আপনার মন কি বলে ? আপনার মনের দরজা খুলে দেখুন সেখানে অন্য কথা লেখা আছে । ফূর্তির জন্য কলগার্ল ঠিক আছে ।

Story and Article




নির্বাক

অসীম কুমার চট্টোপাধ্যায়


  সৃজার সাথে পরিচয় হয়েছিল সৃজিতের একেবারে আকস্মিকভাবে । বিলাসপুর থেকে সৃজিত ফিরছিল হাওড়ায় । রিজার্ভেশন পায়  নি । বম্বে মেল্ বিলাসপুরে পাঁচ মিনিট দাঁড়ায় । হাতের লটবহর নিয়ে সৃজিত দৌড়ালো আনরিজার্ভড কম্পার্টমেন্টের দিকে । এত রাতেও প্ল্যাটফর্মে ভালো ভিড় । ট্রেন দাঁড়াতেই শুরু হয়ে গেল ধাক্কাধাক্কি । সৃজিতের পক্ষে সম্ভব নয় । হাল ছেড়ে দিল । সঙ্গে সঙ্গে মাথায় এলো রিজার্ভড কম্পার্টমেন্টের কথা । যেমন ভাবা তেমন কাজ । স্লিপার কোচ এর সামনেও ভিড় । তাহলে উপায় ? ওদিকে সিগন্যাল দিয়ে দিয়েছে । ভগবানের নাম নিয়ে উর্দ্ধশ্বাসে ছুটলো পেছন দিকে । এ সি থ্রি টিয়ার থেকে দুজন নেমে গেল । মনে হয় কাউকে সি অফ করতে এসেছিল । দরজাটা খোলা পেতেই ঢুকে পড়লো সৃজিত । 


  রিজার্ভড কম্পার্টমেন্ট । সকলেই যে যার সিটে । ঘড়িতে রাত দশটা । সবার রাতের খাওয়া হয়ে গেছে । অনেকেই নিদ্রামগ্ন । পুশ ডোর দিয়ে ঢুকে পড়লো ভেতরে ।  বা দিকের সাইড লোয়ারে একজন যুবতী মহিলা পা ছড়িয়ে বসে মোবাইল ফোনে কার সাথে চ্যাট করছে । সৃজিতকে দেখে পা টা গুটিয়ে নিলেন । সৃজিত ভেবেছিল মেয়েটি আপত্তি করবে কিন্তু কিছু বলল না । নিজের মনে মোবাইলে ব্যস্ত । আপারে একজন পুরুষ । ডান দিকের বার্থগুলোয় সবাই গায়ে কম্বল চাপিয়ে ঘুমে অচেতন । সৃজিত বুঝতে পারছে না এখন তার কি করা উচিত । এই ট্রেনটা মিস করলে অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে । আবার , রিজার্ভেশন ছাড়া রিজার্ভড কম্পার্টমেন্টে ওঠাও অপরাধ ।টি টি ই যদি আসে তাহলে নির্ঘাত নামিয়ে দেবে । অন্য্ প্যাসেঞ্জাররাও দেখলে আপত্তি জানাবে । মহাবিপদে পড়ে গেল সৃজিত ।


   ঠিক যা ভেবেছিল তাই হল । টি টি ই এসে হাজির । সাইড লোয়ারে যে মেয়েটি বসেছিল সোজা তার কাছে গিয়ে টিকিট চাইলো । তারমানে বিলাসপুরে যে দুজন মানুষ নেমে গেলেন তারা এসেছিলেন এই মহিলাকে সি অফ করতে । ইনি উঠেছেন বিলাসপুর থেকে। টিকিট চেক করে চেকার ভদ্রলোক চলে যাচ্ছিলেন । নজর পড়লো সৃজিতের ওপরে । দৃষ্টিতে সন্দেহ।

জিজ্ঞেস করলেন , আপনার সিট্ নাম্বার কত ?

