্ঠহীন ভাষা, বক্তৃতাহীন মঞ্চে, জনতাহীন মিছিল আঁকড়ে বসে থাকা অনির্বচনীয় শব্দের ঝুলি হাতে, বাক্যের সরস মিথষ্ক্রিয়ায় বোনা স্বপ্নের নতুন ইস্তাহার। অধিকার কবির জীবনে, দিনযাপনের দৈনন্দিন সময় সারণীতে খোঁজ চলে।
        কোন শব্দে আমার অধিকার জানাব তোমাকে?
        এই ভণ্ড জীবনযাপনে  সব শব্দ মিথ্যে
           ,  , , , , , , , , , , , , ,   , , , , , , , , , , ,
        জীবন মৃত্যুর প্রতিধ্বনি এখন নিস্তরঙ্গ
        ঘৃণা আর  থু থু দেওয়া সম্পর্ক
        কোন শব্দ দিয়ে বলো রাস্তা তৈরি হবে?

অধিকারহীন মানবজীবনের যথার্থ মানুষ হিসেবে তুলে ধরতে আবহমান পৃথিবীর মানবসন্তান সংশয়ে সংশয়ে দ্বিধান্বিত। এভাবেই ধর্মেও আছি , জিরাফেও আছি ধ্বনি তুলে কেউ কেউ টিকে থাকতে চান, আর অধিকার আদায়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কবি তৈমুর খান সেই আত্মজিজ্ঞাসার জালে আটকে গেছেন অসাবধানতার ফাঁদে।
           নিজেকেই শুধু অন্ধকারে রাখি
           আর ভাষাহীন চিঠি 
           তোমাকেই শুধু লিখি ।
           এত অগোছালো পথ
           কোন পথ দিয়ে যাই?
           ঠিকানা হারিয়ে গেলে
            শুধু বিভ্রম বাড়ে
           নিজের কাছে নিজে ।
            অচেনা হয়ে যাই।
  একরকম সত্যের পাশাপাশি অস্তিত্ব বিনাশের ছবিও আত্মদগ্ধ যন্ত্রণার লিপিতে ফুটে ওঠে তাঁর । এই অস্তিত্ব রক্ষা করা পাগলের প্রলাপ সম হয়ে ওঠে জীবন দর্শনে, যখন কবির কণ্ঠে, কলমে, ভাষায় ফুটে ওঠে ---
        আমার অস্তিত্ব জুড়ে ধূসর মরুর সাপ
        ক্ষত আঁকে ছোবলে ছোবলে
        কোথাও আকাশ নেই, বৃষ্টি নেই
        পোড়া গন্ধ, বিষ আর মৃত্যুর মিছিল
          হেঁটে যায় ,,,,,,,
কবি আর কবিতার মাঝে আমরা যদি হাঁটি, তাহলে দেখতে পাই, আমরা হাঁটলে কবিও হাঁটেন, আমরা থামলে কবিতাও থেমে যায়। কবিতা প্রকৃতির বস্তু। ভাবের উলঙ্গধারা মনুষ্য জন্মের উপর নেমে আসে। প্রতিকূলতা যখন সামনে তার উপনীত হয়, তখন কবিতা গর্জে ওঠে, প্রতিবাদ করে, বেদনার বিদ্রোহে, যন্ত্রণার গর্জনে সমৃদ্ধ হয়ে উৎক্ষিপ্ত হয়ে ঝরে পড়ে। কবির এই বিবেকবান আত্মপ্রত্যয় আমাদের উল্লাসিত করে, উদ্দীপ্ত করে, ইচ্ছাশক্তিতে আগুন জ্বালিয়ে দেয়, উত্তরণ ঘটে পাঠকের, আমজনতার।
কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় তাঁর ৫২-তম জন্মদিনে লিখেছেন --
       ' জন্মদিনে কিছু ফুল পাওয়া গিয়েছিলো
        অসম্ভব খুশি হাসি গানের ভিতরে
        একটি বিড়াল একা বাহান্নটি থাবা গুনে গুনে
        উঠে গেল সিঁড়ির উপরে ,,,,
        শুধু আমি দেখেছি তার দ্বিধান্বিত ভঙ্গি
         তার বিষন্নতা।'


(ক্রমশঃ)