দুপুরে তিন পদের মাছ ও পাঁঠার মাংস দেখে শ্বশুরমশাই খানিকটা বিরক্তি নিয়ে বলেন

 

Story and Article

সংযম // জয়নারায়ণ সরকার

অনেকদিন বাদে শ্বশুর-শাশুড়ি এসেছেন বলে খুশিতে গদগদ তারাপদ। অবশ‍্য আজ আসবে তা সে টেপির মুখ থেকে এক মাস আগে থেকেই শুনে আসছিল। সকাল হতে না হতেই টেপি তাগাদা দিতে থাকে বাজারে যাওয়ার জন‍্য। আজ তো ছুটি, তাই একটু গড়িমসি করে বিছানা ছাড়ে। বাজার করে আসতেও ঘণ্টা তিনেক লাগে। এদিকে টেপি উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে থাকে তার আসার পথ চেয়ে। দু-হাতে দুটো ব‍্যাগ ভরতি বাজার নিয়ে দরজার সামনে দাঁড়াতেই টেপি মুখ ঝামটা দিয়ে বলে, তোমার ঘটে কিছু আছে? একটু পরেই বাবা-মা এসে পড়বেন। এদিকে রান্নার কোনো বন্দোবস্ত করতে পারলাম না।

তারাপদ কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বলে, আরে মাছ কাটাতেই দেরি হয়ে গেল। তার ওপর মাংসের দোকানেও ভিড় ছিল।

টেপি রাগে গজগজ করতে করতে রান্নাঘরের দিকে এগোয়। তারাপদ সামান‍্য গলা তুলে বলে, একটু চা হবে নাকি।

বাবা-মায়ের দেওয়া নাম টিয়া। তারাপদ আদর করে টেপি বলে ডাকে। এমনিতে খুব সংসারী। সবকিছু গুছিয়ে রাখে। সেই কারণে তারাপদকে সংসারে বেশি মাথা ঘামাতে হয় না। বিয়ের পর তারাপদর ব‍্যবসা সেরকম না হওয়ায় অর্থকষ্ট থেকে কিছুতেই রেহাই মেলে না। বছর ঘুরতেই ছেলে এল তাদের মধ‍্যে। টেপি সেই সময় শ্বশুরবাড়িতে থাকত। তারাপদ মাঝে মাঝে যেত সেখানে। কিন্তু তার সাথে কেমন যেন করতেন শ্বশুর-শাশুড়ি। বিয়ের পর পর কিন্তু এরকম অবস্থা ছিল না। যখনই যেত সবাই খুব আদর-যত্ন করত। শ্বশুরমশাই বলতেন, জামাই হচ্ছে এ বাড়ির রাজা।

অবশ‍্য একটা পরিবর্তনের আঁচ গায়ে লেগেছিল টেপির বোন ময়নার বিয়ের পর।
***

তারাপদ ছেলেকে কোলে নিয়ে বাইরের বারান্দায় বসে। তখনই একটা রিকশা এসে থামে। সে দেখতে পায় শ্বশুর-শাশুড়ি গেট পেরিয়ে ঘরের দিকে আসছেন। সে উঠে সামনে দাঁড়ায়। শ্বশুরমশাইয়ের হাতে মিস্টির প‍্যাকেট। শাশুড়ি প্রথমে বলে ওঠে, কেমন আছো তারাপদ?

শ্বশুরমশাই নাতির গালে হাত দিতে যেতেই শাশুড়ি চিৎকার করে বলে, না না, এখন নয়। আগে হাত-পা সাবান দিয়ে পরিস্কার করবে, তারপর।

শ্বশুরমশাই কেমন থমকে যান। ছেলে তাদের কোলে যাওয়ার জন‍্য হাত-পা ছুঁড়তে থাকে।
টেপি ততক্ষণে জলখাবার নিয়ে ঘরে ঢোকে। তারাপদ ভাল করে দেখে লুচি আর আলুরদম। ততক্ষণে শাশুড়ি টেপির একটা কাপড় পরে এসেছেন। সে তাড়াতাড়ি ছেলেকে শাশুড়ির কোলে দিয়েই রান্নাঘরের দিকে দৌড় দেয়।

দুপুরে তিন পদের মাছ ও পাঁঠার মাংস দেখে শ্বশুরমশাই খানিকটা বিরক্তি নিয়ে বলেন, এত কিছু খাওয়া যায় নাকি!