সৃজিত বলল , আমার রিজার্ভেশন নেই ।


তাহলে এখানে উঠেছেন কেন ? জানেন না এটা রিজার্ভড কম্পার্টমেন্ট ? বৈধ টিকিট ছাড়া এখানে ওঠা অন্যায় । আপনাকে ফাইন দিতে হবে এবং পরের স্টেশনে নেমে যেতে হবে ।

সৃজিত আপ্রাণ চেষ্টা করলো চেকার ভদ্রলোককে কনভিন্স করতে । কিন্তু তিনি কনভিন্সড হবেন না । যাত্রী নিরাপত্তার কথা তাকে ভাবতেই হবে । পুশ ডোর দেখিয়ে সৃজিতকে বললেন , আপনি বাইরে আসুন । পরবর্তী স্টেশনে আপনাকে নামতেই হবে ।


নিরুপায় হয়ে সৃজিত নিজের মাল পত্তর নিয়ে দরজার দিকে এক পা এগোতেই সাইড  লোয়ার সিটের  মহিলা টি টি ই কে বললেন, 

এক্সকিউজ মি  , উনি আমার পরিচিত । আমরা একটা সিট্ পেয়েছি । উনার টিকিট আছে কিন্তু রিজার্ভেশন নেই । আমি উনার সাথে আমার সিটটা শেয়ার করবো ।

টি টি ই ভদ্রমহিলার কথা শুনে অবাক ! বুঝতে পারছেন যে মহিলার সাথে সৃজিতের কোন সম্পর্ক নেই । কিন্তু একজন যখন তার সিট্ শেয়ার করতে চাইছেন তখন মেনে নেওয়া যেতে পারে । 


কিন্তু এ সি থ্রি টিয়ারের ভাড়া অনেক বেশি । ডিফারেন্সটা উনাকে দিতে হবে । তাছাড়া

সৃজিত বলল , বলুন কত দিতে হবে ?

 টাকাটা বুঝে নিয়ে চলে গেলেন ভদ্রলোক । 


ভদ্রমহিলা সৃজিতকে বলল, আপনি আর দাঁড়িয়ে থাকবেন না । অন্য প্যাসেঞ্জাররা দেখতে পেলে ঝামেলা করবে । আপনি এখানে বসুন । আপনার ব্যাগগুলো সিটের তলায় চালান করে দিন ।


 সৃজিত ভদ্রমহিলাকে ধন্যবাদ জানিয়ে সিটের একপাশে বসল ।

বলল, আপনাকে কষ্ট দিলাম । সত্যি আমি দুঃখিত । আসলে হয়েছে কি জানেন  ...

সৃজিতকে থামিয়ে মেয়েটি বলল, আমার নাম সৃজা । আপনি ?

আমার নাম সৃজিত । 

ভারী অদ্ভুত তো ! 

কি অদ্ভুত ?

দুজনের নামের মিল । সৃজা আর সৃজিত ।

হ্যাঁ, ঠিক । যে কথা বলছিলাম 

ডিনার করেছেন ?


না । সময় পেলাম কোথায় ? ভেবেছিলাম বিলাসপুরে কিছু কিনে নেব । নেওয়া হয় নি ।

 কেন?

স্টেশনে আসতে অনেক দেরি হয়ে গেছিল । জেনারেল কম্পার্টমেন্টের ওখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম । কাছে পিঠে কোন খাবার স্টল ছিল না । 

তাহলে রাত্রে না খেয়ে থাকবেন ?

কি আর করা যাবে ? ট্রেনে উঠতে পেরেছি । বসতে পেরেছি । আর কি চাই ? আপনাকে কি বলে ধন্যবাদ জানাবো বুঝতে পারছি না ।


বোঝার দরকার নেই ।আমার কাছে খাবার আছে । আসুন ,দুজনে ভাগ করে খাই ।

আপনার সিটে ভাগ বসালাম আবার খাবারেও ভাগ বসাবো ? প্লিজ , আপনি খান । আমার কোন অসুবিধে হবে না । 

ধন্যবাদ । যান , হাত ধুয়ে আসুন । আমি ততক্ষনে খাবার রেডি করছি । 

সৃজিত হাত ধুয়ে এসে দেখে দুটো প্লেটে চার পিস করে পাউরুটি আর খানিকটা করে চিলি চিকেন । পাশে একটা মিষ্টি ।

সৃজা বলল, একদম খালি পেটে থাকার চাইতে এই সামান্য খাবারটুকু খেয়ে নিন । 

সৃজিত বলল, আমার কাছে এটাই অসামান্য । অসাধারন হয়েছে চিলি চিকেনটা । আপনি বানিয়েছেন ?

