বিমল দাস বা শৈল চক্রবর্তী যেখানে হাসির গল্পের জন্য কার্টুনধর্মী ছবি আঁকতেন, নারায়ণ দেবনাথের ভাগে পড়ত রহস্য-রোমাঞ্চ বা ভয়ের গল্প।
রঙিন শৈশবের দিনগুলি
সৌম্য ঘোষ
যে কোনও শিল্পই 'রূপক'-এর অবগুণ্ঠনে আবৃত থাকে। তা সে রামায়ণ-মহাভারত-ইলিয়ড-ওডিসি যাই হোক না কেন। 'রূপক' মানে, সেখানে আপাতদৃষ্টিতে যা বলা হচ্ছে, সেটাই এক ও একমাত্র বক্তব্য থাকছে না, কিংবা আদপেই সেটি কোনও বক্তব্য না হতেও পারে; বরং ওই বাইরের ত্বক-খোসায় যা বলা হচ্ছে, শাঁসের নিভৃত অন্তরে নিহিত থাকছে তার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনও ভুবন, অন্য কোনও দিশা!
এই অভিজ্ঞতা আমাদের "চর্যাচর্যবিনিশ্চয়" থেকেই হয়ে আসছে। তাই ভাবুক বাঙালি 'রূপকে' অভ্যস্ত।
এ হেন রূপকের আবার মাত্রান্তরও হয়। রূপককে সেই মাত্রান্তরেই হয়তো দেখা গিয়েছিল সদ্য প্রয়াত নারায়ণ দেবনাথের কমিক্সে। 'মাত্রান্তর' মানে, তীব্রতাটা কম, বা, অভিঘাতটা একটু 'টোন ডাউন' করা।
কমিক্স, আমরা সততই জানি তা, ছোটদের জন্য, ছোটদের মতো; ছোটদের জগতের নিবিড় মেঘ ও রোদ্দুর সতত সঞ্চরমাণ সেখানে। বড়দের প্রবেশ সেখানে নিষেধ। 'প্রবেশ নিষেধ' মানে, ছোটদের কাহিনী যা নিয়ে ছুটবে সেখানে থাকবে না বৃহত্তর বিশ্বের বড়সড় কোনও ঘটনার বিন্দুমাত্র অনুষঙ্গ। আবিশ্বে শিশুকিশোর সাহিত্যের জগতে মোটামুটি এইটিই বহাল থেকেছে। কখনও কখনও যে তার সচেতন বিচ্যুতি ঘটেনি, তা নয়; কিন্তু মোটামুটি ভাবে তা ছোটদের পৃথিবীর দিকেই মুখ করে থেকেছে।
আজীবন শিশু-কিশোরদের জন্য লিখে-চলা এঁকে-যাওয়া এই মানুষটিও কি ঠিক তাই-ই করেননি? ছোটদের পৃথিবীর দিকেই মুখ করে থাকা? তাঁর শিল্পের যে জগৎ, তাঁর ভাবনার যে ভূগোল, তাঁর কল্পনার যে রসায়ন, তাঁর সৃষ্টির যে দর্শন-- সেখানেও সততই গভীর ছায়া ফেলে গিয়েছে শৈশবের অম্লান রোদ্দুর, কৈশোরের অমেয় দুষ্টুমি। আর সেখানে অতিরিক্ত যা ছিল, তা হল, একটা খাপছাড়া অদ্ভুতুড়েপনার আবহ। মূলত বাঁটুলের কার্য-কলাপের সঙ্গেই যা অন্বিত।
১৯৬০-এর দশক থেকে বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে জুড়ে যাওয়া একটি অনুসঙ্গ তিনি। ১৯৬২ সালে ‘হাঁদা-ভোঁদা’, ১৯৬৫-তে ‘বাঁটুল দি গ্রেট’, ১৯৬৯-এ ‘নন্টে-ফন্টে’ বাঙালির শৈশব এবং কৈশোরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কমিক স্ট্রিপ।
বাঙালির সুপারহিরো ছিল না। কিন্তু কোথাও একটা বীরভাব ছাইচাপা আগুনের মতো ধিকিধিকি জ্বলত। বাঁটুল দি গ্রেট সেটারই মূর্ত রূপ। মনে রাখতে হবে, ১৯৬২তে ঘটে গিয়েছে ভারত-চীন যুদ্ধ, ১৯৬৫-তে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ। বাঁটুলের আগমন কি সেই যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে কোথাও জাতীয়তাবোধের জাগরণকে চিহ্নিত করে? ভারত-
-পাক সঙ্ঘাতের সময়ে খানসেনাদের ‘প্যাটন পেটা’ করে বাঙালির (পরে বাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধের সময়েও) একান্ত জাতীয়তাবাদকে তুলে ধরেছিল বাঁটুল। সে কথা কি ভোলা সম্ভব!
