নিজেও তো পড়েছে মফসসলের সাধারণ একটা স্কুলে। সেখানকার মাস্টারমশাইরা যা পড়িয়েছেন, সেটা নিয়েই তো আজও টিঁকে আছে।

 

Story and Article

সময় // জয়নারায়ণ সরকার


বার বার ঘড়ির দিকে তাকায় সৌম্য। আজ যে বড্ড তাড়া! সকাল থেকে রাত, রেসের ঘোড়ার মতো ছুটেই চলেছে। মেয়েকে স্কুলের গাড়িতে তুলে দিয়ে চলে যায় বাজারে। স্ত্রী মামনের মুখ নিঃসৃত ফর্দ মিলিয়ে কেনাকাটা করে তবে ফিরে আসা। ফিরেই ঢুকে যায় বাথরুমে। একেবারে স্নান সেরে তবে বেরোয়। কোনওমতে নাকে-মুখে গুঁজে ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে দে দৌড়। বেরোনোর সময় মামন বলতেই থাকে, আস্তে আস্তে! অত তাড়াহুড়োর কি আছে।

সৌম্য কথার উত্তর না দিয়ে মনে মনে বলে, না, তাড়াহুড়োর কিছু নেই! কয়েক দিন দেরি করে অফিস পৌঁছলে মাসের প্রথমে যেটা আসে সেটাতে ঘাটতি দেখা দেবে। এদিকে দিনের পর দিন খরচ তো বেড়ে চলেছে! এখন তো ব্যালেন্সশিটে সমান-সমান দেখা যায়। উদবৃত্ত কিছুই আর চোখে পড়ে না। অফিসেও আজকাল ওঠাপড়ার আলোচনা বেশি হয়। নন্দীদা এসব ব্যাপারে রোজ নতুন নতুন তথ্য পেশ করেন। সৌম্যের ভাল না লাগলেও মুখে কিছু বলতে পারে না। তাকেও ওই আলোচনায় অংশ নিতে হয়। কার ছেলে বা মেয়ে কোন স্কুলে পড়ে, মাসে কত খরচ, এসবও নন্দীদার কণ্ঠস্থ। কাজের ফাঁকে ফাঁকে এসব আলোচনায় মাঝে মাঝে বড্ড ক্লান্ত লাগে তার। কে কীভাবে নিজের জীবনকে বয়ে নিয়ে যাবে, সেটা তো তার ব্যাপার। সেটা নিয়ে গুরুগম্ভীর আলোচনা করে কী লাভ? মনে মনে নিজেকে প্রশ্ন করে সৌম্য। নন্দীদার উৎসাহ দেখেও মাঝে মাঝে অবাক হয় সে। কেন তার এত কৌতূহল? সেটা জানতে উদগ্রীবও হয় সৌম্য। কিন্তু এক-এক সময় ভাবে, ধুর, এসব ভেবে আরও হীনমন্যতায় ভুগে লাভ কী? তার চেয়ে যে যেভাবে চলছে চলুক।

সৌম্য অফিস থেকে বেরিয়ে সেখানকার কোনো কথা মনে রাখতে চায় না। কিন্তু মনে তো আর বাঁধ দিতে পারে না। কোনও অবসরে সেসব কথা উঁকি দেয়। তখন সে কোনো না কোনো কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে চেষ্টা করে।

ইদানিং বাড়িতেও সেই একই পরিবেশের আঁচ পায় সৌম্য। মামন খানিকটা উৎসাহ নিয়ে বলে, জানো, তিতলির মেয়ে নামকরা স্কুলে চান্স পেয়ে গেছে। মোটা টাকার ডোনেশনও দিতে হয়েছে। আজ দুপুরেই ফোন করে খবরটা দিল।

সাম্য গম্ভীর হয়ে বলে, তোমার বোনের মেয়ে বড় স্কুলে পড়বে, এতে তো তোমার গর্ব করা উচিত।

মামন ঠোঁট উলটে বলে,ওঃ, ওতে আমার গর্বের কি আছে? হ্যাঁ, বুকাই যদি চান্স পেত, তাহলে তো গর্বে বুক ফুলে উঠত। সে তো আর হওয়ার নয়।

সৌম্যকে আরও গম্ভীর দেখায়। মামনের কথায় বিরক্ত হয়ে বলে, এককাপ চা কি পাওয়া যাবে?

মামন রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে বলে, হ্যাঁ, শুধু চা-ই খেতে থাকো। সবাই এগিয়ে যাচ্ছে! আর তুমি তো কচ্ছপের থেকেও ধীরে চলেছো।

সৌম্য মনে মনে বলে, ধীরে এগোনোই ভাল।
খানিকক্ষণ পরে চায়ের কাপটা সামনে রেখে মামন চলে যায়। ওর চলে যাওয়া দেখে সৌম্য বুঝতে পারে ভীষণ রেগে আছে সে। করুক রাগ, নিজেকে আর ব্যতিব্যস্ত করতে চায় না সে।

নিজেও তো পড়েছে মফসসলের সাধারণ একটা স্কুলে। সেখানকার মাস্টারমশাইরা যা পড়িয়েছেন, সেটা নিয়েই তো আজও টিঁকে আছে। মেয়েও যে স্কুলে পড়ে সেটাও তো খারাপ নয়।