না । দোকান থেকে কিনে দিয়েছে । 


আপনি কি হাওড়া পর্যন্ত যাবেন ?

হ্যাঁ । আমি গড়িয়াহাটে থাকি । আপনি কতদূর ?

আমিও শেষ পর্যন্ত । আমার বাড়ি বাগুইআটি । আমি একজন চার্টার্ড একাউন্ট্যান্ট । প্রাইভেট কম্পানির কাজ করি । সেই কাজেই বিলাসপুরে আসা । ফ্লাইটে ফেরার কথা । কিন্তু আমি ওদের ফ্লাইটের টিকিট কাটতে বারণ করে ছিলাম ।

কেন ?


আমার এক পিসিমা থাকেন বিলাসপুরে । আমার মা ফোন করে জানিয়েছিল পিসিমাকে যে আমি বিলাসপুরে যাচ্ছি । ব্যাস , আর যাই কোথায় ? পিসিমার কড়া আদেশ তার ওখানে দুদিন থাকতেই হবে । বাবাও বলল যে দিদি যখন এত করে বলছে দুটো দিন থেকে আয় । দুটো দিনের নাম করে পিসিমা আমাকে চারটে দিন আটকে রাখলো । ভালোবাসার যে কি অত্যাচার তা আমি এই কদিনে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি । আজকে এক রকম জোর করেই চলে এসেছি । কলকাতায় আমার একগাদা কাজ জমে আছে । সমানে ফোন করছে । জানতে চাইছে আমি কবে ফিরবো । কাউকে কিছু বলতে পারছি না । পিসতুতো ভাই পৌঁছে দিয়ে গেল । আসার সময় পিসির কি কান্না । বলে এলাম যে আবার আসবো । প্লেনে আসা যাবে না ।


কেন ?

পিসিমার প্লেনে খুব ভয় ?

তাতে আপনার কি ?

আমার কিছু না । পিসি তো আমাকে ফ্লাইটের টিকিট কিছুতেই কাটতে দেবে না ।

আমি সেটাই জানতে চাইছি । উনার আপত্তি কেন ?


আসলে আমার পিসেমশাই প্লেন ক্রাশে মারা যান । বহুদিন পিসিমা ট্রমায় ছিলেন । সেই থেকে প্লেনের কথা উঠলেই উনি আপত্তি করবেন । গুরুজন মানুষ । উনার কথা অমান্য করি কি করে ? জেনারেল কম্পার্টমেন্টের একটা টিকিট কেটে ট্রেনের অপেক্ষায় ছিলাম | কিন্তু ওখানে যা রাশ দেখলাম আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না ভেতরে ঢোকার । বাধ্য হয়ে এখানে এসেছি ।চাকরি পাওয়ার পর যা কোনদিন করতে হয় নি পিসিমার মন রাখতে তাই করলাম ।একে ট্রেন ,তার ওপর উইদাউট রিজার্ভেশন । আপনি দয়া না করলে কি হত বলুন তো ? আপনার কাছে আজীবন ঋণী হয়ে থাকলাম ।


 আমি আপনার জন্য এমন কিছু করি নি যে এতবার বলতে হবে । দেখুন , আপনি যখন এখানে এসে দাঁড়িয়ে ছিলেন ,আমার একটু সন্দেহ হয়েছিল । মোবাইল করার আছিলায় আপনাকে স্টাডি করছিলাম । তারপর টিকিট চেকারের সাথে যখন কথা বলছিলেন তখন আমি একদম নিশ্চিন্ত হলাম যে আপনি একজন প্রকৃত ভদ্রলোক । চোর টোর নন । জানেন তো মেয়েদের সিক্স সেন্স অনেক বেশি প্রখর । ভালো বুঝেছি বলেই তো একজন অপরিচিত ব্যক্তিকে পাশে বসার অনুমতি দিলাম ।


ইউ আর রিয়েলি গ্রেট । আমার সম্পর্কে অনেক কথা বললাম । আপনার সম্পর্কে কিছু বলুন ।

কেন , সমন্ধ করবেন ?

