সভ্যতার বিপর্যয় - সিদ্ধার্থ শেখর বিশ্বাস
বর্তমান যুগ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগ। পৃথিবীর ইতিহাসে মানুষ এখন যোগাযোগ ব্যাবস্থায় সবচেয়ে বেশি সুবিধা ভোগ করছে। প্রযুক্তি নির্ভর মানুষ হাতের নাগালে প্রায় সবকিছুই পাচ্ছে। বিনিময়ে সহজ প্রাপ্যতা মানুষকে হাতছাড়া করেছে মহামূল্যবান সম্পদ থেকে। ধর্মে ধর্মে বিদ্বেষ বাড়ছে। নৈতিকতার স্থানে প্রভাব পড়েছে অনৈতিকতার। বই নাপড়ুয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ত্বরান্বিত হচ্ছে প্রবলভাবে। শিক্ষার হার বৃদ্ধির নামে মূলত হ্রাস, গণতন্ত্রের নামে স্বৈরতন্ত্র আর পত্রসাহিত্যের স্থানে মোবাইল চ্যাট ইত্যাদি দিনের পর দিন সভ্যতার চরম সংকটের দিকে মানুষকে ধাবিত করছে।
বর্তমান যুগটাকে ইংরেজি সাহিত্যে বলা হয় The Age of Post Modernism. যান্ত্রিকতা আর অর্থহীনতাই নাকি এ যুগের লেখকদের লেখালেখির আসল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। এ প্রসঙ্গে Samuel Beckett এর Waiting for Godot উল্লেখ্য। এ যুগের লেখকেরা Philosophy ও Symbolism এর প্রয়োগ অন্যান্য যুগের তুলনায় একটু বেশিই করছেন এবং কবিতায় অমিত্রাক্ষর ছন্দের এতো বেশি প্রয়োগ করছেন যেন কাব্য সাহিত্য দিন দিন তার গতিপথ পরিবর্তন করতে করতে মৃত নদীর মতোই রূপ ধারণ করছে।
Philosophy ও Symbolism গুলো অনেকাংশে অর্থহীনতায় পর্যবেশিত হচ্ছে। Victorian Age এ মানুষ কে বলা হয়েছে Mechanised ও Demoralised । সে যুগের লেখকেরা কিন্তু সরব ছিলেন এগুলোর বিরুদ্ধে। এ প্রসঙ্গে Alfred Tennyson, Robert Browning ও Matthew Arnold বিশেষ কারণে উল্লেখযোগ্য। এই বিখ্যাত কবিরা কিন্তু অমরত্ব লাভ করেছেন সে যুগের মানুষের ত্রুটি-বিচ্যূতি গুলো নিয়ে লেখালেখি করেই। সাহিত্য সমাজের দর্পণ স্বরূপ। সাহিত্য ও সমাজ একে অপরের পরিপূরক।
সুতরাং সাহিত্যের সেবকেরা যদি পচা রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি করেন তাহলে সমাজের অবক্ষয় অবশ্যাম্ভাবী। সমাজের অবক্ষয়ের জন্য অপরাজনীতি যেমন দায়ী তেমনি সাহিত্য সেবিরা এর দায়ভার এড়িয়ে যেতে পারেন না। রাজনীতি ও সাহিত্য যুগ যুগান্তরে কালের সাক্ষী হয়ে ইতিহাস দখল করেছে সেটা ভালো বা মন্দ যেভাবেই হোক না কেন।
মানব প্রেম নাকি জীবে প্রেম? চণ্ডীদাস এর ভাষায় – “সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই”। আবার, স্বামী বিবেকান্দ বলেছেন, “জীবে প্রেম করে যেই জন সেইজন সেবিছে ঈশ্বর”। আবার, চৈতন্য চরিতামৃতে (সনাতন ধর্মে) কলিযুগে মানবের করণীয় সম্পর্কে বলা হয়েছে - “জীবে দয়া নামে রুচি বৈষ্ণব সেবন, ইহা হইতে ধর্ম আর নাহি সনাতন”। ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ নবী – মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর মানবীয় গুণাবলি ছিল অসাধারণ।
নবীর চলার পথে একজন বৃদ্ধা রমণীর বারবার কাঁটা বিছানো সত্ত্বেও নবীজি তাঁকে ক্ষমা করেছিলেন। আর ক্ষমার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বৃদ্ধা রমণী স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। এখানে নবীজির পরমত সহিষ্ণুতা ও ক্ষমার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে উজ্জ্বল। বুদ্ধদেব বলেছেন – “অহিংসা পরম ধর্ম” “জীব হত্যা মহাপাপ” ইত্যাদি। আবার ঈশ্বরপুত্র যীশুর ক্রুশবিদ্ধকরণের পরে ক্ষমার দৃষ্টান্ত অমরত্ব লাভ করেছে। ধর্ম, সে যে ধর্মই হোক সারকথা অহিংসা, পরমত সহিষ্ণুতা, ক্ষমা, দয়া ইত্যাদি। এ প্রসঙ্গে T.S. Eliot এর সেই বিখ্যাত কবিতা “Waste Land” এর কথা না বললেই নয়।