নারায়ণ দেবনাথ বাংলা কমিক্স সাহিত্যের প্রথম পর্বের অন্যতম দিশারী। বাঁটুল দি গ্রেটের স্ট্রিপে চোখ রাখলে বোঝা যায়, এর কুশীলবরা এক অলীক নগরীর বাসিন্দা। সেই ভুবনে কেমন যেন একটা কাউবয় অধ্যুষিত আমেরিকান ওয়েস্টের গন্ধ। তবে সেখানে হিউমার সৃষ্টি হয় একেবারেই বাঙালি কেতায়। ভুঁইফোঁড়, লোক-ঠকানো, ফ্যাশন-সর্বস্ব পোশাকের দোকানের নাম ‘অঙ্গবাহার’ আর সাদাসিধে পোশাক বিপণির নাম ‘অঙ্গঢাকা’— এমন রসবোধে মজে যেতে সময় লাগেনি বাঙালি পাঠকদের। তবে ‘হাঁদা-ভোঁদা’র পরিমণ্ডল কিন্তু ষোল আনা বাঙালি। রোগা-পাতলা হাঁদা তার চালাকি নিয়ে নাজেহাল হবেই আর সহজ-সরল মোটাসোটা ভোঁদা জিতবে শেষমেশ— এই কাঠামো বার বার পুনরাবৃত্ত হলেও একটুও একঘেয়ে লাগেনি। কারণ একটাই— এই কমিক স্ট্রিপ খুদে দস্যিদের একাত্ম বোধ করাতে পেরেছিল। তাদের অভিভাবকদের ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল অমল কৈশোরে।
তবে তুলনায় ‘নন্টে-ফন্টে’র দুনিয়া একেবারেই আলাদা। ছাত্রাবাসের ঘেরাটোপে সুপারিন্টেন্ডেন্ট পাতিরাম হাতি (নাকি হাতিরাম পাতি?) আর বেয়াদপ সিনিয়র কেল্টুর সঙ্গে নন্টে-ফন্টের অনিঃশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতা হস্টেল জীবন কাটিয়ে আসা বঙ্গসন্তানকে এখনও স্মৃতিভারাক্রান্ত করে। যাঁরা সেই জীবনের স্বাদ পাননি, বন্ধুদের মুখ থেকে শুনেছেন সেই জীবনের নানা কাহিনী, তাঁদেরও প্রায় প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার স্বাদ দিতে সমর্থ এই চিত্র-কাহিনি।
তবে এর পাশাপাশি আরও বেশ কিছু কমিক স্ট্রিপ রচনা করেছিলেন নারায়ণ দেবনাথ। ‘বাহাদুর বেড়াল’, ‘ডানপিটে খাঁদু আর তার কেমিক্যাল দাদু’, ‘ডিটেকটিভ কৌশিক রায়’ ইত্যাদি। তবে এ সবের মধ্যে উল্লেখের দাবি রাখে ‘ব্ল্যাক ডায়মন্ড ইন্দ্রজিৎ রায়’ সিরিজ। দুর্দান্ত অপরাধী ব্ল্যাক ডায়মন্ড আর গোয়েন্দা ইন্দ্রজিতের টক্করে কে শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়, তা জানা যায় না কখনওই। ১৯৮০-১৯৯০-র দশকে সেই সব চিত্রকাহিনী গোগ্রাসে গেলেনি, সেই সময়ে কৈশোর পেরোতে থাকা তেমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
ছবির শেষে ছোট্ট একটা 'না...' দিয়েই নিজেকে চিনিয়ে দিতেন
কার্টুন রাজা।
সাহিত্যসংক্রান্ত কিছু গবেষণা তথ্য সন্ধান করে দেখিয়েছে--- নারায়ণ দেবনাথ তাঁর নির্দিষ্ট এই চৌহদ্দির মধ্যেই অনেকটা বিপ্লব ঘটিয়েছেন; প্রথাগত শিশুকিশোর সাহিত্যের বিধিবদ্ধ 'জঁর' থেকে সচেতন ভাবে সরে আসেন, বা ঠিক সরে না এসে, চেনা কমিক্সের চেনা মাটিতে পা রেখেই তিনি সাবলীল ভাবে সেখানে গুঁজে দেন ছোটদের তথাকথিত অচেনা একটা সমাজ-রাজনীতির অন্যতর ভুবন, ভিন্নতর ভাবনা-বিশ্ব।