না না , এক সাথে যাচ্ছি । সেই সুবাদে পরিচিত হওয়া । তবে আপত্তি থাকলে অবশ্যই  বলবেন না ।

আমি মজা করলাম । আমার নাম তো বলেছি । কোথায় থাকি তাও বলেছি । আমি চাকরি করি । এখনও বিয়ে করি নি । বাবা মা ভাই বোন সবাই আছে । তবে আমি একা থাকি । আমি একজন ফ্যাশান ডিজাইনার । স্বাধীনভাবে চলতে ভালোবাসি । অনেক ছোট বেলায় বাবার হাত ধরে চলতাম । এক সময় নিজের থেকেই সেই হাত ধরা ছেড়েছি । তারপর থেকে আর কারও হাত ধরি নি ।

এর বিশেষ কোন কারন আছে কি ?


কারন কিছু নেই । আসলে নির্ভরযোগ্য হাত খুঁজে পাই নি এখনো । বাই-দি-বাই,আপনি ম্যারেড ?

না তবে গৃহপালিত । পরিবারের সবাইকে নিয়ে চলতে ভালো লাগে ।

যদি আপনার স্ত্রী মানে যার সাথে আপনার বিয়ে হবে তিনি যদি আপনার পরিবারের সকলের সাথে থাকতে রাজি না হন তাহলে কি করবেন ?

বাকি জীবনটা বনবাসে কাটবে । এক কথায় বলতে গেলে চরম মানসিক যন্ত্রনায় ছটফট করবো । 


তারমানে আপনি বলতে চান যে স্ত্রীর ইচ্ছা মেনে নেওয়া মানে যন্ত্রনা ভোগ করা । 

যদি তার ইচ্ছাটা এরকম বেয়াড়া হয় তবে ।

স্বামীর সাথে একা থাকতে চাওয়া কি অপরাধ ?

একদম না । সে চাইতেই পারে । আসলে আমার কি মনে হয় জানেন ?

কি ?

তার আগে আমাকে বলুন তো আপনার গাছ ভালো লাগে না গাছের ডাল  ভালো লাগে ?

অবশ্যই  গাছ ।

কেন ?


গাছ মানে প্রচুর ডালপালা , পাতা ,ফল ,ফুল । একটা সম্পূর্ণ ব্যাপার । দেখলেই মন ভরে যায় । গাছের স্নিগধ ছায়ায় বসে মনে হয় দু-দন্ড জিরিয়ে নিই । 

আর আলাদা ভাবে গাছের  একটা ডাল ?

কবির ভাষায় " শুষ্কম কাষ্ঠম"। একটা জরাজীর্ন শুকনো কাঠ । না আছে প্রাণ ,না আছে সৌন্দর্য ।


সৃজিত বলল, হিয়ার ইউ আর । আমি সেই কথাটাই বলছিলাম । গাছ মানে একটা পরিবার । পরিবারের সকলে একসাথে ফলে ফুলে সমৃদ্ধ । সৌন্দর্য্যের প্রতীক । সেই সুন্দর পরিবার থেকে একজনকে সরিয়ে দিলে পরিবারের সৌন্দর্য নষ্ট হয় । যাকে  সরানো হল সেও প্রাণহীন শুকনো কাঠের মত বেঁচে থাকে । 


