সব শুনে যা বুঝলাম তোর মেয়ে মিথ্যা বলছে সব।সুলতানের ছেলে সেলিম এমন কিছু করবেনা এটা সবাই জানে।
সালিশ
জুয়েল খান
মোতালেব চেয়ারম্যানের বাড়ির উঠোনে তিলধারণের ঠাই নেই। গ্রামের ছোট বড়ো বৃদ্ধ কোনো বয়সের মানুষই বাদ যায়নি এসে জড়ো হতে।ঘোষণা অনুযায়ী আসর নামাজের পরেই বিচারকার্য শুরু হওয়ার কথা কিন্তু চেয়ারম্যান সাহেব কেন যেন ঘর থেকে বেড় হতে দেরি করছেন।চেয়ারম্যান সাহেবের কেয়ারটেকার অবশ্য কিছুক্ষন পরপর সবাইকে চুপ করে বসতে বলছেন ধৈর্য ধরে।কেউ একজন একটু শব্দ করে বললো মাগরিব নামাজের সময়তো হয়ে যাচ্ছে কিন্তু সাহস করে কে বললো তা বুঝা গেলনা বলেই কেয়ারটেকার মিজানের অকথ্য গালাগালি থেকে বেচে গেল এ যাত্রায়।
কিছুক্ষন পর মোতালেব চেয়ারম্যান ঘর থেকে বেড় হলেন সাথে করে গ্রামের গণ্যমাণ্য এবং প্রভাবশালী আশপাশের গ্রামের কিছু মানুষ নিয়ে।
সবাই চুপচাপ। মোতালেব চেয়ারম্যান সালাম দিয়ে সবাইকে বললেন কিঞ্চিৎ অসুস্থতার জন্যেই তার এই দেরি।
বিচারকার্য শুরু হওয়ার আগেই তিনি বকুলের বাবা আলম ও বকুলকে সামনে এসে নিচে বসতে বললেন এবং সেলিমের বাবাকে চেয়ারম্যানের পাশের চেয়ারে বসতে বললেন আর সেলিমকে বললেন মুরুব্বিদের পেছনে দাঁড়াতে।
বকুলের বাবা দরিদ্র আলম হাটু গেড়ে অন্তঃসত্ত্বা বকুলকে সাথে নিয়ে বসে আছে উঠোনে।
মোতালেব চেয়ারম্যান আলমকে ডেকে বললেন তোর মেয়ে বকুলকে বল যা বলে সব সত্যিই যেন বলে।
জ্বি চেয়ারম্যান সাব বকুল সত্যই কইবো..মিথ্যা কইবো ক্যান?
বকুল..
জ্বি চেয়ারম্যান চাচা..
তোর পেটের অনাগত সন্তানের বাবা কে সত্যি করে বল বকুল চুপ করে আছে।উঠোনের সব মানুষ একে অন্যের সঙ্গে কথা শুরু হতেই কেয়ারটেকার মিজানের হুংকার " ঐ মিঞারা এতো কথা কও ক্যান চুপ থাকো"।
বকুল..
জ্বি চেয়ারম্যান চাচা
চুপ করে আছিস কেন?বল?
বকুল মাথা নিচু করে মৃদুস্বরে বললো " সেলিম ভাই "
সেলিমের বাবা সুলতান রেগে দাঁড়িয়ে গিয়ে চিৎকার করে বললেন সব মিছা কথা..সব বাপ মাইয়ার সাজানো ফন্দি আমার পোলারে ফাঁসানোর লাইগা।
মোতালেব চেয়ারম্যান সুলতানকে বসতে বললেন।
বকুল..
জ্বি
সেলিম যে তোর অনাগত সন্তানের বাবা কোনো প্রমাণ আছে তোর কাছে?
জ্বি না
তোদের সম্পর্ক কতদিনের?
সাত মাসের।
তোর বাবা জানতো কিছু?
প্রথমে কিছুই জানতো না
কবে জানলো?
একদিন রাইত ১২টার সময় সেলিম ভাই আমার লগে দেখা করতে আইছিলো আমাগো রান্দনের ঘরে,ঐখানেই বাপজান প্রথম জানাবার পারে।
কতো মাস আগে?
হইবো দুই মাস আগে।
আলম..
জ্বি চেয়ারম্যান সাব?
ঘটনা সত্যি?
জ্বি সত্যি..আমি মাইয়ারে মারি আর সেলিমরে বলি আর যেন কোনোদিন না দেখি।
সেলিম...
জ্বি চেয়ারম্যান চাচা
ঘটনা কি সত্যি?
সেলিম চুপচাপ দাঁড়িয়ে। সুলতান আবারো রেগেমেগে দাঁড়িয়ে উঠে এবং বলতে থাকে এই সব ডাহা মিথ্যা কথা, আমার তিন পোলা বিদেশ থাকে সেলিমেরও সামনের মাসে বিদেশ যাওনের ফ্লাইট.. আমার টাহাপয়সার লোভ লাগছে বাপমাইয়ার।
সুলতানকে আবারো ডেকে বসতে বললেন মোতালেব চেয়ারম্যান।
সেলিম..
জ্বি চাচা
চুপ করে আছো কেন কিছু বলো
না চাচা সব মিথ্যা। বকুলের লগে আমার কোনো সম্পর্ক নাই।
বাপ মেয়ে দু'জনেই কি মিথ্যা বলছে?
জ্বি চাচা..