***

কয়েকদিন ধরে নন্দীদা আসছেন না। অফিসটাও কেমন ঝিমিয়ে থাকে। কেন এতদিন ধরে আসছেন না, সেটা জানতে খুব ইচ্ছে করে সৌম্যর।কিন্তু ফোন করা হয়ে ওঠে না। একদিন অফিসে পৌঁছতেই বড়বাবু বলেন, সৌম্য, একটা খারাপ খবর আছে।

কথাটা শোনামাত্র মনের ভেতরটা উথালপাথাল করতে থাকে। সে চোখের পলক না ফেলে বড়বাবুর দিকে তাকিয়ে থাকে।
বড়বাবু ধীরে ধীরে বলেন, নন্দীবাবু আর আমাদের মধ্যে নেই।

সৌম্যের দু'চোখে জল এলেও নিজেকে সামলে নিয়ে ধরা গলায় বলে, কী হয়েছিল নন্দীদার?
বড়বাবু অফিসে উপস্থিত সবার দিকে তাকিয়ে বলেন, প্রচুর ধার-দেনা হয়ে গিয়েছিল। পাওনাদারদের তাগাদায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন!

সৌম্যের চোখের সামনে নন্দীদার মুখটা ভেসে উঠতে থাকে। ছেলেকে নামী স্কুলে ভর্তি করায় বেশ গর্ব করতেন। যা মাঝে মাঝেই ওঁনার কথায় প্রকাশ পেত। কয়েক মাস আগে গাড়িও কিনেছিল। সেটা শুনে সারা অফিস মিষ্টি খাওয়ার আবদারও করেছিল। খাওয়াবো খাওয়াবো করে পাশ কাটিয়ে যেতে দেখেছে তাঁকে। নন্দীদার চোখে-মুখে অসহায়তার ছাপ স্পষ্ট দেখেছিল সৌম্য।

***
মনটা আজ খুবই খারাপ। বাড়ি ফিরে সোফায় চুপ করে বসে থাকে। কিছুই ভাল লাগছে না। মেয়ে এসে পাশে বসলেও কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই তার। মামন এক কাপ চা এনে বেশ জোরের সাথে টেবিলের ওপর রাখে। ওই আওয়াজে চমকে উঠে তাকায় সৌম্য। মামন এবার খানিকটা ঝগড়ার সুরে বলে, সারা জীবন তো চুপ করে কাটালে। এবার একটু ঝেড়েকেশে ওঠো। ওদিকে, তিতলিরা গাড়ি কিনেছে। সামনের রবিবার আমাদের এখানে আসবে।

সৌম্য খানিকটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলে, আমাদের এখানে কেন?
মামন এবার সুর সপ্তমে চড়িয়ে বলে, কেন আবার! আমাদের গাড়ি করে নিয়ে যাবে বড় কালীবাড়িতে।

সৌম্য একটা বড় নিশ্বাস নিয়ে বলে, ভাল তো। তোমার আর মেয়ের একটু ঘোরা হবে। কোথাও তো যেতে পারো না।
মামন অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে বলে, তোমাকে ভগবান কি দিয়ে বানিয়েছেন, বড্ড জানতে ইচ্ছে করে।

সৌম্য আর উত্তর দেয় না। চা খেয়ে আস্তে আস্তে উঠে বেরিয়ে পড়ে বাড়ি থেকে। শীত সবে পড়তে শুরু করেছে। গা-টা কেমন শিরশির করছে। রাস্তায় তেমন লোকজনও নেই। ফাঁকা রাস্তায় জোরে হাঁটতে শুরু করে সৌম্য। জোরে, আরো জোরে, আরো আরো জোরে... কিছুটা গিয়ে ক্লান্ত বোধ হয় তার। আবার ধীরে ধীরে ফিরে আসে বাড়ি।

মেয়ে ততক্ষণে শুয়ে পড়েছে। মামন সামনের ঘরে চিন্তাগ্রস্ত মুখে বসে আছে। সৌম্যকে দেখে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলে, হুট করে কোথায় চলে গিয়েছিলে?

সৌম্য হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, জোরে এগিয়ে যাওয়ার প্র্যাকটিস করতে গিয়েছিলাম। কিছুটা দূরে যেতেই বুকটা হাঁপরের মতো ওঠানামা করে ওঠে। তাই আবার ফিরে এলাম।

কথাগুলো বলে মামনের পাশে ধপ করে বসে পড়ে। মামন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। ঘরে ক্রমশ নিস্তব্ধতা গ্রাস করতে থাকে। ওরা দুজন নির্বাক হয়ে বসে থাকে। নিস্তব্ধতা ভেঙে মামন বলে, রাত অনেক হল, তাড়াতাড়ি হাত-মুখ ধুয়ে খেতে এসো।
বলেই রান্নাঘরের ঢুকে যায় মামন। সৌম্য তখনও সোফায় গা এলিয়ে বসে থাকে। নিঃস্তব্ধ ঘরে ঘড়ির আওয়াজ কানে এসে আছড়ে পড়ছে। সৌম্য খেয়াল করে, টিক টিক শব্দ একইভাবে বয়ে চলেছে।