 সৃজার প্রশ্ন , তাহলে মেয়েটি  তার পরিবার ছেড়ে আসবে কেন ? তারও তো ইচ্ছা করতে পারে পরিবারের সকলের সাথে থাকতে । সে মেয়ে বলে তার ইচ্ছার কোন মূল্য থাকবে না । পরের পরিবারকে নিজের পরিবার ভেবে তাকে ভালো থাকতে হবে । ভালো না লাগলেও তাকে মুখ বুজে সব সহ্য করতে হবে । কারন পুরুষ শাসিত সমাজে সেটাই প্রথা । সব্বাই মেনে চলেছি । কোন মেয়ে আপত্তি করলেই বিপদ । বিরুদ্ধ আচরণ অসভ্যতার লক্ষণ । মেনে চলাটাই রীতি । ছোট থেকেই একটা মেয়েকে এইসব শেখানো হয় । বাবা মা কে খুশি করতে সে এসব মেনে নেয় ।  মন সায় দিক আর নাই দিক । তাদের মনের হদিস কেউ কি কোনদিন পেতে চেয়েছে ? বলুন, আমি কিছু ভুল বললাম ?


ভুল বলি কি করে ? এটা  তো সত্যি কথা । একটা মেয়েকে বিয়ের পর তার সবচেয়ে আপনজন নিজের বাবা মা কে ছেড়ে অন্য্ একটা পরিবারে আসতে  হয় । সেই পরিবারের সকলকে  ভালোবেসে নিজের করে নিতে হয় । এটাই তো প্রথা ।

ঠিক । কিন্তু এই প্রথা তো পাল্টাতে হবে ।

কিভাবে ?


একটা মেয়ে যদি এক বুক কষ্ট নিয়ে তার বাবা মা কে ছেড়ে আসতে পারে তাহলে একটা ছেলে কেন পারবে না তার বাবা মা কে ছেড়ে থাকতে ? কষ্টটা দুজনকেই উপলব্ধি করতে হবে ,তাই না ? দুজনের জন্য আলাদা নিয়ম হবে কেন ?

কিন্তু বাবা মাকে দেখাশুনো করাটাও তো সন্তানের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে ।


অবশ্যই । তার দায়িত্ব সে পালন করবে । কিভাবে করবে তা ছেলেটিকেই ঠিক করতে হবে ।একই রকম ভাবে মেয়েটির বাবা মায়ের প্রতি মেয়েটিরও দায়িত্ব আছে । সে ঠিক করবে কিভাবে সে তার দায়িত্ব পালন করবে । দুজনে আলাদা ভাবেও এই কাজ করতে পারে আবার এক সাথে মিলেও করতে পারে । এতে অসুবিধা কোথায় ? বরঞ্চ সুবিধা হচ্ছে কেউ কারো স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবে না । একসাথে থাকলে স্বামী স্ত্রী দুজনে দুজনকে বুঝতে পারবে । মানসিকভাবে দুজনে দুজনের বন্ধু হয়ে উঠবে । শারীরিক চাহিদা অবশ্যই থাকবে কিন্তু সেটা প্রাধান্য পাবে না । মনের মিলটাই বড় কথা । সমস্যা থাকতেই পারে । সেই সমস্যা নিজেদেরকেই সমাধান করতে হবে ।এর কোন বিকল্প হতে পারে না ।


   সংসার সুখের হয় স্বামী আর স্ত্রীর দুজনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় । সংসারটা তো দুজনের । দুজনকেই অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে । সততা এবং বিশ্বাস হবে এর বুনিয়াদ । তবেই না সংসার সুখের হবে । আসলে আপনারা প্রথার বাইরে এসে একটা মেয়ে কে দেখতে পারেন না । একটি মেয়ের মনের কথা না তার বাবা ভাবে,না স্বামী । তার সুখ,দুঃখ ,ইচ্ছা,অনিচ্ছার কথা ভাবার কারো সময় নেই । পুরুষের চোখে নারী মানেই যৌনতা । নারী মানেই সেবাদাসী ।নারী যে একটা মানুষ , তার যে একটা মন আছে সেকথা কেউ কি ভাবে ? পরিবার যদি বড় হয় তাহলে যে কোন পারিবারিক আলোচনায় বাড়ির মেয়েরা ব্রাত্য । ছোট বেলায় দেখেছি মা কোন বিষয়ে মতামত দিতে গেলেই বাবা দাবড়ে দিত মা কে ।


