কবি তৈমুর খানের কবিকথা / কবির জন্মদিনের শুভেচ্ছা । পর্ব - ১
ভাষার তরঙ্গ স্রোতে, নিস্তরঙ্গ দ্বীপে, অনবদ্য চিতার আগুনে স্নিগ্ধ নিঃশব্দ্যের কবি তৈমুর
নাসির ওয়াদেন
ভাষা ও সাহিত্যের চলমান স্রোতে জঙ্গম গতিতে প্রবহমান যে অনবদ্য অগ্নিস্ফুলিঙ্গ তারই কোল ঘেঁষে বুক ছুঁয়ে বহে চলেছে বাংলাভাষার বিভঙ্গ তরঙ্গ স্রোত । একটা নিঃসঙ্গ জীবন যখন আর একটি নিঃসঙ্গ জীবনের দিকে চলতে থাকে মেদুর কিরণ মেখে বাতাসের সহপাঠী হিসেবে, তখন কবির কলম ঝলসে ওঠে চৈতন্যের দগ্ধ অভিশাপের বার্তা,অমিত রোদ্দুর ভরা প্রকৃতির নির্মম নিয়তির বিরুদ্ধে । কবি বয়সে মধ্যগগণের নিকষিত সৌরকণ্ঠাধিকারী, অর্ধশতাব্দী জীবন অতিক্রান্ত পথিক, প্রতিটি জীবন যুদ্ধক্ষেত্রের সংগ্রামে ক্ষতবিক্ষত হয়েও মানবিকতার নৌকায় আরোহণ করে প্রতিকূল তরঙ্গ পেরিয়ে চলেছেন নিস্তরঙ্গ দ্বীপের সন্ধানে। কবিজন্মের এক অলিখিত অধ্যায়ে নবারুনের উল্লাস ঔজ্জ্বল্যে মনু সকালে কবিতা জীবনের প্রেমবাঁশি কীভাবে ফুঁ শব্দে আন্দোলিত হয়ে ওঠে প্রকৃতি, সেই ভালবাসার সংরাগ চুমুতে চুমুতে রক্তজবা বিকেল হয়ে প্রেমিকার গাল রঙিন করে তোলে। এক দিনমজুর বাবার আধপেটা বুভুক্ষু সংসারে রক্তিম রাগে রঞ্জিত হয়ে উঠেছে এক নবীন প্রতিভা । অভাব যার নিত্য সঙ্গী, প্রেমিকা যাকে অনায়াসে উপেক্ষা করতে সাহস পায়, আমজনতা যার দিকে মুখ ফেরাতে চায়না, সহপাঠী, সহসাথীদের আশ্চর্য অনাদর কবিকে মৃন্ময়ী ভাবনায় সিক্ত করে, চিন্ময়ী সত্তার প্রকাশ ঘটে চৈতন্যের জগতে, মনোজগতের নিশ্ছিদ্র অন্ধকার কুঠুরিতে, আলোর বন্যা বহে যায় চকিত হরিণীর শীতল চোখের মায়ামুগ্ধতায়।
অসুখ সারেনি
মৃত্যুর নৌকো চড়ে সমুদ্র পেরোচ্ছি
আর ভেতরে মন্থন চলছে
সব শর্ত ভুলে গেলে আর কিছু দায় নেই
দূরের মন্দিরে তুমি সেরে নাও নিজস্ব আরতি
আমি কোন বিকল্প চাইনি বলে
এখনও সমুদ্র --- চৈতন্যের দগ্ধ অভিশাপে
তরঙ্গ পেরিয়ে যাই নিস্তরঙ্গ দ্বীপে ।
প্রেম, ভালবাসা অসীম অমর্ত্য স্মৃতি বিরাগ । প্রেমিকার রাঙা মুখ রঙিন বিকেলের মতন স্পর্শময়ী হয়ে উঠলে কবিতা ডানা মেলে উড়ে আসে নিস্তরঙ্গ জীবনের বাঁক ঘেষা ফল্গুধারার সাথে। মুগ্ধ উনুনগুলি পাবক জ্বেলে প্রাগৈতিহাসিক অন্ধকারকে আলোকিত করে ম্লান মুখগুলি জেগে ওঠে ভালবাসার অস্তিত্বের আকাশে, কবিতার সেই সব নারী, সেই সব অন্তিম নিকষ রাতগুলো নিজস্ব চোখালোকে মূর্তিমতী নারীর সকাশে উপনীত হয় কবিতার জগতে, রোমান্টিকতার সুর সেঁধে, মানবিকতার দৃষ্টি দর্শনে।
নতুন জন্মের বীজ আবার উদ্দাম হোক
মুগ্ধ উনুনগুলি জ্বালুক পাবক।,,,
' হৃদয়ে প্রেমের দিন কখন যে শেষ হয় -- চিতা শুধু পড়ে থাকে তার '-- জীবনানন্দীয় চিন্তা চেতনার সংরাগে বিমিশ্রিত আলোক উৎস শুধুই বারবার কেন যেন আমাদের জীবনে নতুন করে বেঁচে ওঠার মন্ত্র জোগায়। আমরা একে অপরকে অবশ্যই ভাল বাসব, নতুবা মরব -- জীবনযুদ্ধের এই মহাসমরে অরণ্যের জীবন উচ্ছ্বাস জানালার দুই পাশে মুগ্ধ স্বপ্নের মায়াজাল বিছিয়ে সময়ের স্রোতে ভেসে চলি অনন্য যাত্রাপথে উদ্দেশ্যকে স্পর্শ করার সুতীব্র বাসনায়। ভালবাসাগুলি যখন নৈঃশব্দ্যের বেড়া টপকে সুউচ্চ শিখর থেকে উৎকীর্ণ ঝরনার কোমল মায়ামুগ্ধকর প্রবাহের সাথে ফোঁটা ফোঁটা স্নেহসিক্ত ধারা হয়ে পাদদেশে ছুটে আসে, প্রকৃতির স্নেহ,মায়া,উপচ্ছায়া মিশ্রিত করুনার প্রতিবিম্ব রূপে প্রতিফলিত হয়, তখন কবিতার শরীর সাবলম্বী হয়ে ওঠে, যৌবনাপুষ্ঠ ও কামনামত্ত দেবী হয়ে যায় কবির কলমস্রোতে।
কবি নির্লিপ্ততার ব্যস্তময় সহিষ্ণুতা কাঁধে তুলে নিয়ে কলমের ক্ষীণ বলয়বিন্দুতে নিজেকে প্রেমিকের দোরে হাজির করেন। প্রচলিত রীতি নিয়মের বেড়াজাল ভেঙে মানবিক মূল্যবোধের পরিপন্থী সমাজচিন্তাকে কুঠারাঘাত করে দৃপ্ত ও সবল কণ্ঠে ঘোষণা করেন --
আমাকে যেমন কাঁদালে, তুমিও কাঁদিও।
সারা জীবন কাঁদিও।
( ক্রমশঃ)
Post a Comment