আসলে বাঁটুলকে নারায়ণ দেবনাথ বরাবরই একটু সমসাময়িকতার আঙ্গিকে এঁকেছেন বলেই দেখা গিয়েছে। তিনি এজন্য বাঁটুলকে যুদ্ধেও পাঠিয়েছেন! উল্লেখ্য যে, তিনি যখন তাঁর বাঁটুল দ্য গ্রেট নিয়ে বাংলা সাহিত্যে পা রাখলেন তখন বাতাসে বারুদের গন্ধ, সময়টা ১৯৬৫ সাল। ভারত-পাক যুদ্ধের কাল। তিনি একটুও দ্বিধা না করে বাঁটুলকে তাই পাঠিয়ে দিলেন যুদ্ধক্ষেত্রে। এই ট্রেন্ড বজায় থেকেছে ১৯৭১ সালেও। সেটা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়। তখনও বাতাসে যুদ্ধ-যুদ্ধ ভাব, সাধারণ মানুষের মনের ভিতরে জাতীয়তাবাদী আবেগের ঢেউ। তখনও নারায়ণ বিষয়ের খোঁজে অন্য দিকে চোখ ফেরান না। বাঁটুলকে সটান পাঠিয়ে দিলেন খানসেনা নিধনে।
এই ১৯৭১-এর যুদ্ধেই বাঁটুলের দ্বারা সম্পাদিত ধ্বংসলীলা প্রথম একটু 'ভায়োলেন্ট' হয়ে উঠল। এই পর্বেই নারায়ণ তাঁর কমিক্সে সরাসরি মৃত্যু দেখালেন, এমনকী ব্লাডশেডও দেখালেন! তবে এই প্রথম, আর এই শেষ। পরবর্তী সময়ে নারায়ণ বাঁটুলকে অপারেশন বিজয় বা কার্গিল যুদ্ধেও অংশ নেওয়ান। না, সেখানে আর তত ভায়োলেন্স দেখান না। কিন্তু যুদ্ধ-রাজনীতি, দেশ-সমাজের একটা গন্ধ তিনি মসৃণ ভাবে বিছিয়েই রাখেন তাঁর সৃষ্টিতে।
শুধু কমিক স্ট্রিপের রচয়িতা হিসাবেই নয়, বাংলা গ্রন্থচিত্রণের অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন নারায়ণ দেবনাথই। দেব সাহিত্য কুটির থেকে প্রকাশিত পূজাবার্ষিকীতে বিমল দাস, তুষার কান্তি চট্টোপাধ্যায়, শৈল চক্রবর্তীর পাশাপাশি বিরাজ করতেন নারায়ণ দেবনাথ। অন্যদের তুলনায় তাঁর অলঙ্করণের ক্ষেত্রটা ছিল একটু আলাদা। বিমল দাস বা শৈল চক্রবর্তী যেখানে হাসির গল্পের জন্য কার্টুনধর্মী ছবি আঁকতেন, নারায়ণ দেবনাথের ভাগে পড়ত রহস্য-রোমাঞ্চ বা ভয়ের গল্প। রিয়্যালিস্টিক ঘরানার সেই সব অলঙ্করণ কাহিনীকে একেবারে পাঠকের মগজে সেঁধিয়ে ছাড়ত। অনেক বছর পরে গল্পের নাম ভুলে গেলেও অলঙ্করণের দৌলতে তাদের এখনও মনে করতে পারেন সে দিনের বইপোকারা। হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়ের কলম থেকে নির্গত ভূতের গল্প আর তার সঙ্গে নারায়ণ দেবনাথের কালি-কলমে আঁকা সাদা-কালো ভয়ের জগৎকে কী করে ভুলবে পুজোর ছুটির দুপুরে ‘উদয়ন’, ‘তপোবন’ পড়া বাঙালি!