বকুল তাকিয়ে আছে সেলিমের দিকে। ভেজা চোখ গাল বেয়ে পানি ঝরাচ্ছে উঠোনে।
মাগরিবের আজান পড়ছে চারিদিকে। চেয়ারম্যান সবাইকে বললেন নামাজের পর বাকি বিচার করবেন তিনি।
মোতালেব চেয়ারম্যান নামাজ শেষ করে উঠতেই দেখেন পাশে দাঁড়িয়ে আছে সুলতান।
চেয়ারম্যান সাব..আপনের ভোটের সময় আমার চার পোলায় কি খাটা খাটছে ভুইলা যান নাই আশা করি?
হুম মনে আছে সব সুলতান।
আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী আব্বাস মির্জারে ক্যামনে ভোটের মাঠ থেইকা তাড়াইছি আশা করি সেইটাও মনে রাখছেন?
হুম সুলতান সবটাই মনে আছে আমার।
আমার পোলারে এই ঝামেলার থেইকা উদ্ধার করবেন আপনি এইটাই আমার শেষ কথা।
মোতালেব চেয়ারম্যান নামাজ শেষে উঠোনে এসে চেয়ারে বসলেন।সবাই অধীর আগ্রহে শেষ রায় শুনার।
চেয়ারম্যান সাহেব মৃদুস্বরে ডাকলেন "আলম"
জ্বি.. চেয়ারম্যান সাব?
সব শুনে যা বুঝলাম তোর মেয়ে মিথ্যা বলছে সব।সুলতানের ছেলে সেলিম এমন কিছু করবেনা এটা সবাই জানে।
"এইটা আপনি কি কন চেয়ারম্যান সাব? আমি নিজে ওগো দুইজনরে রাইতে একলগে........ "
কথা শেষ করতে পারেনি আলম। হাত চেপে নিজের কান্না লুকায় আলম।
উঠোন জুড়ে হালকা কথার স্রোত বয়ে যায় জনে জনে।
কেয়ারটেকার মিজান সবাইকে থামতে বলে ধমকের স্বরে।
মোতালেব চেয়ারম্যান আলম ও তার মেয়ে বকুলকে এক ঘরে করার ঘোষণা দেন এবং খুব শীগ্রই গ্রাম ছাড়ারও নির্দেশ দেন যেন আর কেউই তার মেয়ের সংস্পর্শে গিয়ে খারাপ না হয়ে যায়।
সবাই চেয়ারম্যান বাড়ি ছেড়ে গেলে উঠোনে মোতালেব চেয়ারম্যান একাই বসে থাকেন আরো কিছুক্ষন। পিনপতন নীরবতা তার শরীর, মন এবং পুরো বাড়ি জুড়ে।
সকাল হতেই কেয়ারটেকার মিজান একের পর এক দরজা থাপড়ে চেয়ারম্যানকে ডাকছে।
চেয়ারম্যান চাচা.. চেয়ারম্যান চাচা উঠেন..জলদি উঠেন।
দরজা খুলে মোতালেব চেয়ারম্যান বিরক্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করেন "কিরে কি হয়েছে?"
আলম আর তার মাইয়া বকুল গত রাতে গলায় ফাঁস নিয়ে মরছে
কি..? !!
জ্বি চেয়ারম্যান চাচা।
পুরো গ্রামের লোকজন আলমের বাড়ি।চেয়ারম্যান মোতালেব ও গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ বসে আছেন সারি বেঁধে। লাশ গোসলের বন্দবস্ত করার তাগিদ দিচ্ছেন কেউ কেউ। থানা থেকে পুলিশ আসার আগে কাউকেই কিছু করতে নিষেধ করলেন মোতালেব চেয়ারম্যান।
সুলতান চেয়ারম্যানের কাছে এসে বসলো এবং বললো
' যত টাকাই লাগুক আমার সেলিমের উপর যেন কিছু না আসে চেয়ারম্যান সাব আপনি পুলিশের লগে কথা কইয়া সব ঠিক করেন '
পুলিশ লাশ দুটো নিয়ে গাড়িতে উঠালো এবং মোতালেব চেয়ারম্যানকে একটু দূরে ডেকে নিয়ে কি সব যেন বলে গেলো।
মোতালেব চেয়ারম্যান বাড়ির উদ্দেশ্য রওয়ানা দিলেন।মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করছে তার। হঠাৎ দেখলেন বাড়ির কাজের লোক আসলাম দৌড়ে আসছে তার দিকে..!!
কাছে এসেই হাঁপাতে হাঁপাতে বললো চেয়ারম্যান চাচা জলদি বাড়িতে আসেন জলদি...!!
কেন কি হয়েছে?
জানতে চান মোতালেব চেয়ারম্যান।
আসলাম বলেন তার একমাত্র ছেলে মাহবুব পুকুরে নেমে ছিলো কিন্তু কেউই তা জানতো না।অনেক খোঁজাখুঁজির পর শেষমেশ পুকুরে গিয়ে..........!!
কথা শেষ করতে পারলোনা আসলাম কান্নায় তার কন্ঠ ভারি হয়ে উঠলো।
মোতালেব চেয়ারম্যান আকাশের দিকে তাকালেন। পুরো পৃথিবী তার ঘুরছে যেন তিনি একাই স্থীর হয়ে আছেন। বিয়ের ২০ বছর পর সৃষ্টিকর্তা তাকে একটি পুত্র সন্তান দিয়েছিলেন এবং সাত বছর বয়সে আবার নিয়েই গেলেন আজ।
দুনিয়ার সালিশে পক্ষপাতিত্ব থাকলেও সৃষ্টিকর্তার সালিশে কোনো পক্ষপাতিত্ব নেই.. তিনি সবটাই ফিরিয়ে দেন আপন হাতে।
Post a Comment