শরীর ও বাঁশি - সুদীপ ঘোষাল
– “নেমে পড়ুন সবাই, নেমে পড়ুন ।” হাঁকলেন ট্রাভেল এজেন্ট ভদ্রলোক। একে একে নেমে পড়ল সবাই। দীর্ঘ বাসজার্নির পর আড়ষ্ট পাদুটো সোজা করার জন্য এর চেয়ে ভালো অবকাশ আর হয় না। দীর্ঘ যাত্রার মাঝে এটুকু থামা যেন আলাদা মাত্রা যোগ করেছে এই আনন্দে।
বাস চলেছে উত্তরভারত পরিভ্রমণে। রাস্তার ধারে অজানা এক নদীর কিনারায় দাঁড়িয়েছে বাসখানা । বাসনপত্র সব্জিপাতি চালডাল সব নামিয়ে রান্নার আয়োজন শুরু হল। খেয়েদেয়ে আবার রওনা দিতে হবে। ট্রাভেলের লোকেরা যে যার কাজ করছে, কেউ সব্জি কাটছে তো কেউ চাপিয়ে দিয়েছে ভাত। যাত্রিরাও এদিক ওদিক ঘুরে নিজেদের আড়ষ্ট পাদুটোকে সাবলীল করে নিচ্ছে। কাছেই ‘পে অ্যান্ড ইউজ টয়লেট’, ফ্রেশও হয়ে নিচ্ছে কেউ কেউ।
বিলাসী আর জয়া ঠাকরুন দুজনেই একগ্রামের লোক, চলেছে উত্তরভারত দর্শনে। যদিও দুজনের মধ্যে আর্থসামাজিক তফাৎ অনেকটাই। ঠাকরুন ব্রাহ্মণ ঘরের বিধবা, ব্রত উপোষ আর সাত্ত্বিকতায় একনিষ্ঠ। ঠাকরুনের ছেলেরাও প্রতিষ্ঠিত। অপরদিকে বিলাসী বাগ্দীঘরের বৌ। সারাজীবন মাছগুগলি ধরে বেচে যেটুকু সঞ্চয় করেছেন তাই দিয়েই উত্তরভারত ভ্রমণে বেড়ানো।
আমরা সাহিত্যে ইতিহাসে যে জাতপাত অস্পৃশ্যতা ইত্যাদির প্রাবল্য দেখতে পাই বাস্তবে এর অস্তিত্ব খুবই কম। সাহিত্যিক আর ঐতিহাসিকেরা নিজেদের পেটের দায়ে বর্ণনার যে রং চড়িয়েছেন তা যদি সত্যিই হত তবে জয়াঠাকরুনের ভরসায় তীর্থে বের হতো না বিলাসী। ঠাকরুন আর বিলাসী দুজনেই দুজনের মর্যাদা বোঝে। তাই মুড়ি মাখিয়ে বিলাসীর দিকে এগিয়ে দেওয়ার ধৃষ্টতা করে না সে। আবার ঠাকরুনও কিছু কিনে আনলে বিলাসীকে না দিয়ে মুখে তুলতে পারে না। একাধারে ভালোবাসা আর অন্যদিকে মর্যাদাবোধ একে অপরকে মহিমান্বিত করে তুলেছে।
দূরে নদীর জলের দিকে তাকিয়ে ঠাকরুন বললেন, ” আমার সঙ্গে কি তোমার তুলনা মা ! আমার তিনকাল গিয়ে চারকালে ঠেকেছে, আর তোমার উঠতি বয়স। আর তাছাড়া স্বামী মরে গেলে কি জীবনটাই শেষ হয়ে যায় ? দু’বার তিনবার বিয়ে তো কতজনের হচ্ছে। আমি মুখ্যুসুখ্যু লোক হয়ে যদি এটুকু বুঝতে পারি তো তুমি তো মা ইস্কুলের দিদিমণি।”
আলুপোস্তর বালতিটা নিয়ে এসে হাতায় করে তুলে দিতে দিতে তনিমার মুখের দিকে চাইলেন মাধববাবু। মনে পড়ে গেল বড় মেয়ে স্নিগ্ধার কথা। কতদিন দেখেননি ওকে। এই ট্যুরটা শেষ হতেই মেয়ের বাড়ি যাবেন। এই যাযাবরের জীবন আর ভালো লাগে না।
খাওয়া দাওয়া বাসনপত্র মাজাঘঁষা হতেই সব গুটিয়ে পাটিয়ে বাস ছেড়ে দিল। দ্রুতগতিতে ছুটতে লাগল বাস। সন্ধ্যার পর কোনও শহর বা বাজার পেলে তবেই এক আধ ঘণ্টার জন্য থামবে।
সারারাত বাস চলল হরিণের গতিতে। সকাল হতেই একটা মফস্বল শহরে এসে থামল। মাধববাবু লোকজন নিয়ে নেমে পড়লেন প্রয়োজনীয় সব্জিপাতি কেনাকাটার জন্য। আজ আবার মাছের ঝোল হবে। টাটকা দেখে মাছ চাই। নিরামিষে পনির।
বাস হতে নেমেই বিলাসীকে নিয়ে বাজারের দিকে চললেন ঠাকরুন। ঢুকলেন গিয়ে একটা কাপড়ের দোকানে। অনেক বেছেবেছে একটা রঙিন শাড়ি, শায়া আর ব্লাউজ কিনলেন। দেখেশুনে বিলাসী তো অবাক। গালে হাত দিয়ে বলল, “অ মা….! হা গো কাকি বেধবা হয়ে রঙিন কাপড়…! ওই দিদিমণির মতন মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি তোমার ?
Post a Comment