তার পরে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়েছে বাংলা শিশুসাহিত্য। কমিক স্ট্রিপ হিসেবে বাঙালি পাঠকের মনে জায়গা করে নিয়েছে আন্তর্জাতিক টিনটিন, অ্যাস্টারিক্স। বলীয়ান নায়ক হিসেবে দাপিয়ে বেড়িয়েছে ব্যাটম্যান, সুপারম্যান। কিন্তু তাতে বাঁটুল, হাঁদা-ভোঁদা বা নন্টে-ফন্টের কিছু এসে যায়নি। এখনও কলকাতা বইমেলায় হ্যারি পটার কেনার পর বাঁটুলের কাট-আউট লাগানো স্টলে লাইন দিতে দেখা যায় অগণিত খুদেকে। পাশাপাশি তাদের বাবা-মা’কেও। প্রফেসর ক্যালকুলাসের সঙ্গে, প্রফেসর ডাম্বলডোরের সঙ্গে কেমন সহজ সহাবস্থানে থেকে যান সুপারিন্টেন্ডেন্ট পাতিরাম হাতি। টিনটিন সহজেই বন্ধুত্ব করে নেয় নন্টে বা ভোঁদার সঙ্গে। বাঁটুলকে তার ব্যাটমোবাইলে নিয়ে ঘোরে ব্যাটম্যান। কোথাও কোনও বিরোধ নেই। সহজ একটা অবস্থান। এমনটা বোধ হয় বাংলাতেই সম্ভব।
আর তা সম্ভব হয়েছিল নারায়ণ দেবনাথের মতো এক বহুমুখী চিত্রকাহিনীকার এখানে জন্মেছিলেন বলেই। সাদা-কালোয় বা দুই রঙে আঁকা সেই সব অসংখ্য ছবি আর কমিক্স এখনও বাঙালির জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। স্রেফ পাতা ওল্টালেই হাফ্ প্যান্ট পরা বয়সে ফিরে যাওয়ার এক অনবদ্য টাইম মেশিন।
যেটা তাঁর শিল্পের উৎকর্ষের গুণে চোখে লাগে না, কিন্তু তা একটা আপাত অন্তর্ঘাত রেখেই দেয়। অর্থাৎ, প্রথম পড়ার আবেশ-উন্মাদনাকে পেরিয়ে পরবর্তী সময়ে যখন ছোটরা আবার সেগুলি ফিরে পড়বে, তখন তারা হয়তো তাদের চারপাশের সমাজ-বিশ্বকে নিয়ে ভাববে, ভাববার একটা অবকাশ অন্তত তৈরি হবে।
একজন সচেতন শিল্পী হিসাবে নারায়ণ আসলে তাঁর ছোট্ট ছোট্ট পাঠকদের 'ভাবা প্র্যাকটিস' করান! বোঝা যায়, নারায়ণ তাঁর টার্গেট অডিয়েন্সকে খুবই সিরিয়াসলি নিচ্ছেন, ছোটদের তিনি নিছক ছোট বলেই 'ছোট' করে রাখছেন না; তাদের রীতিমতো গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি, তাই তাদের মননে বিনোদনের হালকা মোড়কেই বুনে দিচ্ছেন দেশ-সমাজ-রাজনীতির আবেশ, গেঁথে দিচ্ছেন জাতীয়তাবাদী বোধ।
নারায়ণ কি তবে চাইছিলেন তাঁর অল্পবয়সী পাঠক-পাঠিকারা তাঁকে পড়তে-পড়তেই একটু বড় হয়ে যাক? হয়ে উঠুক একটু সাবালক?
Post a Comment