বলত, তুমি চুপ কর। যা বোঝ না তা বলতে আসবে না । দাদাদের সামনেই মা কে এই ভাবে অপদস্থ করত বাবা । 

তারপর বলত, এখানে না বসে যাও আমাদের জন্য চা করে নিয়ে এস ।

  আমার অবস্থা মায়ের চেয়ে খুব একটা ভালো ছিল না । বলতে পারেন আমি ছিলাম একটা ফালতু । ঘরের কোনায় পড়ে থাকা অবাঞ্ছিত জিনিস । ভাবটা এরকম , আছ্ ,ঠিক আছে । সময় হলেই  বিয়ে দিয়ে পরের বাড়ি পাঠিয়ে দেব । মেয়ে মানে বোঝা । মেয়ে মানে পাপ । যত  তাড়াতাড়ি পার পাপ বিদায় কর । আমার বাবার দুর্ভাগ্য আমাকে পরের বাড়িতে পাঠাতে পারে নি । ছোট থেকেই আমি স্বাধীনচেতা । অবহেলা আমাকে বুঝিয়েছিল নিজেরটা বুঝে নিতে । পরের দয়ায় নয় , নিজের যোগ্যতায় বাঁচবো । আমি আমার মত আছি । কোন কাজের কৈফিয়ত কাউকে দিই না। রাত বিরাতে বাড়ি ফিরলেও কাউকে জবাবদিহি করতে হয় না । 


  একটা মেয়েকে নিরাপত্তা কেউ দিতে পারে না । না পরিবার, না সরকার । যদি তাই পারতো তাহলে চারিপাশে এত নারী নির্যাতন হত না । রেপ শব্দটাই হয়ত থাকতো না । এটা  আমি খুব ভালোভাবে বুঝে গেছি । তাই আমি কারও ওপরে নির্ভর করি না । কোন ভাবেই করি না । আমার সুখ ,দুঃখ ,আনন্দ ,বদনা নিয়ে আমি বেশ ভালো আছি । আমার মন আমার কাছে গোলাপের বাগান । যেমন সুন্দর তেমন সুগন্ধময়। মনটাকে আমি সতেজ  রাখি । আমি দুর্বল চিত্ত নই । কেউ দুটো মিষ্টি কথা বললেই ঢলে পড়ি না । আবার পুরুষ বিদ্বেষীও নই । আপনি একজন অপরিচিত পুরুষ তবুও আপনার সাথে আমার সিট শেয়ার করতে কোন অসুবিধে হয় নি । আমি মানুষকে মানুষ হিসাবেই দেখি । নারী বা পুরুষ বলে আলাদা কিছু ভাবি না । তবে কেউ যদি সচেতন বা অচেতন ভাবেও আমার মনে আঘাত করে তাকে আমি সহজে ছেড়ে দেব না । সম্পর্কে সে আমার যেই হোক না কেন । 


সৃজিত বলল, লিলুয়া  ছেড়ে গেছে । ট্রেন এখন হাওড়ায় ঢুকছে । এবার উঠতে হবে । গল্প করেই কাটিয়ে দিলাম একটা রাত । আমার জন্য আপনাকেও জেগে থাকতে হল । 

ট্রেনে এমনিতেও আমার ঘুম হয় না ।

আমরা কি বন্ধু হতে পারি ?

অবশ্যই পারি । তবে  আমার আসল পরিচয় জানলে আপনি আমার বন্ধু হতে চাইবেন না ।

আসল পরিচয় মানে ?


আমি একজন কল গার্ল । একজন কলগার্লকে কি আপনি বন্ধু ভাবতে পারবেন ? আপনার মন কি বলে ? আপনার মনের দরজা খুলে দেখুন সেখানে অন্য কথা লেখা আছে । ফূর্তির জন্য কলগার্ল ঠিক আছে । তাই বলে বন্ধু ? শিক্ষিত সমাজ কি বলবে ? আপনার মান সম্মান সব ধূলিসাৎ হয়ে যাবে না ? চলি । ভালো থাকবেন ।

নির্বাক সৃজিত শুধু চেয়ে চেয়ে দেখল সৃজার চলে যাওয়া ।