ইদানিং বাড়িতেও তাকে নিয়ে বাবা-মায়ের মধ্যে কথা চালাচালি হতেও দেখেছে সে। বাবা বারবার বলেন, আমি যখন থাকব না, তখন ও কী করবে কে জানে?
জ্যাম্মা
জয়নারায়ণ সরকার
সকাল থেকেই আজ কেমন মেঘলা আকাশ। এমন দিন শুভ্রকে আরও বেশি আনমনা করে তোলে। ছোটবেলা থেকে একান্নবর্তী পরিবারে মানুষ হলেও নিজেকে আলাদা করে রাখতে জানে। ছোড়দার সাথে স্কুল গেলেও রাস্তায় ও যেন আপন খেয়ালে হাঁটে। একবার সাইকেলে চাপা পড়তে পড়তে বেঁচে গিয়েছে। অবশ্য ছোড়দা যদি হাত ধরে টান না দিত, তাহলে যে কি হত কে জানে! তবে শুভ্র কিন্তু বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। জ্যেঠতুতো ভাই-বোন মিলিয়ে ওরা আটজন। শুভ্র সকালে বাথরুমে গেলে যে কতক্ষণ থাকে তা সে নিজেই জানে না। একবার বাইরে ভিড় লেগে গিয়েছিল। তাতে জ্যেঠা সহ দুই দাদা লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল। আর একটু হলে দরজা ভেঙে কেউ না কেউ ঢুকে পড়ত। এক দাদা তো পাশের বাড়িতে চলে গিয়েছিল। তা নিয়ে পাড়ায় ওর নামে রসালো গল্প চালু করেছিল বন্ধুরা। তাতে অবশ্য ওর কোনো হেলদোল ছিল না। জ্যাঠা ওকে আদর করে বলতেন, ওটা তোর অপারেশন থিয়েটার ওখানে তোকে কাটা-ছেঁড়া করতে হয়, তাতে তো টাইম লাগবেই। শুভ্র একথা শুনেও জ্যাঠার গা ঘেঁষে বসে পাকা চুল বেছে দেয়।
একদিন জ্যাম্মা এমনি জিজ্ঞেস করেছিল, হ্যাঁরে শুভ্র, তোর বাথরুমে যা সময় লাগে আমাদের এ বাড়ির মেয়েদেরও অত সময় লাগে না। ধন্যি বাবা তুই।
শুভ্র জ্যাম্মা-র দিকে চেয়ে একটা হাসি দিয়ে পালিয়ে যায়। জ্যাম্মা ওটুকু বলে ক্ষান্ত হননি। মাকেও যা নয় তাই বলেছেন। রাতে মা সেগুলো বাবার কাছে উগড়ে দেওয়ার সময় শুভ্র সব শুনতে পায়। বাবা কিন্তু কোনো কথা বলেন না। শুভ্র ঘুমিয়ে পড়ার ভান করে। তবুও বাঁ চোখের কোণ বেয়ে খানিকটা জল গড়িয়ে পড়ে বালিশে।
কিন্তু কী আর করবে, আসলে ওর ওখানে কত কাজ। বালতির জল হাতের তালুতে নিয়ে দুধ দেওয়ার মতো সের করে করে মাপে। বাথরুমের বড়ো দেওয়ালে জল ছিটিয়ে দিয়ে বিভিন্ন কোণ থেকে কত রকম অবয়ব দেখে সে। কখনও গাছের ডাল, কখনও পাখি, কখনও মানুষ...
***
ক্লাশে বাংলা কবিতা নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর 'অমলকান্তি' পড়াচ্ছিলেন রণজিৎবাবু। ছাত্ররা মনোযোগ সহকারে শুনছিল। একমাত্র শুভ্র জানালার বাইরে এক দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল। শ্রাবণ মাস হওয়ায় আকাশ ঢেকেছিল মেঘে। রণজিৎবাবু খেয়াল করে শুভ্র আনমনে বসে। তার পাশে গিয়ে দাঁড়ান তিনি। সম্বিৎ ফিরে পেয়ে অবাক চোখে তাকায় শুভ্র।
ইদানিং বাড়িতেও তাকে নিয়ে বাবা-মায়ের মধ্যে কথা চালাচালি হতেও দেখেছে সে। বাবা বারবার বলেন, আমি যখন থাকব না, তখন ও কী করবে কে জানে?