টেপি পাশ থেকে বলে, আস্তে আস্তে খেয়ে নাও। তোমার আবার কিসের তাড়া?

শ্বশুরমশাই এবার বেশ রাগ করে বলে, এটা তো ওয়েস্টেজ অফ মানি। একটা লোক এত খেতে পারে! তোদের এই বাজে অভ‍্যেস, ভাল সময় এলেই দু-হাত খুলে খরচ করিস। ভবিষ‍্যতের কথা কখনও ভাবিস না।

পাশে খেতে বসা শাশুড়ি গলার স্বর নিচু করে বলে, আঃ, তুমি থামবে। যতটা পারবে খাও। বাকিটা টিয়া তুলে রাখবে।

এবার যেন আগুনে ঘি পড়ল। উনি আরো জোরে বলতে লাগলেন, মানুষের সংযমটাই আসল। ভবিষ‍্যতের কথা মাথায় রেখে চলতে হয়। আজ ভাল, কাল তো খারাপ হতে পারে। এসব ব‍্যাপারে সন্দীপ অনেক সংযমী।

পেছনে দাঁড়ানো তারাপদর কথাগুলো শুনে কান লাল হয়ে ওঠে।

তারাপদর ব‍্যবসা ডুবে যাওয়ার পর অনেক কষ্টে ধীরে ধীরে দাঁড় করিয়েছে। একটা বছর কোথা দিয়ে চলে গেছে টেরও পায়নি। বছর দুই বাদে ওঁনারা আসায় সে একটু বেশিই বাজার করে ফেলেছিল। তাকে যে এমন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হবে সেটা কল্পনাও করতে পারেনি। ওই সময় টেপির মুখটা দেখে ওর ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। বাবা-মা আসবে বলে সে কয়েকদিন ধরে নাচছিল। আজকের এত রান্না সে মুখ বুঁজে করে যায়। এরমধ‍্যে ছেলেকেও দেখতে হয় তাকে। ওঁনারা চলে যাওয়ার সময় জামাইষষ্ঠীতে যাওয়ার জন‍্য নিমন্ত্রণ করে যান।

টেপি চুপ করে থাকে। খাওয়াদাওয়া পর্ব শেষ হলে অতিরিক্ত খাবার সব ফ্রিজে তুলে রাখে। তারাপদ ততক্ষণে গিয়ে ছেলের পাশে শুয়ে পড়েছে। টেপি ঘরে ঢুকেই বলে, ভালই হয়েছে, দু-তিনদিন তোমাকে বাজার যেতে হবে না আর আমার রান্নাও নেই। শুধুমাত্র ভাত করতে হবে। যাক বাবা, তাহলে ছেলের সাথে বেশিক্ষণ থাকতে পারব।

তারাপদ ওকে দেখে অবাক হয়ে যায়। এত কথা শুনেও কেমন নির্বিকার! সে শ্বশুরমশাইয়ের কথা তুলতেই টেপি এসে মুখ চেপে ধরে। তারপর বলে, বাবা ওঁনার কথা বলেছেন। ওসব মনে রেখো না। আমাদের সংসার তো তোমাকেই চালাতে হবে। তাই অত কথা ভেবে লাভ কী।

এবার টেপি ছেলের গায়ে একটা কাঁথা দিতে দিতে বলে, মা কিন্তু তোমাকে জামাইষষ্ঠীতে বারবার যেতে বলেছে। এবার একটু বড় করে করবে। ময়নার তো প্রথম বছর। সন্দীপ তো আগের দিন রাতে চলে আসবে।

যাওয়ার ইচ্ছে না থাকলেও, টেপিকে আর দুঃখ দিতে চায় না। মাথা নেড়ে সম্মতি দেয় তারাপদ ।