তিনি তাঁর এই কবিতায় ধর্ম থেকে কিছু উপকরণ সংগ্রহ করেছেন। যেমনঃ Datta (দয়া), Dayadavam (ক্ষমা), Damyata (সংযম) এবং কবিতাটি শেষ হয়েছে – Om Santi (ওম্ শান্তি) দিয়ে। তিনি কবিতাটিতে এগুলো ব্যবহার করেছেন মূলত ধ্বংস প্রাপ্ত সভ্যতাকে পুনরুদ্ধার করে মহা শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে। মানুষকে মানুষ হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেতে কিছু গুণাবলি অর্জন করতে হয়। সেগুলোর মধ্যে ‘মনুষ্যত্ব’ অন্যতম।
আর এ মনুষ্যত্ব কতগুলো গুণাবলির সমষ্টি। সুতরাং যাঁরা মানুষের গান করেন তারা যে অন্যজীবকে ঘৃণা করছেন তা কখনও সঠিক নয়। অন্যান্য জীবের সংগে মানুষের যথেষ্ট পার্থক্যও রয়েছে। কারণ অন্যান্য জীব অনেকটা প্রাকৃতিক নিয়মে বেড়ে উঠে। কিন্তু মানুষকে মানুষ হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেতে কঠোর ত্যাগ ও তিতিক্ষার প্রয়োজন যেটা অন্যান্য জীবকে করতে হয় না। তবে অস্তিত্বের সংগ্রামে সকল প্রাণিরই চেষ্টা থাকে। মানুষ মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব হিসাবে ঘোষণা দিলেও সকল জীবই কিন্তু পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি। মানুষকে যদি বিভক্ত করতেই হয় তো ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত না করে নারী ও পুরুষে বিভক্ত করাই শ্রেয়।
বর্তমানে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা হয় শিশু দের নিয়ে। ওরা তো নিষ্পাপ। কিন্তু ওরা তো প্রযুক্তির অভিশাপ থেকে মুক্ত নয়। ওদের সময় কাটে এন্ড্রয়েড মোবাইল সেটে বিভিন্ন ধরণের গেম খেলে, ফেসবুকে ও ইউটিউবে। করোনা অতিমারিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ওরা বাসায় অনেকটা নিরুপায় হয়েই এ সমস্তের প্রতি আসক্ত হয়ে পরায় পড়াশোনার পরিবেশ তথা সার্বিক পরিস্থিতিতে বিশেষ করে শিশুর বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভাষায়ঃ
“এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান / জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তূপ-পিঠে/ চলে যেতে হবে আমাদের / চলে যাব- তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ/ প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল / এ বিশ্বকে এ- শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি-/ নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গিকার”। কিন্তু হায়রে! কবি আজ অমৃত
লোকে থেকেও মনে হয় একটুও শান্তিতে নেই। কারণ, তিনি মর্ত্যের অসহায় শিশুর কান্নায় অস্থির। কবির অমর কবিতা কী ব্যর্থ? কবির কবিতার অমরত্ব ধরে রাখতে এখনই ভালো সময় বিষয়টি নিয়ে ভাবনার।
শিক্ষার হার বৃদ্ধির সংগে সংগে মানুষের উদারতাও বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। কিন্তু পরিস্থিতি উল্টো। ফলশ্রুতিতে, রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম তথা নৈতিকতায় বিপর্যয় হয়েছে। সুতরাং একে শিক্ষার হার বৃদ্ধি বলা চলে না এবং বর্তমান সভ্যতায় অন্ধকারের কালো ছায়ার আভাস সুস্পষ্ট।
সিদ্ধার্থ শেখর বিশ্বাস
চেয়ারম্যান, ইংরেজি বিভাগ
মাতুয়াইল হাজী আব্দুল লতিফ ভূইয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, ঢাকা
#storyandarticle
Post a Comment