মা চটজলদি উত্তর দেয়, দেখ, ও ভালভাবে দাঁড়িয়ে যাবে। এখনও পর্যন্ত রেজাল্ট তো ভাল করছে।
বিদ্রূপ মাখানো সুরে বাবা বলে, তোমার কথা সত্যি হলেই ভাল।
বাবার চাকরিতে বদলি হওয়ায় বাড়ি, জ্যাঠা-জেঠি-দাদা-বোন, পুকুর, মাঠ, মোরাম রাস্তা ছেড়ে কংক্রিটের জঙ্গলে চলে আসতে হয়। শুভ্র ততদিনে কলেজে পড়ছে। তার শহর ভাল লাগত না। সুযোগ পেলেই সে চলে যেত মফসসলের পুরনো বাড়িতে। জ্যাঠামশাই মারা যাওয়ার পর সবাই কেমন যেন ব্যবহার করত। জ্যাম্মা এমন করত যেন সে চলে গেলেই ভাল হয়। এই পুরো সম্পত্তি যেন নিজের দখলে রাখতে পারে। সে অতশত বুঝত না।
সেদিন ছিল ভরা বর্ষা। বাড়ির পাশের পুকু্রটার জল উপচে এসে পড়েছিল রাস্তায়। শুভ্র ঘরের জানলা দিয়ে পুকুরটাকে একদৃষ্টিতে দেখছিল। হঠাৎ কাউকে জলে ডুবে যেতে দেখে দৌড়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পুকুরের জলে। বেশ খানিকটা সাঁতরে একটা মেয়ের চুলের মুঠি ধরে তুলে এনেছিল পাড়ে। তোলার পর দেখেছিল সে ছিল পাশের বাড়ির অঞ্জনা।
কিন্তু ভাগ্যের কী পরিহাস! কারা যেন রটিয়ে দিয়েছিল, অঞ্জনাকে ডুবিয়ে মারতে চেয়েছিল শুভ্র। একথা শোনার পর সারা রাত কেঁদে ভিজিয়ে ফেলেছিল বালিশ। পরদিন ভোর হতেই ওই বাড়ি ছেড়ে চলে আসে শহরে।
পরে সে জেনেছিল, ওই মিথ্যে রটনা করেছিলেন আর কেউ নন, জ্যাম্মা। আর কোনদিন ও বাড়িতে পা দেয়নি শুভ্র।
***
এ বছর বাবার চাকরি থেকে অবসর। শুভ্রও এমবিবিএস পাশ করে শহরের একটা হাসপাতালের হাউস স্টাফ। প্রতিদিন সকালে বেরিয়ে যায়। আর বাড়ি ফেরে রাত করে। একদিন ফিরতে দেরি করায় মা বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে।
মা বার বার বলতে থাকে, শুভ্র তো বেশি রাত করে না! তাহলে!
বাবা একটা ধমক দিয়ে বলে, হয়তো এমার্জেন্সিতে পেশেন্ট বেশি!
পরক্ষণেই মোবাইলে ফোন করে। কিন্তু সুইচড অফ থাকায় যোগাযোগ করা যায়নি। একটু বেশি রাতে ক্লান্ত শরীরটাকে কোনওরকমে টেনে নিয়ে বাড়ি ফেরে শুভ্র।
মা বলে, তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে আয়। আমি খাবার দিচ্ছি টেবিলে।
শুভ্র বলে, তোমাদের খাওয়া হয়েছে?
বাবা এবার ধমকের সুরে বলে, তোকে ফেলে আমরা খেতে পারি? তাছাড়া তোর মোবাইল তো সুইচড অফ।
শুভ্র বলে, আসলে চার্জ দিতে মনে ছিল না।
এবার রান্নাঘর থেকে মা চেঁচিয়ে বলে, তাড়াতাড়ি কর। রাত অনেক হয়েছে। কাল আবার বেরোতে হবে তো!
শুভ্র এবার কথা না বাড়িয়ে বাথরুমে ঢুকে পড়ে।
ডাইনিং টেবিলের একটা চেয়ার টেনে বসে শুভ্র। মা অল্প ভাত দিতেই বলে, আর দিয়ো না। একদম খিদে নেই।
মা এবার কপট রাগ দেখিয়ে বলে, এতক্ষণ হাসপাতালে কাটিয়ে এলি, না খেলে চলবে কী করে?
শুভ্র বসে বসে ভাতের মধ্যে আঙুল দিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকে। সেটা বাবা অনেকক্ষণ ধরে খেয়াল করেছেন। তারপর বলেন, কী হয়েছে তোমার? নিশ্চয়ই কোনো গুরুতর ব্যাপার?
শুভ্র এবার চমকে ওঠে। তারপর আস্তে আস্তে বলে, আজ দুপুরে বড়দা ফোন করেছিল। জেঠিমা সকালে পুকুরপাড়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। আমাদের হাসপাতালে আনবে কিনা তাই? আমি শুনেই বলে দিয়েছিলাম, যত তাড়াতাড়ি পারো নিয়ে এসো। আমার স্যারের আন্ডারে ভর্তি হয়েছে। কন্ডিশন খুব একটা ভাল নয়।
বাবা এবার চেয়ার ছেড়ে উঠে বলে, বউদির এমন অবস্থা হল, কেউ আমাকে একটা খবর দিল না?
মা মুখে আঁচল চাপা দিয়ে বলে, তুমি তো চলে আসার পর আর কারো সাথে সম্পর্ক রেখেছ? দাদা যতদিন ছিলেন, উনি খোঁজখবর নিতেন।
শুভ্র বলে, এখন এসব কথা থাক মা। আগে জ্যাম্মাকে সুস্থ করি।
সে রাতে আর কেউ খেতে পারে না। শুভ্র নিজের ঘরে চলে যায়। বেশিক্ষণ জেগে থাকতে পারে না। ক্লান্তি ওকে ঘুম পাড়িয়ে দেয়।
খুব ভোরে রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়ে শুভ্র। শুধু যাওয়ার সময় মাকে বলে যায়, ফোনে খবর নিয়েছি। এখন জ্যাম্মা ভাল আছে। আজ যদি ছুটি দিয়ে দেয় তাহলে এখানে নিয়ে আসব। থাকবে আমার ঘরে। আর আমি ডাইনিং স্পেসে রাখা সোফা-কাম-বেডে শুয়ে পড়ব। জ্যাম্মাকে সুস্থ করতেই হবে।
শুভ্র কমপ্লেক্সের লোহার বড় দরজা ঠেলে বেরিয়ে বড় রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছে। ট্যাক্সি পেলেই ছুটে যাবে হাসপাতালের দিকে।
ব্যালকনি থেকে মা অস্ফুট স্বরে বলে, দুগ্গা! দুগ্গা!
Post a Comment