***
জামাইষষ্ঠীর দিন সকাল সকাল রওনা হয়। পৌঁছে ঘরে ঢুকে বসতেই শাশুড়ি একটা পাখা দিয়ে মাথায় বাতাস করে। শ্বশুরমশাই দোকানে গেছেন কী সব কিনতে। ময়না দৌড়ে এসে টেপির কোল থেকে ছেলেকে নিয়ে ঘরে ঢুকে যায়। টেপিও পেছন পেছন যেতে যেতে বলে, ওর এখন দুধ খাওয়ার সময়।

ডাইনিং স্পেসে অনেকক্ষণ একা বসে থাকে তারাপদ। টেবিলের ওপর থেকে কাগজটা নিয়ে চোখ বোলাতে থাকে। সে আসার পর থেকে সন্দীপকে দেখতে পায় না। এবার সে লক্ষ‍্য করে পাশের ঘরের ভেতর থেকে সন্দীপের গলা পাওয়া যাচ্ছে। দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। তারাপদ একবার-দুবার ওই ঘরের দিকে তাকাতেই শাশুড়ি বলেন, আর বোলো না। সন্দীপের অফিস থেকে ফোন করেছে। বেচারা, আজকের দিনেও ছুটি নেই।

ইতিমধ্যে শ্বশুরমশাই এসে সোফায় বসে। গরমে সারা শরীরে ঘামের বন‍্যা নেমেছে। মুখটা লাল হয়ে উঠেছে। সে উঠে প্রণাম করে। শ্বশুরমশাই বলেন, আর বোলো না, খাওয়ার পর সন্দীপের মিস্টি দই আর কোল্ড ড্রিঙ্কস না হলে চলে না। তাই আবার বেরোতে হল।

তারাপদ তার প্রথম জামাইষষ্ঠীর কথা মনেই করতে পারে না। তখন ব‍্যবসার জন‍্য দিন-রাত এক করতে হচ্ছিল। সে দুপুরে এসে কোনোমতে খেয়ে আবার বেরিয়ে পড়েছিল। টেপি অবশ‍্য একদিন বাদে ফিরেছিল।

পাশের ঘরের দরজা খুলে সন্দীপ বেরিয়ে আসে। তারাপদ ওকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়ে। সন্দীপ পাশ কাটিয়ে যেতে গিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে, ভাল তো তারাপদদা।

ব‍্যস, ওইটুকুই। সারাদিনে আর কোনো কথা হয় না। সে খাওয়াদাওয়া করে আবার পাশের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। কতক্ষণ আর ডাইনিং রুমে বসে থাকা যায়! দেরি করলে ট্রেনে ভিড় বেশি হবে তাই টেপির খাওয়া শেষ হওয়ার পর কিছুক্ষণ বসে ওরা তিনজন বেরিয়ে পড়ে।


***
কয়েকদিন ধরে টেপির শরীরটা ভাল যাচ্ছে না। একটুতে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। সংসারের খাটুনি তার ওপর ছেলেকে দেখাশোনা। এক হাতে করতে হয়। বিশ্রাম বলতে ওই রাতের ঘুম। তাও ছেলে জেগে উঠলে তাকেও উঠে পড়তে হয়।


একদিন তারাপদ বলল, কয়েকদিন তোমাদের বাড়ি গিয়ে থেকে এসো। দেখবে শরীর ঠিক হয়ে যাবে।


টেপি আতঙ্কের সুরে বলে, তুমি কোথায় খাবে?


