অন্য আমি - কোয়েল তালুকদার
একদিন এক অদ্ভুত কাণ্ড হলো - আমার ভিতর দুটো 'আমি'র অস্তিত্ব দেখলাম। আমার এই আমি নিয়ে আজ কোনও কথা নয়। আজ কথা বলছি সেই --
অন্য আমি বাড়ি থেকে পথে নামলাম, দেখলাম মাঠ, প্রান্তরের পর প্রান্তর হাঁটলাম , তারপর দেখি -- বনভূমি, বন পেরিয়ে নদী। নদী পার হয়েই পোড়ামাটির মসজিদ, তারপর তিল ক্ষেতের পাশ দিয়ে যেতে যেতে দেখি -- টিনের চালার স্কুল, স্কুল ঘর পেরুলেই পুরনো ভাঙা রথ ঘর, এর কিছু দূরেই পদ্মরানীর দিঘি। আমি সেখানেই চলে এলাম ত্রিশ বছর পর-- এই দিঘির পাড় আমার অনেক চেনা। এখানেই মাধবী এসে বলেছিল -- মহাকাল কত কোটি কোটি বছরের। আর আমাদের জীবন সেই তুলনায় একটি বিন্দু মুহূর্ত মাত্র। এই ক্ষণ মুহূর্তকালের জন্য তুমি আমাকে সঙ্গী করে নাও। সেদিন ছিল আষাঢ়ের মেঘের দিন। আমরা বসেছিলাম -- পদ্মরানীর দিঘির পাড়ে। হঠাৎ বৃষ্টি নামলো, কোনও ছায়াতলে যাইনি আমরা, ভিজছিলাম দিঘির পাড়েই.... কিছু আবেশ মাখা স্মৃতি তৈরি হয়েছিল সেই মাহেন্দ্রক্ষণে, জলের নুপুর টপটপ করে ভিজিয়েছিল দুজনকে... আমরা বৃষ্টির কাছে প্রার্থনা করেছিলাম -- বৃষ্টি তুমি থেমে যেওনা। এক অনির্বচনীয় ভালোবাসায় অঙ্গীকার করেছিলাম -- দুজন দুজনকে চিরদিনের করে নেব। কিন্তু সে আর নেয়া হয়নি। মানুষের জীবনে অনেক সময়ে কিছু অমোঘ দূর্ঘটনা ঘটে যায়। সেই সব ঘটনা চূর্ণ করে দেয় সব অঙ্গীকার, ভেঙে দেয় স্বপ্নসৌধ। আজ ত্রিশ বছর পর, এখানে এলাম। আজও আষাঢ়ের দিন। শুধু সেদিনের মতো মেঘ নেই। বৃষ্টি নেই। আছে দিঘির শান্ত জল। আজও মাধবীও এসেছে এই পদ্মরানীর দিঘির পাড়ে। এত বছরেও ও একটুও বিগত যৌবনা হয়নি -- সেই কাজলমাখা চোখ, সেই এলো কুন্তল, সেই ভ্রু যুগল, সেই রক্তকুচ ঠোঁট। হাতে এক গুচছ চন্দ্রমল্লিকা নিয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে। মাধবী- কেন জানি মন বলছিল তুমি আসবে আজ এখানে। তাই চলে এলাম। আমি - আমারও মন বলছিল তুমি আসবে। তাই আমিও চলে এলাম। মাধবী -- কোনও অনুযোগ নেই আর। নেই অভিমানও। এই ফুলগুলো নিয়ে এসেছি। তোমার সাথে আমার বিয়ে হলে আজ ত্রিশতম বিয়ে বার্ষিকী হতো। নাও ফুলগুলো হাতে নাও। পরিয়ে দাও আমার বেনী খোঁপায়। আমি ফুলগুলো হাতে নিয়ে মাধবীর খোঁপায় পরিয়ে দিতে দিতে বললাম -- আজ যদি সেই ত্রিশ বছর আগের দিনের মতো বৃষ্টি নামতো! কী যে ভালো লাগতো! ইচ্ছেমতো ভিজতাম ! মাধবী -- মানুষের দুটো করে সত্তা থাকে। একটি থাকে মুক্ত। সবাই তাকে দেখে। আর একটি থাকে গোপন। সেটা কেউ দেখে না। আমি আমার সেই গোপন সত্তার ভালোবাসা দিয়ে এতবছর তোমাকে লালন করে রেখেছি বুকের ভিতর। এই জন্য কখনোই আমি আমার স্বামীকে বঞ্চনা করিনি। তাকে দিয়েছি সব উজার করে। যখন যা চেয়েছে সব। আমি -- আমারও তাই মনে হয়। দেখো -- তোমার সাথে আমার কত অন্তরের মিল। আমিও এলাম। তুমিও এলে। জানো, আমি একটি 'আমি' কে আমার স্ত্রীর কাছে রেখে এসেছি। তোমার কাছে যে আমি এখন সে 'অন্য আমি '। মাধবী -- কেন জানি, মনে হচ্ছে -- আমাদের দেখতে পাচ্ছে অন্য কেউ। খুব ভয় হচ্ছে আমার! যদি বদনাম হয় তোমার আমার! আমি -- বদনাম হোক। ত্রিশ বছর পর তোমাকে কাছে পেলাম। আর কী না, একটু কাছাকাছি হবো না? তাই কী হয়! এই পদ্মরানীর দিঘির পাড়ের ঘাসও মন খারাপ করবে। চলো -- ঐ হাস্নাহেনার ঝাড়ের আড়ালে। আমরা ফুল ছুঁয়ে দেখব ওর সৌন্দর্য । পাতা ছুঁয়ে দেখব, ওর সবুজ। তোমাকে ছুঁয়ে অনুভব করব পার্থিব যত মাধুর্য! মাধবী -- না গো -- আমি মরে যাবো। আমার দ্বিতীয় সত্তাকে তুমি মেরে ফেল না। আমার কাছে তোমার স্থান পুণ্যতায় বেঁচে থাক জন্ম জন্মান্তর! আমি -- আচ্ছা, তাই হোক। আবার কবে আসবে এখানে এই পদ্মরানী দিঘির পাড়ে? মাধবী -- আর কী আসার সৌভাগ্য হবে! ত্রিশ বছর আর কী বেঁচে থাকব? মহাকাল কেড়ে নেবে। যদি বেঁচে থাকি -- আসবো। পদ্মরানীর দিঘির টলটলে জল হঠাৎ আষাঢ়ের দমকা হাওয়া লেগে আলোড়িত হয়ে ছোট ছোট ঢেউয়ে পরিনত হলো। ঢেউগুলো আবার স্তব্ধও হয়ে গেল। আমি তাকিয়েছিলাম জলের দিকে। তারপর পিছনে ফিরে দেখি -- কোথাও মাধবী নেই। যে আমার পাশে -- সে আমার মায়াবতী। আমি তখন আমার আমিতে মগ্ন। ~ কোয়েল তালুকদার
Post a Comment