তারাপদ হেসে বলে, আমাকে নিয়ে ভেবো না। সেরকম অসুবিধা হলে তোমায় গিয়ে নিয়ে আসব।
টেপি এবার হেসে ওঠে।

পরদিন বিকেলে গিয়ে দিয়ে আসে তারাপদ। রোজ সকালে ঘুম ভাঙে টেপির ফোনে। দুপুরে খাওয়া হয়েছে কিনা আর রাতে এবার শুয়ে পড়ো, রাত কোরো না--- এইসব শুনতে শুনতে তারাপদর কান ঝালাপালা হয়ে যায়। ছেলের কথাও জিজ্ঞেস করতে ভোলে না তারাপদ।

সকালে স্নান করে বেরিয়ে পড়ে তারাপদ। আজ বড় একটা কাজের টেন্ডার ড্রপ করার শেষ দিন। সে চায়ের দোকান থেকে আলুরদম আর পাউরুটি খেয়ে রওনা দেয়। অর্ধেক রাস্তায় যেতেই মোবাইল বেজে ওঠে। পকেট থেকে বার করে দেখে টেপি। বুকটা ছ‍্যাঁৎ করে ওঠে। হ‍্যালো বলতেই টেপি ঝরঝর করে কেঁদে বলতে থাকে, শিগগির তুমি এখানে আসো, সর্বনাশ হয়ে গেছে।

তারাপদ উত্তেজনায় চিৎকার করে বলে, ছেলের কি শরীর খারাপ হয়েছে?
টেপির কান্না জড়ানো গলায় কিছুই বোঝা যায় না।

তারাপদ তড়িঘড়ি ওই অফিসে পৌঁছে বড়বাবুর সাথে দেখা করে। একটা অস্থিরতা যেন ঘিরে আছে তাকে। বড়বাবু ওকে দেখে বলে, কী ব্যাপার তারাপদবাবু? আজ আপনাকে অন্যরকম লাগছে।

তারাপদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে, আসলে শ্বশুরবাড়িতে যেতে হবে। তাই একটু তাড়া আছে।

মুচকি হেসে বড়বাবু বলেন, শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার সময় সব ছেলেদেরই তাড়া থাকে!
বড়বাবুর গলায় অভিযোগের সুর ভেসে ওঠে। তারাপদ চটপট বলে, তাহলে টেন্ডারটা বক্সে ড্রপ করে দিই?

বড়বাবু ফাইলের কাগজে চোখ রেখে মাথা নাড়েন। তারাপদ আর দেরি করে না। ঘরের কোণে রাখা বক্সে সিল করা খামটা ড্রপ করে চটপট বেরিয়ে পড়ে।

বেল বাজাতে শাশুড়ি দরজা খুললেন। তারাপদ ড্রইংরুমের সোফায় গিয়ে বসে। পাশের ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। টেপি এবার পাশে বসে কাঁদতে শুরু করেছে। সে কী বলে সান্ত্বনা দেবে বুঝে পাচ্ছে না। এরমধ‍্যে সামনের চেয়ারে শাশুড়ি এসে বসে বলতে লাগলেন, ময়নাকে মারধর করে তাড়িয়ে দিয়েছে সন্দীপ। বলেই ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন।
তারাপদ শান্ত গলায় বলে, সবে তো এক বছর হল, তারমধ‍্যেই...

শাশুড়ি ভাঙা গলায় বলে, সারাক্ষণ ফোনে ব‍্যস্ত থাকে। অফিসের ফোন বলে ঘরের দরজা বন্ধ করে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলে। তাই নিয়ে অশান্তির শুরু। বাড়ি থেকে বেরোলেও অফিসে ঠিকমতো যায় না। অফিস থেকে ফোন করেছিল ময়নাকে। অফিস না গিয়ে কোথায় গিয়েছিল জানতে চাওয়াতে ওকে মারধর করে। মুখে কালশিটে পড়ে গেছে। ভোর হতেই ময়না চলে এসে ওই ঘরের দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়েছে।

শ্বশুরমশাই অসুস্থ বোধ করায় বিছানায় শুয়ে। তারাপদ তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। তাকে দেখেও কথা বলতে পারছেন না।

টেপির থেকে সন্দীপের ফোন নাম্বার নিয়ে ফোন করে তারাপদ। রিং হয়ে হয়ে কেটে যায়।
তারাপদ কী করবে বুঝতে পারে না। ছেলেকে কোলে নিয়ে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায়। সামনের কার্নিশে কতগুলো পায়রা এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে।